বীর মুক্তিযোদ্ধা-তোমাদের এ ঋণ শোধ হবে না
২৯৪ স্বাধীনতার চার দশক উপলক্ষে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ধারাবাহিক এই আয়োজন। শহীদ হাবিবুর রহমান, বীর প্রতীক বীরের মতো লড়ে শহীদ হলেন তিনি পাকিস্তানি সেনারা গুলির আওতায় আসামাত্র গর্জে উঠল হাবিবুর রহমানের অস্ত্র। তাঁর সহযোদ্ধাদের অস্ত্রও একসঙ্গে গর্জে উঠল। আকস্মিক আক্রমণে হকচকিত পাকিস্তানি সেনারা। তবে দ্রুতই তারা এ অবস্থা কাটিয়ে পাল্টা আক্রমণ শুরু করল।
শুরু হয়ে গেল দুই পক্ষের তুমুল যুদ্ধ। গোলাগুলিতে গোটা এলাকা প্রকম্পিত। হাবিবুর রহমান সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করছেন। হঠাৎ পাকিস্তানি সেনাদের কয়েকটি গুলি এসে লাগল তাঁর শরীরে। ঢলে পড়লেন মাটিতে। রক্তে ভিজতে থাকল মাটি। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিভে গেল তাঁর জীবনপ্রদীপ। এ ঘটনা শেরপুর গ্রামে। ১৯৭১ সালের ২৬ নভেম্বর।
শেরপুর গ্রাম কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর উপজেলার অন্তর্গত। সেপ্টেম্বর মাসের পর মুক্তিযোদ্ধারা ভারত থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে বৃহত্তর কুষ্টিয়া অঞ্চলে একের পর এক গেরিলা অপারেশন করতে থাকেন। অবস্থানগত কারণে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের বিভিন্ন স্থানে ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন অস্থায়ী ক্যাম্প। মুক্তিযোদ্ধারা এসব ক্যাম্পে অবস্থান করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের এ দেশীয় সহযোগী রাজাকারদের ওপর প্রায়ই ঝটিকা আক্রমণ চালাতেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২৬ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ছোট দল শেরপুরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর টহল দলের ওপর আকস্মিক আক্রমণ চালায়।
মুক্তিযোদ্ধারা সেখানে অ্যামবুশ (ফাঁদ) পেতে অপেক্ষা করছিলেন। পাকিস্তানি সেনারা অ্যামবুশের মধ্যে আসামাত্র মুক্তিযোদ্ধারা একযোগে গুলি শুরু করেন। আকস্মিক আক্রমণে পাকিস্তানি সেনারা প্রথম হকচকিত হয়ে পড়ে। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই সুবিধাজনক অবস্থান নিয়ে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। দুই দলের মধ্যে অনেকক্ষণ যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে হাবিবুর রহমান যথেষ্ট বীরত্ব ও সাহস প্রদর্শন করেন।
মুক্তিযোদ্ধারা ছিলেন সংখ্যায় কম। উন্নত অস্ত্রশস্ত্রও তেমন ছিল না। অন্যদিকে পাকিস্তানি সেনারা ছিল ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। যুদ্ধের একপর্যায়ে পাকিস্তানি সেনারা বেপরোয়াভাবে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। তখন মুক্তিযোদ্ধারা কিছুটা বেকায়দায় পড়ে যান। এমন অবস্থায় হাবিবুর রহমানসহ কয়েকজন সাহসিকতার সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাদের মোকাবিলা করছিলেন। তাঁদের সাহসিকতায় পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণের তীব্রতা কিছুটা কমে যায়। পরিস্থিতি যখন মুক্তিযোদ্ধাদের অনুকূলে আসছে, ঠিক তখনই হঠাৎ গুলিবিদ্ধ হন হাবিবুর রহমান। পাকিস্তানিদের হাতে ধরা পড়েন তাঁর এক সহযোদ্ধা। গুলিবিদ্ধ হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই হাবিবুর রহমানের জীবনপ্রদীপ নিভে যায়। পরে গ্রামবাসীরা তাঁর মরদেহ সমাহিত করেন। শেরপুর ছিল হাবিবুর রহমানের নিজ গ্রাম।
হাবিবুর রহমান ১৯৭১ সালে পড়াশোনা করতেন। দৌলতপুর উপজেলার বাড়াগাংদিয়া হাইস্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে জুন মাসের প্রথম দিকে ভারতে গিয়ে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন। প্রশিক্ষণ শেষে যুদ্ধ করেন ৮ নম্বর সেক্টরের শিকারপুর সাব সেক্টরে। কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর, মিরপুর, গাংনী উপজেলার বিভিন্ন স্থানে তিনি সাহসিকতার সঙ্গে গেরিলা যুদ্ধ করেন।
মুক্তিযুদ্ধে সাহস ও বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য শহীদ হাবিবুর রহমানকে মরণোত্তর বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৩ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী তাঁর বীরত্বভূষণ নম্বর ৩৭৩।
