বেইজিং-ঢাকা-দিলি্ল-হিলারির সফর-সমীক্ষা by এম সাখাওয়াত হোসেন

হিলারির এ সফর শুধু বাংলাদেশের স্বার্থে এবং হিতোপদেশ দেওয়ার জন্য হয়েছে তেমন নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তিত পররাষ্ট্রনীতিতে ভারত মহাসাগরীয় উপকূলবর্তী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান পূর্বের তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে উঠেছে। ২০১৪ সালে সমুদ্র সীমানা নিয়ে ভারতের সঙ্গে উভয় পক্ষের সন্তুষ্টিযোগ্য সমাধান হলে এ অবস্থান আরও উন্নত হবে।


ওই সময় পর্যন্ত একদিকে চীন, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কোন দিকে গড়ায় সেটির দিকেই লক্ষ্য থাকবে স্টেট ডিপার্টমেন্ট অব ইউএসের। এটাই হয়তো উপমহাদেশে হিলারি ক্লিনটনের সেক্রেটারি স্টেট হিসেবে শেষ সফর


হিলারি রডহ্যাম ক্লিনটন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সাবেক 'ফার্স্ট লেডি' যিনি সেক্রেটারি অব স্টেট পদে কর্মরত, প্রায় ২৪ ঘণ্টার বাংলাদেশ সফর শেষে ভারতের কলকাতা-দিলি্ল হয়ে দেশে ফিরেছেন। বাংলাদেশে তার এটি দ্বিতীয় সফর হলেও সেক্রেটারি স্টেট হিসেবে প্রথম। ইতিপূর্বে তিনি ড. ইউনূসের আমন্ত্রণে 'ফার্স্ট লেডি' হিসেবে বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। প্রায় ১২ বছর পর তিনিই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে উচ্চপদস্থ রাজনীতিবিদ, যিনি বাংলাদেশে কিছু ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। তিনি ঢাকায় এসেই সরকারপ্রধান ও অন্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং আনুষ্ঠানিক আলোচনা ছাড়াও বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেছেন। সরকার ও খালেদা জিয়ার সঙ্গে কী আলোচনা হয়েছে, তিনি কী হিতোপদেশ দিয়ে গেলেন আর কী নিয়ে গেলেন এসবই আগামী অনেক দিন বাংলাদেশের পত্রপত্রিকা, বিভিন্ন ফোরাম এবং টিভি টক শোতে আলোচিত হবে।
বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারী বলে বিবেচিত যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় নারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে বাংলাদেশের রাজনীতি, সরকার ও বিরোধী দলের অবস্থান, আগামী নির্বাচনে সম্ভাব্য সংকট অথবা আমাদের দেশের অর্থনীতির হাল-হকিকত অজানা থাকার কথা নয়। এই সফরের প্রস্তুতি পর্বে উপমহাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়, বিশেষ করে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, গুম, হত্যা আর হরতালের বিষয়গুলোর ওপর সিআইএ সদর ও স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে যে তথ্য পেয়েছেন সে ধরনের পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য এ দেশের সিংহভাগ লোকের কাছেই নেই। ঢাকায় প্রায় এক ঘণ্টা নিজস্ব বিমানে অবস্থান করে রাষ্ট্রদূতের ব্রিফিংও পেয়েছেন। আমার মনে হয় না যে ধরনের আলোচনা বাংলাদেশে এজেন্ডাভুক্ত অথবা এজেন্ডার বাইরে হয়েছে সেসব বিষয় তার অজানা ছিল।
আমার আজকের এই আলোচনা শুধু হিলারির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করেই নয়, হিলারির চীনসহ উপমহাদেশভিত্তিক। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশ নীতি কোনো আলাদা ইস্যু নয় বরং এই নীতি উপমহাদেশ তথা ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা বিষয়ক নতুন আঙ্গিকে রচিত নীতিমালার আলোকে প্রণীত। সেখানে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা এবং লেনদেনের বিষয় অবশ্যই সম্পৃক্ত রয়েছে।
