ক্ষুদ্রঋণ-ইউনূসের অস্ট্রেলিয়া সফর সামনে রেখে কিছু প্রত্যাশা by তপন সরকার

সেদিন সাতসকালে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মী ও অমি বন্ধু ফিল ক্লার্ক আমার অফিসে এসে হাজির। ফিলকে দেখে যথারীতি আমি হাই বলি। ফিলও হাত নেড়ে আমার হাইয়ের উত্তর দেয়। এরপর ওর হাতে থাকা অস্ট্রেলিয়ার একটি শীর্ষ দৈনিক পত্রিকা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে মুহাম্মদ ইউনূসের আসন্ন অস্ট্রেলিয়া সফরের খবরটি আমাকে বেশ


আগ্রহ নিয়ে দেখায়। পত্রিকার খবর অনুযায়ী, মুহাম্মদ ইউনূস ৮ ও ৯ মার্চ সিডনি এবং মেলবোর্নে ‘বিজনেস ফর মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট’ নামের একটি ব্যবসায়ীদের সংগঠন আয়োজিত দুটি পাবলিক ফোরামে বক্তৃতা দেবেন। এ ছাড়া এ সফরে মুহাম্মদ ইউনূস অস্ট্রেলিয়ার বড় বড় ব্যবসায়ী ও তাঁদের প্রতিনিধিসহ বেশ কিছু আমন্ত্রিত অতিথির সঙ্গে সাক্ষাত্ করবেন।
পশ্চিমা বিশ্ব ও অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশগুলোয় বর্তমানে মুহাম্মদ ইউনূস ও তাঁর উদ্ভাবিত গ্রামীণ ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প এবং সোশ্যাল বিজনেস মডেল বেশ জনপ্রিয়। ২০০৬ সালে মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংকের নোবেল পদকপ্রাপ্তিতে তাদের এ আগ্রহ এখন চোখে পড়ার মতো। একজন বাঙালি হিসেবে মুহাম্মদ ইউনূসের আসন্ন সফর নিয়ে ফিলের আগ্রহ দেখে আমার গর্ব হয়। ফিল মনেপ্রাণে একজন সমাজকর্মী। আর পেশায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক। প্রশান্ত মহাসাগরীয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কয়েকটি দেশ যেমন, কিরিবাস, নাউরু ও মারশাল দ্বীপপুঞ্জে দীর্ঘদিন অস্ট্রেলিয়ার ইয়ুথ অ্যাম্বাসেডর হিসেবে অজএইডের সাহায্যপুষ্ট বেশ কিছু আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচন প্রকল্পে কাজ করেছে। বছর দুয়েক হলো ফিল আমার একজন গবেষণা-সহযোগী হিসেবে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া ও নর্দার্ন টেরিটরিতে খনিসমৃদ্ধ এবং আদিবাসী-অধ্যুষিত এলাকায় অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে খনির প্রভাব সম্পর্কিত পাইলট প্রকল্পে গবেষণা করছে। এ প্রকল্পে কাজ করতে গিয়ে ফিল ও আমি ঢের লক্ষ করেছি, বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মুখে অনেক সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা বললেও তাদের মূল উদ্দেশ্য যে মুনাফা অর্জন, এটা একদমই বদলায়নি। অন্তত অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী-অধ্যুষিত এলাকার তেল বা খনিজসম্পদ সংক্রান্ত কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে।
গ্রামীণ ব্যাংক ও মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে গড়া ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প নিয়ে ফিলের আগ্রহের শেষ নেই। ফিলের বদ্ধমূল ধারণা, গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণের মডেল চালু করে অস্ট্রেলিয়ার খনিসমৃদ্ধ এলাকার এই দরিদ্র আদিবাসীদের স্বকর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করে তোলা সম্ভব। এসব আদিবাসী যুগ যুগ ধরে অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক সাহায্য ও খোরপোশ নিয়ে কোনো রকমে বেঁচে আছে। আর তাই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, বাসস্থানসহ অন্যান্য আর্থসামাজিক সূচকে অস্ট্রেলিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ ইউরোপীয় জনগোষ্ঠীর তুলনায় তারা অনেকগুণ পিছিয়ে। যুগ যুগ ধরে অস্ট্রেলিয়ার বড় খনি প্রকল্পগুলো এসব আদিবাসীর জমিতেই খনিজ উত্তোলন করে কোটি কোটি ডলার আয় করছে। আর বিনিময়ে এসব আদিবাসী নামমাত্র রয়্যালিটি পেয়ে থাকে। খনির জীবদ্দশায় খনি এলাকার এসব আদিবাসীর জন্য কিছু কাজের সৃষ্টি হয়। তাও মূলত বর্জ্য ও পয়োনিষ্কাশন এবং পরিবেশগত কার্যক্রম যেমন, গাছ লাগানো ও গাছ কাটা এবং ভূমি সংস্করণের কাজে। সরাসরি খনি ব্যবস্থাপনায় তাদের অংশগ্রহণ খুবই