যথাসময়ে বাস্তবায়নে বাড়তি উদ্যোগ প্রয়োজন-গ্যাস খাতের নানা পরিকল্পনা
দেশের জ্বালানি খাতের সামগ্রিক যে সংকট, গ্যাসের ক্ষেত্রে তা ভিন্ন কিছু নয়। প্রতিদিন প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি নিয়েই চলতে হচ্ছে এখন। মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর এই খাতের সমস্যা সমাধানে যেসব পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, দীর্ঘসূত্রতার খপ্পরে পড়ায় সহসাই সে সংকট কাটবে না। গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো যাচ্ছে না, অথচ চাহিদা বেড়ে চলেছে, এই বাস্তবতায় সংকট সামনের দিনগুলোতে আরও বাড়বে—এই আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে।
মানতে হবে, বর্তমানে গ্যাসসংকট যে চরম আকার ধারণ করেছে, তার মূলে রয়েছে ২০০০ সাল থেকে প্রায় সাত বছর গ্যাস খাতের উন্নয়ন বা চাহিদা বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া। গ্যাস খাতের সংকট কাটাতে বর্তমান সরকার যেসব পরিকল্পনা নিয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম অঞ্চলের ঘাটতি দূর করতে এলএনজি আমদানি, নতুন গ্যাসকূপ খনন, গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া, নতুন পাইপলাইন স্থাপন ও গ্যাসের চাপ ঠিক রাখতে কম্প্রেসার বসানো। এ ক্ষেত্রেও আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি।
তরল গ্যাস আমদানি করে তা চট্টগ্রাম অঞ্চলে ২০১৩ সালের মধ্যে সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদে কাতার থেকে এলএনজি আমদানির প্রাথমিক সমঝোতা। আমদানির পাশাপাশি তা সরবরাহের জন্য প্রয়োজন মহেশখালীতে একটি ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণ ও চট্টগ্রাম পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণ। বর্তমানে এই টার্মিনাল নির্মাণের জন্য প্রাথমিকভাবে যোগ্য বিবেচিত কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলছে। চারটি কোম্পানিই মনে করছে, সরকার নির্ধারিত এই সময়ে কাজটি করা সম্ভব নয়।
নতুন গ্যাসকূপ খননের ব্যাপারে রাশিয়ার কোম্পানি গ্যাজপ্রমের সঙ্গে ১০টি কূপ খননের চুক্তি অনুস্বাক্ষর হয়েছে ২০ জানুয়ারি। চূড়ান্ত চুক্তি হতে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি লেগে যেতে পারে। অথচ এই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ২০১১ সালের মধ্যেই চুক্তি স্বাক্ষরের কথা ছিল। চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি পিছিয়ে যাওয়া মানে নতুন গ্যাসকূপ খননের বিষয়টিই পিছিয়ে যাওয়া। গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগের পাশাপাশি এর সরবরাহব্যবস্থাটি সুষ্ঠু করাও জরুরি। সে লক্ষ্যে অপরিহার্য হিসেবে বিবেচিত তিনটি বড় পাইপলাইন বসানোর কাজ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও সেই একই বিলম্ব। একটির মাত্র চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে, ২০১৩ সালের মধ্যে তা বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। বাকি দুটির মধ্যে একটি এখনো একনেকের অনুমোদনই পায়নি। পরিকল্পনা সত্ত্বেও যথাসময়ে বাস্তবায়ন করতে না পারার বিষয়টিকে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর ব্যর্থতা ও অদক্ষতা হিসেবেই দেখতে হচ্ছে। দেশের জ্বালানিসংকট যে পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে, তাতে এসব ক্ষেত্রে বাড়তি উদ্যোগ জরুরি।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী কয়লা সম্পদ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন, তা কতটা বাস্তবসম্মত তা-ও ভেবে দেখার বিষয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশের কয়লা মাটির নিচে রেখে বাইরে থেকে কয়লা আমদানি করে ক্রমবর্ধমান জ্বালানির চাহিদা মেটানো যাবে না। অতএব বাস্তবতার আলোকেই জ্বালানিনীতি গ্রহণ এবং তার সুষ্ঠু বাস্তবায়নই কাম্য।
No comments