নিসর্গ-প্রকৃতি ও মানুষ তত্ত্বকথা নয় by দ্বিজেন শর্মা

সিলেট থেকে ঢাকা ফিরছি। মধ্য বৈশাখ। ট্রেন চলেছে প্রান্তর বনভূমি জলাভূমি ও সোনালি-সবুজ ধানের আদিগন্ত আবাদ পেরিয়ে। পথপাশে গাছগাছালির নিবিড় সবুজ, কোথাও গুচ্ছ গুচ্ছ ফুল। আকাশে মেঘ- রৌদ্রের খেলা। মাঠে হাসিমুখ কৃষক, খেতে পোঁতা লাঠির মাথায় ধ্যানী ফিঙ্গে। অপূর্ব শান্তশ্রী, চোখ ফেরানো দায়।


কিন্তু এই কি সব? না, এ হলো মুদ্রার এক পিঠ, অন্য পিঠ বড়ই লাবণ্যহীন, রূঢ় বাস্তবে ঠাসা আর সেটি আমাদের দেখিয়েছেন নন্দিত ও নিন্দিত এক বিজ্ঞানী, চার্লস ডারউইন। তাঁর লেখা প্রজাপতির উৎপত্তি গ্রন্থে বর্ণিত একটি দৃশ্যপট অনেকটা এ রকম: নিবিড় অরণ্য, গাছে গাছে ফুল ও ফলের সমারোহ, উড়ছে রংবেরঙের পাখি, কাকলিমুখর। একি এ সুন্দর শোভা, কিন্তু এহ বাহ্য। আসলে এটি এক হিংস্র রণভূমি—নিঃশব্দ লড়াই চলছে গাছে গাছে, পাখিতে পাখিতে। কেননা তাদের সংখ্যা অনেক, আছে রকমফের, অর্থাৎ সামর্থ্যের ভিন্নতা এবং পরিশেষে জয়-পরাজয়। একে ডারউইন বলেছেন ‘জীবনের জন্য সংগ্রাম’, হার্বার্ড স্পেনসর ‘অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম’। এই সংগ্রাম নির্বিশেষ নিষ্ঠুর, এতে যোগ্যের জয় ও অযোগ্যের বিলুপ্তি অবধারিত। ট্রেনযাত্রায় আমার দেখা আপাতসুন্দরেও আছে একই সংগ্রাম—মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির, মানুষের সঙ্গে মানুষের। এখানেও রয়েছে জয়-পরাজয়, তবে পার্থক্য হলো, মানবসমাজে বিজিতের বিলুপ্তি ঘটে না। জীবজগতের তুলনায় মানবসমাজ অধিক সহনশীল আর তা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে, সমাজব্যবস্থার অগ্রগতির সমতালে।
জীববিবর্তনের চালিকাশক্তি হিসেবে ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’তত্ত্ব ডারউইন-ওয়ালেসের অনন্য আবিষ্কার। বিস্তারিত বলার অবকাশ এখানে নেই। কিন্তু এখন আমরা জানি, এতে আছে বংশগতির বড় একটা ভূমিকা, বিশেষত জীবের স্বার্থপরতা ও প্রতিযোগিতার প্রবৃত্তি এবং সেই সঙ্গে সহযোগিতাও। স্মর্তব্য, স্বার্থপরতা ও প্রতিযোগিতার ভূমিকা প্রত্যক্ষ, সহযোগিতার ভূমিকা পরোক্ষ। বলাবাহুল্য, মানুষও ব্যতিক্রম নয়। অভিন্ন নিয়মে সে-ও বিবর্তিত হয়েছে, অত্যুন্নত মস্তিষ্কের অধিকারী হয়েছে। কেরোলাস লিনিয়াস তাই মানবপ্রজাতির নামকরণ করেছিলেন হোমো স্যাপিয়েন্স, অর্থাৎ জ্ঞানী জীব। কিন্তু মানুষ কতটা জ্ঞানী আর কতটা কৌশলী ও ধূর্ত, সেই সমীকরণ মেলানো কঠিন। সভ্যতার গোটা বিবর্তনে স্বার্থপরতা ও প্রতিযোগিতার প্রাধান্য এবং পরার্থপরতার পার্শ্বতা সহজেই লক্ষ করা যায়। ম্যালথাসের জনসংখ্যাতত্ত্ব ও স্পেনসরের ‘সামাজিক ডারউইনবাদ’ নিন্দিত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমরা জীবকুলের পূর্বোক্ত দুটি আদিম প্রবৃত্তি থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারিনি। এটা কোনো তত্ত্বকথা নয়, বৈজ্ঞানিক সত্য।