কম। একসময় খনিজ উত্তোলন শেষে খনি ব্যবসায়ীরা তল্পিতল্পা গুটিয়ে অন্য কোথাও চলে যায়, নতুন নতুন খনির সন্ধানে। আর ওই এলাকার আদিবাসীদের অবস্থা যেমনটি ছিল, ঠিক তেমনটি রয়ে যায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে বিরূপ পরিবেশগত প্রভাব ও সামাজিক অপরাধপ্রবণতা মাত্রাতিরিক্তভাবে বৃদ্ধি পায়। আমাদের গবেষণায় আমরা আরও দেখেছি যে খনির ওপর ভিত্তি করে এসব আদিবাসীর জন্য স্বল্পমেয়াদি কাজের সৃষ্টি হলেও তা তাদের পুঁজি গঠনে তেমন সাহায্য করে না। পারে না নতুন কোনো ব্যবসা বা স্বকর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে। দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে আবর্তিত হয় তাদের জীবন।
ফিল প্রায়ই আমার কাছে বাংলাদেশে গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণ গ্রহীতাদের কথা জানতে চায়। জানতে চায় তাদের আর্থসামাজিক উন্নয়নের সংগ্রামের কাহিনি। তারা গ্রামীণ ব্যাংকের এ ঋণের আবর্ত থেকে সহজে বের হতে পারছে কি-না, আর পারলেও এই ঋণ তাদের দারিদ্র্য তথা আর্থসামাজিক সূচক উন্নয়নে সঠিক ভূমিকা রাখতে সাহায্য করছে কি না, তা জানতে চায়। আরও জানতে চায়, সেই সব ঋণ গ্রহীতার কথা, যারা সংখ্যায় কম হলেও সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে পারে না। যে দেশের বড় ব্যবসায়ীরা খুব সহজেই ব্যাংক ঋণখেলাপি হয়ে থাকে, সে দেশের এসব দরিদ্র অথচ ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতার কাছ থেকে ঋণ পরিশোধের জন্য কী পন্থা গ্রহণ করা হয়? গ্রামীণের ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাদের এত উচ্চহারে ঋণ পরিশোধের বিজনেস মডেলটা কী? সম্প্রতি বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার কারণে অস্ট্রেলিয়ায় কর্মসংস্থানের হার বা সুযোগ বেশ কমেছে। একই সঙ্গে বেড়েছে ব্যবসা আর আবাসন ঋণখেলাপিদের হার। এ সমস্যা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি। ফিলের তাই জানতে ইচ্ছা করে, কী মন্ত্র বা জাদুবলে গ্রামীণ ব্যাংক এত উচ্চহারে ঋণ আদায় করে থাকে?
ফিলের এসব হাজারো প্রশ্নের উত্তর আমার অজানা। আমি বিনয়ের সঙ্গে আমার অজ্ঞতা প্রকাশ করি। একসময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ফরেস্ট্রি পড়ার সুবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে গ্রামীণ ব্যাংকের পাইলট প্রকল্পের জন্য বিখ্যাত জোবরা গ্রামে বেশ কয়েকবার গিয়েছি। ফরেস্ট্রির কোনো এক কোর্সের অংশ হিসেবে সহপাঠীদের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে জোবরা গ্রামে বসতবাড়ি ও আর্থসামাজিক জরিপ করেছি। তাও সেই নব্বইয়ের দশকের শুরুতে। ওই সময় আমি ও আমার সহপাঠী বন্ধুরা জোবরা গ্রামের পাইলট প্রকল্পের সেই সব ঋণ গ্রহীতার জরিপের প্রশ্নের উত্তরদানের সহজাত ক্ষমতা দেখে বেশ অবাক হয়েছি। পরে অবশ্য জেনেছি যে তারা এ ধরনের জরিপে প্রায়ই অংশ নিয়ে থাকে। আর তাই জরিপের প্রশ্নের উত্তর প্রদানে বেশ অভ্যস্ত তারা। অতি সম্প্রতি কোনো এক পত্রিকার খবরে জেনেছি, গ্রামীণ ব্যাংকের পাইলট প্রকল্পের সেই সব ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতা এখনো আর্থিকভাবে অসচ্ছল। জেনে আমারও বড় কষ্ট হয়। গ্রামীণ ব্যাংক ও মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে সবিনয়ে জানতে ইচ্ছা করে, কেন সেসব দরিদ্র, ভূমিহীন ও প্রান্তিক ঋণ গৃহীতা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারেনি?
আমার বন্ধু ফিলসহ অস্ট্রেলিয়ার অনেক সমাজকর্মী ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধি মুহাম্মদ ইউনূসের আসন্ন অস্ট্রেলিয়া সফরে এসব প্রশ্ন করার জন্য অধীর হয়ে অপেক্ষা করছে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, মুহাম্মদ ইউনূস তাদের নিরাশ করবেন না।
ড. তপন সরকার: শিক্ষক ও গবেষক, এশিয়া প্যাসিফিক সেন্টার ফর সাসটেইনেবল এন্টারপ্রাইজ। গ্রিফিথ বিজনেস স্কুল। গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়া।
tapan.sarker@griffith.edu.au

No comments

Powered by Blogger.