ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী মাহবুবুল আলম-সাঈদীর নির্দেশে হিসাব বালীকে হত্যা করা হয়

কাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধে পিরোজপুরে গণহত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, অগি্নসংযোগ, জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে। গতকাল বুধবার সাক্ষ্যগ্রহণের প্রথম দিনে পিরোজপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোঃ মাহবুবুল আলম হাওলাদার যুদ্ধকালীন সময়ের প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সাঈদীর মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড আদালতে


তুলে ধরেন। এ সময় কাঠগড়ায় সাঈদী উপস্থিত ছিলেন।\সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে মাহবুবুল আলম হাওলাদার কাঠগড়ায় দাঁড়ানো সাঈদীকে শনাক্ত করে বলেন, 'মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় আমি তার বিচার চাই। ন্যায্য বিচার চাই।' আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হকের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চে গতকাল এ সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। পরে দ্বিতীয় সাক্ষী মুক্তিযোদ্ধা রুহুল আমিন নবীন সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান শুরু করলেও সময় স্বল্পতার কারণে বিকেল ৪টার দিকে আদালতের কার্যক্রম মুলতবি করা হয়। আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় আদালত আবার বসবে।
এর আগে সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে সাঈদীর বিরুদ্ধে বিচার কার্যক্রম শুরু হলে তার আইনজীবী তাজুল
ইসলাম সাক্ষ্যগ্রহণ মুলতবি রাখাসহ নতুন চারটি আবেদন আদালতের নজরে আনেন। এর মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষের কাছে সাঈদীর বিরুদ্ধে থাকা অব্যবহৃত তথ্য-প্রমাণ ও জব্দ তালিকা চেয়ে করা দুটি আবেদন শুনানি শেষে খারিজ করা হয়। এ ছাড়া তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহে পিরোজপুরে যাওয়ার পর সাঈদীর আইনজীবীদের নিরাপত্তার বিষয়ে করা আবেদনে ট্রাইব্যুনাল স্থানীয় পুলিশ সুপারকে আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। পরে অপর এক আবেদনে সাঈদীর পক্ষের সাক্ষীদের নামের তালিকা আগামী ১৪ ডিসেম্বর দাখিল করার নির্দেশ দিয়ে সময় মঞ্জুর করেন ট্রাইব্যুনাল।
সাক্ষ্যগ্রহণ : কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সাক্ষী মাহবুবুল আলম হাওলাদার তার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে বলেন, একাত্তরের ৭ মে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৫২ সদস্য ২৬টি রিকশাযোগে পিরোজপুরের পাড়েরহাট বন্দরে এসে পেঁৗছায়। এর আগেই পিরোজপুরে মাওলানা মোসলেহ উদ্দিন, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মহসিন হাওলাদার, সুবহান মাওলানা, হাকিম কস্ফারী, বিভিন্ন মাদ্রাসার ছাত্র ও স্বাধীনতাবিরোধীদের নিয়ে গঠিত হয় শান্তি কমিটি। এ শান্তি কমিটিই পাক হানাদার বাহিনীকে অভ্যর্থনা জানায়। এর জন্য ফকির দাসের বাড়ির পাশে গঠিত হয় রাজাকার ক্যাম্প। সেখানেই নিয়ে যাওয়া হয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে। তিনি আরও বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ওইদিন সকালবেলা খবর পেয়ে পাড়েরহাট বাজারের কাছে আড়ালে থেকে অভ্যর্থনাসহ এসব কর্মকাণ্ড তিনি প্রত্যক্ষ করেন। তিনি জানান, আটক সাঈদী উর্দু ভাষায় পারদর্শী হওয়ায় অন্যদের চেয়ে পাক হানাদার বাহিনীর ক্যাপ্টেন এজাজের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে। সাঈদীর পরামর্শেই ক্যাপ্টেন এজাজের বাহিনী পাড়েরহাট বাজারের আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধ সমর্থকদের দোকান, বসতঘরে লুটপাট এবং অগি্নসংযোগ চালায়। অবস্থা বেগতিক দেখে তিনি এলাকা ছেড়ে চলে যান। পরে জানতে পারেন, ৩০-৩৫টি দোকান ও বসতঘরে লুটপাট চালিয়ে সাঈদী এবং তার বাহিনী ভাগবাটোয়ারা করে নেয়।