হিলারি ক্লিনটনকে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ওবামা প্রশাসনের অন্যতম চালিকাশক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কালো রাষ্ট্রপতি বারাক হোসেন ওবামার সাদা চেহারা বা হোয়াইট ফেস। মাত্র কয়েকদিন আগেই বারাক ওবামা দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য ডেমোক্রেট প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছেন। তিনি হয়তো মুখোমুখি হবেন রিপাবলিকানদের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী মিট রমনির। নির্বাচনে ওবামাকে মুখোমুখি হতে হবে বহু ইস্যুর, বিশেষ করে অর্থনৈতিক মন্দা ও বেকারত্বের। এরই মধ্যে হিলারির এ সফর।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হিলারির সফর এমন এক সময়, যখন ওবামা প্রশাসনকে সামলাতে হচ্ছে আরব বসন্তের এলোমেলো বাতাস, অস্থির পশ্চিম আফ্রিকা, উত্তর-দক্ষিণ সুদানের অস্থিরতা, মিসরে নতুন সংকট, ইরানের বিরুদ্ধে কিছু একটা করার ইসরায়েলি তথা ইহুদি লবির চাপ, সমস্যায় জর্জরিত সিরিয়া পরিস্থিতি, আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার ইত্যাদি। আরও রয়েছে ইউরোপ তথা ন্যাটোর অন্যতম শক্তিধর ও বড় সদস্য দেশ ফ্রান্সে নিকোলা সারকোজির অবিশ্বাস্য পরাজয় এবং ১৭ বছর পর ফঁদ্ধাসোয়া হলাঁদের মাধ্যমে সোসালিস্টদের উত্থান।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন বছরে ওবামা প্রশাসনকে সামলাতে হচ্ছে মিসরের ক্রমবর্ধমান নাজুক পরিস্থিতি, যেখানে কোণঠাসা হয়ে পেন্টাগন সমর্থিত জেনারেলরা ক্ষমতার বাগডোর ছাড়তে সম্মত নয়। উপমহাদেশের সীমানা ঘেঁষে যুক্তরাষ্ট্র যে সমস্যায় নিমজ্জিত তার নাম আফগানিস্তান। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ১২ বছরের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত পরাজয় এড়াতে ওবামা ২০১৪ সালকে বেছে নিয়েছেন আফগানিস্তান ছাড়তে। এখানেই হয়তো প্রথম সংঘাত হতে পারে নবনির্বাচিত ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে। মি. হলাঁদে আফগানিস্তান থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফরাসি সেনা প্রত্যাহারের ওয়াদা করেছেন ফ্রান্সের জনগণের কাছে। এ মাসের ২২ তারিখে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর বৈঠকে এ ধরনের প্রস্তাব আনলে ফ্রান্সকে সামলাতে হবে ওবামা প্রশাসনকে। চীনের এতদঞ্চলসহ আফ্রিকায় প্রভাব বিস্তার যুক্তরাষ্ট্রের বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হিলারি বাংলাদেশে এসেছিলেন চীনে দু'দিন সফর শেষ করে। তার চীন সফর রুটিন বিষয় ছিল না, যদিও দু'দেশের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ হয়ে থাকে। হিলারির চীন সফরে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যার মধ্যে অন্যতম ছিল মানবাধিকার। গৃহবন্দিত্ব থেকে পলাতক এবং যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে আশ্রয় গ্রহণকারী ভিন্নমতাবলম্বী বলে কথিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী চেন গুয়াংকে হিলারির সঙ্গে চীন থেকে বের করে আনার জন্য দরকষাকষি করেও মি. চেনের দোটানার কারণে হিলারিকে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র আশা করে, চেন গুয়াংকে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠাবে বলে চীন যে কথা দিয়েছে তা পালন করবে। মি. চেন বহুদিন ধরে চীনের এক সন্তান নীতি বলবৎ করতে গিয়ে বাধ্যতামূলক গর্ভপাতের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন এবং চীনে 'ভিন্নমত' ছড়াচ্ছিলেন।
চীনের সঙ্গে ভূকৌশলগত বিষয়ে আলোচনাতে যুক্তরাষ্ট্র ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে বলে মনে হয় না। ইরানের পারমাণবিক শক্তি সঞ্চয়কে রুখে দিতে চীনকে ওই দেশের ওপর চাপ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রকে অবরোধে সহযোগিতা করার আলোচনাও তেমন ফলপ্রসূ হয়েছে বলে মনে হয় না। একইভাবে সিরিয়ার বিষয়েও চীন অনেকটা নমনীয়। সিরিয়ার সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা, ইরানের জ্বালানি ক্ষেত্রে চীনের বিনিয়োগ এবং অত্যন্ত প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ থেকে চীন সরে আসবে তেমন মনে করার কারণ নেই। উত্তর কোরিয়ার বিষয়ে চীন নিজের নীতিতেই চলছে। এসব কারণেই মনে করা হয়, হিলারির চীন সফর তেমন ফলপ্রসূ হয়েছে বলে মনে হয় না।