প্রকৃতিকে আমরা মাতৃজ্ঞান করি। আমরা তার সৃষ্টি, কিন্তু সে আমাদের সন্তানজ্ঞান করে না। আসলে তার কোনো জ্ঞান নেই, সে নির্মুখ, ডকিন্সের ভাষায় ‘অন্ধ ঘড়িনির্মাতা’। হতে পারে স্বয়ংচল সুপারকম্পিউটারের মতো প্রবল শক্তিধর এক কুশলী যন্ত্র, নইলে স্রেফ দৈবচয়নভিত্তিক নির্বাচনের মাধ্যমে এই বিশাল ও বৈচিত্র্যময় জীবজগৎ নির্মাণ তার পক্ষে সম্ভব হতো না। ডারউইন আধুনিক মানুষকে প্রাকৃতিক নির্বাচনের আওতামুক্ত হওয়ার স্বীকৃতি এবং একই সঙ্গে আপন বিবর্তন পরিচালনার কিছু দিশাও দিয়ে গেছেন। যেসব উপাত্তের ভিত্তিতে বিবর্তন ক্রিয়া পরিচালিত তাতে আছে অতিপ্রজনন, খাদ্যাভাব, অন্তঃপ্রজাতিগত সংগ্রাম যা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে পৃথিবী হয়তো হতো যুদ্ধহীন, ক্ষুধাহীন, শোষণহীন ও সীমিত জনসংখ্যার এক স্বর্গরাজ্য। কিন্তু অত্যুন্নত প্রযুক্তি ও সুদক্ষ ব্যবস্থাপনা মানুষের করায়ত্ত থাকা সত্ত্বেও তা অনায়ত্তই থেকে গেল। মানুষ প্রকৃতিকে জয় করতে, বিকল্প শক্তি হতে চেয়েছিল। আপাত-অগ্রগতি ঘটেছিল অবশ্যই, কিন্তু মানুষ অজান্তে প্রকৃতিদত্ত স্বার্থপরতা ও প্রতিযোগিতার তাগিদে পুঁজি ও প্রযুক্তি নিয়ে যেন প্রকৃতির ফাঁদেই আটকা পড়তে চলেছে। বিজ্ঞান, দর্শন ও ধর্মের কোনো শিক্ষাই তার কাজে লাগেনি।
কোনো প্রযুক্তিই মানুষের স্বার্থপরতা ও প্রতিযোগিতার সহজাত প্রবৃত্তিগুলোর ভিত্তি টলাতে পারবে না। চাই এমন সমাজব্যবস্থা, যেখানে এগুলোর কার্যকর ভূমিকা থাকবে না, যাতে এসব প্রবৃত্তি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। মার্ক্স সম্ভবত এমন এক সমাজেরই স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের, মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সব দ্বন্দ্বের নিরসন ঘটবে। কিন্তু এখানেও বিজ্ঞানের সংশয় আছে। স্বার্থপরতা ও প্রতিযোগিতা হারিয়ে সর্বৈব পরার্থপর মানুষ কি শেষ পর্যন্ত মানুষই থাকবে, নাকি মনোবৈশিষ্ট্যে অন্যতর কোনো জীবে রূপান্তরিত হবে বলা কঠিন। আরেকটি বাস্তবতাও বিবেচ্য—প্রকৃতির মতো অমিত শক্তি ও অনন্ত সময়ের সুযোগ মানুষের নেই। আছে কেবল পরিবর্তন কিংবা বিলুপ্তির শঙ্কা।
দ্বিজেন শর্মা: লেখক, নিসর্গী।

No comments

Powered by Blogger.