শহীদ হাবিবুর রহমানের পৈতৃক বাড়ি কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর উপজেলার শেরপুর গ্রামে। তিনি অবিবাহিত ছিলেন। তাঁর বাবার নাম মেহের আলী মণ্ডল। মা রাহেলা বেগম। শহীদ হাবিবুর রহমানের ছবি পাওয়া যায়নি।
সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর ৮ এবং স্বাধীনতাযুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা, মো. আবদুল হান্নান।
গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান
trrashed@gmail.com
শেরপুর গ্রাম কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর উপজেলার অন্তর্গত। সেপ্টেম্বর মাসের পর মুক্তিযোদ্ধারা ভারত থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে বৃহত্তর কুষ্টিয়া অঞ্চলে একের পর এক গেরিলা অপারেশন করতে থাকেন। অবস্থানগত কারণে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের বিভিন্ন স্থানে ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন অস্থায়ী ক্যাম্প। মুক্তিযোদ্ধারা এসব ক্যাম্পে অবস্থান করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের এ দেশীয় সহযোগী রাজাকারদের ওপর প্রায়ই ঝটিকা আক্রমণ চালাতেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২৬ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ছোট দল শেরপুরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর টহল দলের ওপর আকস্মিক আক্রমণ চালায়।
মুক্তিযোদ্ধারা সেখানে অ্যামবুশ (ফাঁদ) পেতে অপেক্ষা করছিলেন। পাকিস্তানি সেনারা অ্যামবুশের মধ্যে আসামাত্র মুক্তিযোদ্ধারা একযোগে গুলি শুরু করেন। আকস্মিক আক্রমণে পাকিস্তানি সেনারা প্রথম হকচকিত হয়ে পড়ে। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই সুবিধাজনক অবস্থান নিয়ে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। দুই দলের মধ্যে অনেকক্ষণ যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে হাবিবুর রহমান যথেষ্ট বীরত্ব ও সাহস প্রদর্শন করেন।
মুক্তিযোদ্ধারা ছিলেন সংখ্যায় কম। উন্নত অস্ত্রশস্ত্রও তেমন ছিল না। অন্যদিকে পাকিস্তানি সেনারা ছিল ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। যুদ্ধের একপর্যায়ে পাকিস্তানি সেনারা বেপরোয়াভাবে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। তখন মুক্তিযোদ্ধারা কিছুটা বেকায়দায় পড়ে যান। এমন অবস্থায় হাবিবুর রহমানসহ কয়েকজন সাহসিকতার সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাদের মোকাবিলা করছিলেন। তাঁদের সাহসিকতায় পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণের তীব্রতা কিছুটা কমে যায়। পরিস্থিতি যখন মুক্তিযোদ্ধাদের অনুকূলে আসছে, ঠিক তখনই হঠাৎ গুলিবিদ্ধ হন হাবিবুর রহমান। পাকিস্তানিদের হাতে ধরা পড়েন তাঁর এক সহযোদ্ধা। গুলিবিদ্ধ হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই হাবিবুর রহমানের জীবনপ্রদীপ নিভে যায়। পরে গ্রামবাসীরা তাঁর মরদেহ সমাহিত করেন। শেরপুর ছিল হাবিবুর রহমানের নিজ গ্রাম।
হাবিবুর রহমান ১৯৭১ সালে পড়াশোনা করতেন। দৌলতপুর উপজেলার বাড়াগাংদিয়া হাইস্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে জুন মাসের প্রথম দিকে ভারতে গিয়ে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন। প্রশিক্ষণ শেষে যুদ্ধ করেন ৮ নম্বর সেক্টরের শিকারপুর সাব সেক্টরে। কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর, মিরপুর, গাংনী উপজেলার বিভিন্ন স্থানে তিনি সাহসিকতার সঙ্গে গেরিলা যুদ্ধ করেন।
মুক্তিযুদ্ধে সাহস ও বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য শহীদ হাবিবুর রহমানকে মরণোত্তর বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৩ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী তাঁর বীরত্বভূষণ নম্বর ৩৭৩।
শহীদ হাবিবুর রহমানের পৈতৃক বাড়ি কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর উপজেলার শেরপুর গ্রামে। তিনি অবিবাহিত ছিলেন। তাঁর বাবার নাম মেহের আলী মণ্ডল। মা রাহেলা বেগম। শহীদ হাবিবুর রহমানের ছবি পাওয়া যায়নি।
সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর ৮ এবং স্বাধীনতাযুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা, মো. আবদুল হান্নান।
গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান
trrashed@gmail.com
No comments