ইরান ও সিরিয়ার বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র তেমন সুবিধাজনক অবস্থানে নেই। হরমুজ প্রণালি বরাবর সামরিক শক্তির ব্যবহারে ইরানকে অবরোধ করার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোরালো আবেদনে ওবামা এ পর্যন্ত কোনো সাড়া দেননি। অন্যদিকে হিলারি তথা ওবামা প্রশাসন ভালো করেই জানে যে, সিরিয়ায় বৃহৎ আকারে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে ওই অঞ্চলের বহু দেশও দাবানলে পড়তে পারে। আর এ ধরনের পরিস্থিতি ইসরায়েলের জন্য সুখকর হবে না। ওবামা প্রশাসনের এই নাজুক সময় ওই অঞ্চলে কোনো বড় ধরনের পদক্ষেপ নেবে না যুক্তরাষ্ট্র।
হিলারি ঢাকা থেকে প্রথমে কলকাতায় দু'দিনের সফর করলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ক্রমেই জোরদার হচ্ছে বহুদিন থেকে। ভারতের আইটি সেক্টরে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ আকারের লগি্ন রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বহু নাগরিক ওই সুবাদে ভারতে চাকরিরত। ইদানীং যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন রাজ্যে সরাসরি বিনিয়োগের যে পদক্ষেপ নিয়েছে তারই পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী কলকাতায় যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত খুচরা বিক্রেতা ওয়ালমার্টের কয়েকটি চেইন শপ খোলার প্রস্তাব রয়েছে। সে প্রস্তাবে কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের ব্যবসায়ীদের চাপে মমতা ব্যানার্জি ইতিপূর্বে সম্মতি দেননি। হিলারির কলকাতা সফরের এটাই প্রধান কারণ ছিল। তিনি এক সময় ওয়ালমার্টের বোর্ড অব ডিরেক্টরের একজন সদস্য ছিলেন।
হিলারি বাংলাদেশ ত্যাগ করার আগে মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে তিস্তা চুক্তির বিষয়ে কথা বলবেন বলেও আমাদের পত্রপত্রিকায় ফলাও করে প্রকাশিত হয়েছিল। আমি এ খবরে কিছুটা বিস্মিত হয়েছিলাম। কারণ, ভারত সাধারণত দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে বাইরের হস্তক্ষেপ গ্রহণ করে না। হয়েছেও তাই। ৭ মে, ২০১২ সালে কলকাতার ঐতিহাসিক রাইটার্স বিল্ডিংয়ে হিলারির সঙ্গে বৈঠক শেষে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে হিলারির উপস্থিতিতে বলেছেন, খুচরা বাজারে সরাসরি অর্থলগি্ন এবং তিস্তার পানি বণ্টন সম্বন্ধে হিলারির সঙ্গে কোনো কথাই হয়নি। তিনি বলেন, খুচরা বাজার এফডিআই 'নো', 'তিস্তা নো'। মমতা ব্যানার্জি আরও জানান, যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে সেগুলো সবই পিপিপির আওতায় পশ্চিমবঙ্গে অর্থলগি্ন। অবস্থা দৃষ্টে মনে হয়, হিলারি ক্লিনটন মমতা ব্যানার্জিকে তার পূর্বতন অবস্থা থেকে টলাতে পারেননি। বাংলাদেশে তিনি যেভাবে মোড়লিপনা করে গেলেন ভারতের বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে তেমন করতে পারেননি। মমতা বাংলাদেশ নিয়ে তেমন মাথা ঘামান না বলে আবার প্রমাণিত হলো।
দিলি্লতে তেমন বিষয় নিয়ে আলোচনা না করলেও ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় নিবিড়। ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহের চুক্তি ছাড়াও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়তির পথে। তথাপি ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলার ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্ক। কারণ, রাশিয়ার সঙ্গে গত ৬০ বছরের সম্পর্কের অবনতি চাইবে না দিলি্লর রাজনৈতিক মহল। মাত্র কয়েক মাস আগে রাশিয়ার কারিগরি সহায়তায় ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য স্থানীয়ভাবে পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন তৈরি করা হয়েছে। এটাই ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রথম পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন। এই প্রযুক্তি ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে যত সহজে পেয়েছে, তেমন হয়তো পশ্চিমা দেশগুলো থেকে পেত না। কাজেই রাশিয়ার সঙ্গে ভারত কোনোভাবেই সম্পর্ক শীতল করতে চাইবে না।