মাহবুবুল আলম জানান, লুটের টাকা ও সম্পদ দিয়ে সাঈদী পাড়েরহাট বাজারে মদন সাহার বাড়িতে প্রায় ১৫ লাখ টাকার পাঁচ তহবিল গঠন করে।
তিনি জানান, সাঈদীর নেতৃত্বাধীন বাহিনী পাড়েরহাট চিথলিয়া গ্রামের মানিক পশারী ও তার ভাইয়ের নতুন বাড়ি এবং উমেদপুর গ্রামের হিন্দুপাড়ার চিত্ররঞ্জন তালুকদার, জহর তালুকদার, বিশা বালী, শুকুর বালীসহ আরও অনেকের বাড়িঘরে অগি্নসংযোগ করে লুটপাট চালায়। তিনি বলেন, সাঈদীর নেতৃত্বাধীন বাহিনী তার বাড়িতেও গিয়েছিল। আমার ও মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান জানার চেষ্টা চালায়। আমার ভাই তথ্য না দিলে তাকে অত্যাচার করা হয়। বাড়িতে লুটপাট ও অগি্নসংযোগ চালিয়ে স্বর্ণ ও নগদ টাকা লুট করে। লুটপাটের অনেক মাল সাঈদী তার শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে জমা রাখত।
হত্যা ও অগি্নসংযোগ : সাক্ষী জানান, সাঈদীর নির্দেশেই তার অনুগত বাহিনী ২ জুন হিসাব বালীকে নারিকেল গাছের সঙ্গে বেঁধে গুলি করে হত্যা করে। এ সময় জঙ্গলের মধ্যে অন্যদের মতো পালিয়ে থেকে প্রত্যক্ষ করি সাঈদী বলছে, 'ওটাকে যখন পেয়েছি, ওটাকে গুলি কর।' পরে দৌড়ে মাহতাব, আলতাব, লতিফসহ অন্যরা পালিয়ে জঙ্গলের ভেতরের দিকে গিয়ে আড়াল নিই।
সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে মাহবুবুল আলম আদালতে সাঈদীর বিরুদ্ধে অপরাধের কিছু নমুনা উপস্থাপন করেন। এগুলোর জব্দকৃত নমুনা তদন্ত কর্মকর্তার হেফাজতে আছে বলে ট্রাইব্যুনালকে জানানো হয়। বিকেল সাড়ে ৩টায় সাক্ষ্য প্রদান শুরু করেন রাষ্ট্রপক্ষের অপর সাক্ষী রুহুল আমিন নবীন। তিনি আদালতকে জানান একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কিভাবে মুক্তিযুদ্ধে জড়ালেন। সাঈদীর বিরুদ্ধে তিনি আজ বিস্তারিত উপস্থাপন করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
গতকাল ট্রাইব্যুনালের সাক্ষীদের বক্তব্য ধারণ করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। এ জন্য সাঈদী ও তার আইনজীবী এবং ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের তিনটি কম্পিউটার সরবরাহ করা হয়। এ ছাড়া বিচারকদের কাছেও ছিল তিনটি কম্পিউটার। ট্রাইব্যুনালের মধ্যে কয়েকজন কর্মচারী বসে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের কম্পিউটারে বক্তব্য হুবহু লিখতেন।
সাঈদীর আইনজীবীর হুমকি : ট্রাইব্যুনালে শুনানি চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করার বিষয়টি সাঈদীর আইনজীবী তাজুল ইসলামের প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, আদালত ব্যবস্থা না নেওয়ায় এ ঘটনা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে তাজুল ইসলামের আচরণগত সমস্যার বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের ত্রুটিও কম নয়। পাশে থেকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বিরূপ মন্তব্য করায় ব্যাহত হচ্ছে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম। গতকাল এ রকম একটি ঘটনায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের আসামিপক্ষের আইনজীবী তাজুল ইসলামের হুমকি ও দুর্ব্যবহারে আদালত উভয়পক্ষকে সতর্ক করে দিয়েছেন।

No comments

Powered by Blogger.