পুঁজিবাজারে সব ব্যাংকের বিনিয়োগই এখন আইনি সীমার নিচে by মজুমদার বাবু

লাগাতার দরপতনের কারণে পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ আইনি সীমার মধ্যে চলে এসেছে। ব্যাংকগুলোর শেয়ার ধারণ-সংক্রান্ত অক্টোবরভিত্তিক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে ব্যাংকগুলোর পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের দ্বার আবারও খুলে গেল। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকগুলো বিনিয়োগে কতখানি এগিয়ে আসবে, তা নির্ভর করবে বাজারের প্রতি তাদের আস্থার ওপর, যা তৈরির দায়িত্ব এসইসির।


সর্বশেষ হিসাবে সার্বিকভাবে ব্যাংকগুলোর পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ ৩.৩৩ শতাংশ। সে হিসাবে ব্যাংগুলো সামষ্টিকভাবে পুঁজিবাজারে মোট দায়ের ৬.৬৬ শতাংশ বিনিয়োগ করতে পারে। সর্বশেষ ৩০ সেপ্টেম্বরভিত্তিক ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুঁজিবাজারে মাত্র তিনটি ব্যাংকের বিনিয়োগ তাদের মোট দায়ের ৯ শতাংশের বেশি রয়েছে। এর মধ্যে আইএফআইসি ব্যাংকের ৯.৯৭ শতাংশ, ন্যাশনাল ব্যাংকের ৯.২৭ শতাংশ এবং দি সিটি ব্যাংকের ১১.৯০ শতাংশ। তবে অক্টোবর প্রতিবেদনে তাও কমে আইনি সীমার মধ্যে চলে এসেছে। কারণ এর মধ্যে দরপতন অব্যাহত থাকায় এমনিতেই ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা শেয়ারের দামও কমে গেছে।
ব্যাংক কম্পানি আইন অনুযায়ী ব্যাংকগুলো পুঁজিবাজারে তাদের মোট দায়ের ১০ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে পারবে। যেসব ব্যাংকের পুঁজিবাজারে ১০ শতাংশের বেশি বিনিয়োগ রয়েছে, তাদের ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বিনিয়োগ আইনি সীমার মধ্যে নামিয়ে আনতে হবে। সে হিসেবে দি সিটি ব্যাংক ওই সময় পর্যন্ত তাদের বিনিয়োগ আইনি সীমার মধ্যে নামিয়ে আনার সময় পাচ্ছে।
পুঁজিবাজারের অতিমূল্যায়িত এবং ঝুঁকিপূর্ণ বলে দুই বছর আগেই নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসিকে সতর্ক হওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০০৯ সালের নভেম্বর মাসে এসইসির সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে পুঁজিবাজার অতিমূল্যায়িত হয়ে থাকা এবং এ ব্যাপারে উদ্ভূত ঝুঁকির বিষয়ে এসইসিকে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকগুলোর পুঁজিবাজার কার্যক্রম সম্পর্কিত বিবিধ তথ্য সংগ্রহের জন্যে ৬ জুলাই ২০০৯ সালে এক সার্কুলার জারি করে প্রথম উদ্যোগ নেয়। বেশি মাত্রায় পুঁজিবাজার কার্যক্রমে লিপ্ত বেশ কয়েকটি ব্যাংকের সঙ্গে একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাপর্যায়ে বৈঠক করে ব্যাংকগুলোকে ব্যাংক কম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ২৬(২) ধারার বিধান অনুসারে নির্ধারিত শেয়ার ধারণসীমা মেনে চলার জন্য তাগাদা দেওয়া অব্যাহত রাখে। তখন এসব পদক্ষেপের জন্য তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে বাংলাদেশ ব্যাংক।
২০০৯ সালের ১৪ অক্টোবর এক সার্কুলার জারি করে ব্যাংকগুলোর মার্চেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্পর্কে নীতিমালা দেওয়াসহ জানুয়ারি ২০১০ মাসের মধ্যে মার্চেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পৃথক সাবসিডিয়ারি কম্পানি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়। মার্চেন্ট ব্যাংকিং ও ব্রোকারেজ কার্যক্রমকে ব্যাংক থেকে সম্পূর্ণ পৃথক করার লক্ষ্যে ১৫ জুন ২০১০ এক সার্কুলার জারি করা হয়। সবশেষে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের বৈঠকের পর বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার স্থিতিশীল করতে সব ব্যাংককেই বিনিয়োগ আইনি সীমার মধ্যে নামিয়ে আনতে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দেয়।
পুঁজিবাজারে কারসাজির কারণ খুঁজতে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান ড. খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ব্যাংকিং খাতকে সুরক্ষিত রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সব উদ্যোগই যথাযথ ছিল বলেই আমাদের কাছে মনে হয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক যদি আরো দুই-এক মাস আগেই ব্যাংকগুলোর এ বিনিয়োগ প্রবণতা পর্যবেক্ষণ করতে পারত, তাহলে ব্যাংকগুলোর লোকসান আরো কম হতে পারত। তবে সব মিলিয়েই বাংলাদেশ ব্যাংক যথাযথ উদ্যোগ নিতে পেরেছিল।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)-এর চেয়ারম্যান ও দি সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কে মাহমুদ সাত্তার বলেছেন, ব্যাংকগুলো বাজারে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। কিন্তু বাজারে ক্রেতা না থাকায় ব্যাংকগুলো সেভাবে বিনিয়োগ করতে পারছে না। কারণ ব্যাংককে শেয়ার ক্রয় করলে বিক্রয়ও করতে হবে। এর মাধ্যমে বাজারে লেনদেন হবে এবং বাজারে স্বাভাবিক পরিবেশ সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে করণীয় সব কিছুই তারা করেছে। বাকি কাজগুলো নিয়ন্ত্রকসহ সংশ্লিষ্ট অন্য সংস্থাগুলোকে করতে হবে।

No comments

Powered by Blogger.