ভারতের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেলেও দিলি্ল বেইজিংকেই সামরিক প্রতিপক্ষ মনে করে, যদিও চীন তেমন কোনো প্রতিযোগিতার কথা আমলেই নেয় না। এর উদাহরণ ভারতের প্রথম পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক মিসাইল পৃথিবী-৫ উৎক্ষেপণের পর বেইজিংয়ের শীতল প্রতিক্রিয়া। ভারতের 'ফার্স্ট স্ট্রাইক' ক্ষমতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান চীনা বিশেষজ্ঞরা। চীনের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত বিরোধ রয়েই গেছে এবং কোনোভাবেই চীন তার দাবি থেকে সরে আসবে বলে মনে হয় না। চীন-ভারত সামরিক টানাপড়েনের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের ভারত মহাসাগরীয় নতুন আঙ্গিকে রচিত ভূরাজনৈতিক নীতিতে প্রতিফলিত হয়েছে। বস্তুতপক্ষে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ভারত মহাসাগরীয় নীতি এখন ভারতকেন্দ্রিক।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও ভারত-ইরান অথবা ভারত-সিরিয়া সম্পর্কে ফাটল ধরাতে পেরেছে_ হিলারির সফর শেষে এমন মনে হয়নি। ইতিপূর্বে ভারত ইরান থেকে জ্বালানি সংগ্রহ যে বন্ধ করবে না সে কথা পরিষ্কারভাবে জানিয়েছিল। লক্ষণীয় বিষয় হলো, হিলারির দিলি্ল পেঁৗছার আগেই ইরানের বেশ বড় একটি বাণিজ্য প্রতিনিধি দল দিলি্লতে অবস্থান করছিল। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র তথা ইউরোপীয় নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে ভারত কত দূর পর্যন্ত সহযাত্রী থাকবে বা আদৌ থাকবে কি-না সেটিই হবে দেখার বিষয়। তবে ভারত সহজে স্বরচিত নীতিতে পরিবর্তন আনে না। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা ভালো করে জানেন, এসব ক্ষেত্রে ভারতকে চাপ দিয়ে বিশেষ সুবিধা হবে না।
শুধু জ্বালানি আমদানিই নয়, ইরানের সঙ্গে ভারতের যথেষ্ট অর্থলগি্ন রয়েছে। ভারত ইরানের পুরনো বন্দর_ বন্দর আব্বাস থেকে আফগান সীমান্ত পর্যন্ত রেললাইন তৈরির কাজে নিয়োজিত। এটাই এখন আফগানিস্তানের সঙ্গে ভারতের একমাত্র যোগাযোগের পথ। স্মরণযোগ্য যে, ইতিমধ্যেই ভারতীয় সহযোগিতা বাড়ছে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে যোগাযোগ ক্ষেত্রে। ২০১৪ সালের পর ভারতের ব্যাপক উপস্থিতি আশা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব কারণে একদিকে ভারত চাইবে যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা থেকে ভারতকে অব্যাহতি দিতে, যেমন জাপান ও ইউরোপীয় আরও দশটি দেশকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
ভারতের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের সম্পর্কের উন্নতি ভারতের স্বার্থেই হচ্ছে, যদিও পাকিস্তান মধ্যপাল্লার পারমাণবিক অস্ত্র বহনকারী মিসাইল পরীক্ষার মধ্য দিয়ে ভারতের দূরপাল্লার মিসাইলের পাল্টা জবাব দিয়েছিল। চীনের মতো ভারতও পাকিস্তানের মিসাইল পরীক্ষা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেনি। ভারতের নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, পাকিস্তান নয় ভারতের সঙ্গে সামরিক টানাপড়েন চীনের সঙ্গেই বিদ্যমান। কারণ, ভারত-চীনের সীমান্ত সমস্যা মেটাতে চীন তেমন আগ্রহী নয়। তিব্বত আর দালাই লামা ইস্যু পূর্ব অবস্থাতেই বিদ্যমান রয়েছে।
