মুসলমান হিসেবে আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য by মুফতি এনায়েতুল্লাহ

মুসলমানদের ভ্রাতৃত্ববোধ, ঐক্যের চেতনা ও দ্যুতিময় ভালোবাসা প্রসঙ্গে কোরআনে কারিমে ইরশাদ হচ্ছে, 'নিশ্চয় মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। কাজেই তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপস-মীমাংসা করে দাও। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, আশা করা যায় তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হবে।'


_ সূরা হুজরাত : ১০
কোরআনে কারিমের এই আয়াতের চেতনা ও শিক্ষাই হলো মুসলিম উম্মাহর জন্য হজরত রাসূলুল্লাহর (সা.) পক্ষ থেকে ভ্রাতৃত্ব রচনার প্রথম ধাপ। এরপর তিনি বহুকাল ধরে চলে আসা সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে ভ্রাতৃত্ব গড়ে দেন মদিনার আউস-খাযরাজ ও আনসার-মুহাজিরদের মধ্যে। এই ভ্রাতৃত্ববোধ ও ভালোবাসার দৃষ্টান্তের নজির মানব ইতিহাসে আর দ্বিতীয়টি নেই। এ ভ্রাতৃত্বের মূলে রয়েছে কেবল আকিদার বাঁধন, ইমানের বন্ধন ও আল্লাহর ভালোবাসার সম্পর্ক। এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে মুসলমানরা অন্য মুসলমানের সঙ্গে যাবতীয় কাজ সম্পাদন করবে। এক মুসলমানের ওপর অন্য মুসলমানের অধিকার ও দায়িত্ব হলো তাকে ভালোবাসা। হাদিস শরিফে এ ভালোবাসাকে অনেক ফজিলতপূর্ণ বলা হয়েছে। হাদিসে ইরশাদ হচ্ছে, হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, 'তিনটি গুণ যার মধ্যে রয়েছে, সে ইমানের স্বাদ অনুভব করবে। ১. আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) তার কাছে গোটা সৃষ্টিজগৎ অপেক্ষা অধিক প্রিয় হওয়া; ২. মানুষকে ভালোবাসলে একমাত্র আল্লাহর জন্যই ভালোবাসা ও ৩. কুফরিতে ফিরে যাওয়া তার কাছে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতোই অপ্রিয় ও অপছন্দনীয় হওয়া।'-মুসলিম শরিফ
মুসলমান হিসেবে অপর মুসলমানকে ভালোবাসা ছাড়াও এক মুসলমানের প্রতি অন্য মুসলমানের সুনির্দিষ্ট কিছু অধিকার রয়েছে। যার মধ্যে ছয়টি হলো হাদিস অনুযায়ী নিম্নরূপ_ 'এক মুসলমানের ওপর অন্য মুসলমানের ছয়টি হক রয়েছে। বলা হলো, সেগুলো কী হে আল্লাহর রাসূল (সা.)? তিনি বললেন_ ১. তুমি যখন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে, তাকে সালাম দেবে; ২. সে যখন তোমাকে দাওয়াত করবে তখন তা গ্রহণ করবে; ৩. সে যখন তোমার কাছে পরামর্শ চাইবে, তখন তুমি তাকে সৎ পরামর্শ দেবে; ৪. যখন সে হাঁচি দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বলবে, তখন তুমি ইয়ারহামুকাল্লাহ বলবে; ৫. যখন সে অসুস্থ হবে, তখন তাকে দেখতে যাবে এবং ৬. যখন সে মারা যাবে, তখন তার জানাজা ও দাফন-কাফনে অংশগ্রহণ করবে।'-মুসলিম শরিফ
এক মুসলমানের ওপর অন্য মুসলমানের আরেকটি হক হলো_ তার সম্পর্কে মনে কোনো হিংসা-বিদ্বেষ পুষে না রাখা। কেননা মুমিন হবে পরিষ্কার মনের অধিকারী। তার অন্তর হবে অপঙ্কিল। তার হৃদয় হবে কোমল। মুমিন যখন রাতে শয়ন করে তখন সে আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলে, পৃথিবীর কারও প্রতি তার একবিন্দু হিংসা-বিদ্বেষ নেই। হাদিসে ইরশাদ হচ্ছে, হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, 'তোমরা পরস্পরে বিদ্বেষপরায়ণ হয়ো না, একে অন্যের পেছনে লেগো না এবং পরস্পরে প্রতিহিংসায় লিপ্ত হয়ো না, বরং একে অন্যের সঙ্গে ভাই ভাই ও এক আল্লাহর বান্দা হয়ে যাও।'-মুসলিম শরিফ
এক মুসলমানের ওপর অন্য মুসলমানের আরেকটি হক হলো_ তাকে সাধ্যমতো সাহায্য করা। চাই সে জালেম হোক কিংবা মজলুম। হাদিসে ইরশাদ হচ্ছে, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, 'তুমি তোমার মুসলমান ভাইকে সাহায্য করো, চাই সে অত্যাচারী হোক কিংবা অত্যাচারিত। তখন এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! অত্যাচারিত ভাইকে সাহায্য করব ঠিকই কিন্তু অত্যাচারীকে কীভাবে সাহায্য করব? তিনি বললেন, তুমি তার হাত ধরবে (জুলুম থেকে বাধা দেবে)।'-বুখারি শরিফ
উপরোলিল্গখিত বিষয় ছাড়া আরও কিছু অধিকার রয়েছে। যেমন_ অপর মুসলমান ভাইয়ের দোষ গোপন রাখা এবং তার ভুল-ভ্রান্তি ক্ষমা করা। এটি সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। কারণ সে মানুষ; তাই ভুল তো তার হবেই। অতএব, তার কোনো ভুল হলে তা গোপন রাখা উচিত।
আমরা জানি ইসলামের যাবতীয় কর্মযোগ হলো মানুষের জন্য, মানবতার কল্যাণের জন্য। এটাই হলো ইসলামের বন্ধন। যে বন্ধন পুরো সমাজকে একটি দেহের মতো একাত্ম করে রাখে। তাই মুসলমান হিসেবে আমাদের কর্তব্য হলো একে অপরকে সাহায্য করা ও একে অন্যের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে থাকা।
muftianaet@gmail.com
 

No comments

Powered by Blogger.