সুস্বাদু ভাতের সন্ধানে by মুস্তাফা জামান আব্বাসী

রোজ একই ভাত। তাও সবাই গলাধঃকরণ করে চলেছি। রোজ কী নিয়ে লেখা যায়_ এটি সমস্যা বটে। মাছের অ্যাকুয়ারিয়ামে লাল-বাদামি-হলুদ-সাদা-কালো নানান মাছ। প্রতি সকালে খাবার দিতে গেলে ওরা কথা বলে ওঠে। রোজ এক খাবার আর ভালো লাগে না, নতুন কিছু ভাবতে পার না? বলি, এই খাবার কোত্থেকে সংগ্রহ হয় জানো? সেই জাপান থেকে প্যাকেটের মাধ্যমে, পাঁচ টাকার খাবার কিনছি ৫০ টাকা দিয়ে।


নিজে খাবার আগে তোমাদের কথাই ভাবি। যখন সবাই মিলে খাবার জন্য একসঙ্গে হও, খুব ভালো লাগে। এটুকু দেখার জন্যই এত আদরের অ্যাকুয়ারিয়াম।
তেমনি ১৫ কোটি মানুষের জন্য সেই একই ভাত একই ডাল খাবার সময় বিধাতা এসে দাঁড়ান। বলেন, তোমরা যখন খেতে বসো আর আমার কথা ভাবো, তখন আমার সবচেয়ে ভালো লাগে। এত মোটা বিশ্রী গন্ধযুক্ত চাল, তাও তোমরা কত অনায়াসে তৃপ্তিভরে খাচ্ছ, আমার সৃষ্টিজগতের সেরা হওয়া সত্ত্বেও। বড়লোক করে যাদের পাঠানো হয়েছে তারা পাচ্ছেন সরু চালের ভাত, নানা স্থান থেকে সংগৃহীত। কখনওবা দিনাজপুরের কয়েক ঘর কৃষকের বাড়ি থেকে, যারা অন্য চালের সঙ্গে না মিশিয়ে বেশি দামে চালান করেন কাটারিভোগ বড়লোকদের বাড়ি বাড়ি। দুষ্প্রাপ্য সে চাল। মৌলভীবাজারের আড়তেও তার দেখা মেলা ভার। বড় হোটেলের মেন্যুতে দেরাদুন রাইস, পাকিস্তানের বাসমতী_ দেখতে যেমন সুন্দর, ঘ্রাণও তেমনি। মাঝারি হোটেলে মিনিকেট, তাও সুস্বাদু। বড় ভাই পছন্দ করেন দিনাজপুরের কাটারিভোগ। বড় মেয়ে যিনি আমেরিকায় থাকেন তিনি খান দেরাদুন, আর আমি মোটা চাল। ডক্টর আশরাফ সিদ্দিকীর 'লোকসাহিত্যে' পাবেন ৮৪ রকম চালের কথা। ধান গবেষণার ফলে এখন আমরা চাইছি শুধু সেই চাল, যা পেট ভরাবে। মানুষ ভাত খায় কেন! পেট ভরাতে, তাই তো? পেট ভরে মোটা চালে; চিকন চালে নয়। ডাক্তার বললেন, আপনার সুগারের বর্তমান অবস্থায় মাত্র একটি চা-কাপের অতিরিক্ত ভাত খাওয়া চলবে না। যখন খিদে মিটবে অর্ধেক, চলে যাবেন ডালে। খিদে থাকতেই প্লেট গোটাবেন। অতিথি থাকলে খাওয়া বিলম্বি্বত করুন। প্লেটের পাশে পড়ে থাকা অবহেলিত দু'তিনটি ভাত তুলে খাবেন। ওর মধ্যেই রহমত, ওর মধ্যেই কল্যাণ। এটি মেনে চলছি।
গেলাম অদ্বৈত মল্লবর্মণের গ্রাম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস তীরে গোকর্ণঘাটের একটি মেলায়। ছোট ছোট বেতের কাজের ডালা ও ছোট হাঁড়িকুড়ি চিরদিনের শখ। হঠাৎ নজরে পড়ল নিমগাছটার তলায় হাত-পা ছড়িয়ে একজন মহিলা গাইছেন :
রাধে গো রাধে,
তোর লাগি মোর পরান কাঁদে;
নইলে কি আর কাল শশী
অতি সাধের চুড়া বাঁশি
ঐ চরণে তুলে দিল সাধে
রাধে গো রাধে ...
মুসা আহমেদকে বললাম, ক্যামেরা এদিকে আন।
যিনি গাইছেন তিনি কয়েক কুলো চালও রেখেছেন বিক্রির জন্য। ভাইফোঁটার জন্য অর্থের প্রয়োজন। মহিলা এসেছেন সামান্য পসরা নিয়ে ভাইকে ফোঁটা দিয়ে তার সব আপদ-বালাই দূর করে দিতে। 'ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা, জমের দূয়ারে পড়ল কাঁটা'। মহিলাকেই সংগ্রহ করলাম আমার 'ভরা নদীর বাঁকে' অনুষ্ঠানের জন্য। তিনি গাইলেন :
আশ্বিন যাইতে রে কার্তিক আসিতে রে
দ্বিতীয়ার চান্দে দিল দেখা
কাটিয়া কলার পাতি সাজাইয়া তৈলের বাতি
আশীর্বাদ বানাইল ভইন একা \ ...
পরের গান :
দ্বিতীয়ার চাঁদ দেখে ভইনের উল্লাস
এমন সময়কালে ভাইধন পরবাস ..
থাক থাক রাজ্যসভা এখানে বসিয়া
আমি আগে আসি গিয়া ভইনের ফোঁটা লইয়া ...
সর্বমোট সংগৃহীত ভাইফোঁটার গান ১৩টি। দিলাম কিছু অর্থ ও আমার সুন্দর পাঞ্জাবিটি, যেটি পরে 'ভরা নদীর বাঁকে' অনুষ্ঠান করেছি খানিকক্ষণ আগে। জামাটি তার বোনের কাছ থেকে ভাইফোঁটার সম্মানী হিসেবে পরেছিলেন কি-না জানতে পারিনি। মহিলা কিছুতেই আমার কাছ থেকে চালের টাকা নিলেন না। আমি যে তার ভাই, আপনের চেয়ে কম কিসে!
বাড়িতে ফিরে রান্না হলো। এত সুস্বাদু ভাত বহুদিন খাইনি।

মুস্তাফা জামান আব্বাসী : সাহিত্য-সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব
mabbasi@dhaka.net
 

No comments

Powered by Blogger.