ওপরে বর্ণিত বাস্তবতার আঙ্গিকেই হিলারি ক্লিনটনের উপমহাদেশ সফর। বাংলাদেশের সঙ্গে পারস্পরিক আলোচনার যে সমঝোতা হয়েছে সেখানে আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়টিও স্থান পেয়েছে বলে প্রকাশ। এই নিরাপত্তার অন্তর্নিহিত বিষয়গুলো কী তা অনুমেয়। ভারত মহাসাগরে এখন মোটামুটিভাবে ভারতের নৌবাহিনীর তৎপরতাই বৃদ্ধির পথে। যুক্তরাষ্ট্র এতদঞ্চলে চীনের আধিপত্য ও সামরিক উপস্থিতি কমাতে সাহায্য করতেই উপমহাদেশের অন্যান্য দেশের সহযোগিতা চাইবে। প্রায় চার দশক এক ধরনের একঘরে থাকার পর বার্মা (মিয়ানমার) সবে পশ্চিমা দুনিয়ার জন্য দরজা খুলতে বিরোধী নেত্রী অং সান সু চিকে সংসদে বসতে দিয়েছে। অন্যদিকে সু চিও সংসদে শপথ পাঠের অংশবিশেষ নিয়ে আপত্তি জানালেও শক্ত অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। এখন বার্মায় পশ্চিমা লগি্নর দৌড় শুরু হয়েছে। এমতাবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও গ্যাস উত্তোলন এবং বিতরণে রত বৃহৎ কোম্পানিগুলো যাদের অতীতেও লগি্ন ছিল, তাদের ফিরে আসার পথ তৈরি হয়েছে। কাজেই প্রয়োজন রয়েছে উপমহাদেশের দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার। বার্মার সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নিয়ে যে বিরোধ ছিল তা আপাতদৃষ্টে উভয় দেশের সন্তুষ্টির মধ্যেই মীমাংসা হওয়ায় বার্মার বর্তমান অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের ভূকৌশলগত অবস্থানে বেশ উন্নতি হয়েছে। বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া নীতির সহায়ক।
হিলারি ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফরের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক তাৎপর্যের কথা বাদ দিতে চাই। কারণ, তিনি রাজনীতি নিয়ে যা বলেছেন সেগুলো মোটেই নতুন কথা নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অহরহ বলছেন। পত্রপত্রিকায় সবাই মিলে কী করতে হবে তাই বলে যাচ্ছেন। তবে বার্মার সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার একটা নিষ্পত্তি হওয়ায় প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্রবন্দর আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করার একাধিক কারণ রয়েছে। বিশেষ করে বন্দর নির্মাণে চীনই যদি এগিয়ে থাকে। অন্যদিকে হালে রাশিয়ার 'গেজপ্রম'-এর সঙ্গে অফশোর গ্যাস উত্তোলনে সহায়তা চুক্তির বিষয়টিও যে যুক্তরাষ্ট্রের হিসাবের মধ্যে রয়েছে তাতে সন্দেহ নেই।
ওপরের আলোচনা থেকে প্রতীয়মান যে, হিলারির এ সফর শুধু বাংলাদেশের স্বার্থে এবং হিতোপদেশ দেওয়ার জন্য হয়েছে তেমন নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তিত পররাষ্ট্রনীতিতে ভারত মহাসাগরীয় উপকূলবর্তী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান পূর্বের তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে উঠেছে। ২০১৪ সালে সমুদ্র সীমানা নিয়ে ভারতের সঙ্গে উভয় পক্ষের সন্তুষ্টিযোগ্য সমাধান হলে এ অবস্থান আরও উন্নত হবে।
ওই সময় পর্যন্ত একদিকে চীন, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কোন দিকে গড়ায় সেটির দিকেই লক্ষ্য থাকবে স্টেট ডিপার্টমেন্ট অব ইউএসের। এটাই হয়তো উপমহাদেশে হিলারি ক্লিনটনের সেক্রেটারি স্টেট হিসেবে শেষ সফর। কারণ, তিনি মেয়াদ শেষে অবসর গ্রহণের ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। ওবামা দ্বিতীয় মেয়াদে রাষ্ট্রপতি হলে অথবা রিপাবলিকান প্রশাসন হলেও যুক্তরাষ্ট্রের ভারত মহাসাগরীয় নীতিতে পরিবর্তন হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এতদঞ্চলে চীনই থাকবে প্রতিপক্ষ। কাজেই এতদঞ্চলে ত্রিশক্তির অবস্থান নিয়েই প্রতিযোগিতা যেমন বাড়বে, তেমনি বাড়বে সামরিক শক্তি প্রদর্শন। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো ছোট এবং দুর্বল রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কেমন হলে দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি ও নিরাপত্তা সহায়ক হবে, তার রূপরেখা জাতীয় মতৈক্যের ভিত্তিতে রচিত হওয়া বাঞ্ছনীয়।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত
হোসেন : সাবেক নির্বাচন কমিশনার
ভূরাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক
 

No comments

Powered by Blogger.