আন্তর্জাতিক : নিরাপত্তা পরিষদে ফিলিস্তিন ইস্যু-নৈতিক জয়-পরাজয়ের লড়াই! by শ্রাবণ সরকার

পৃথিবী নামক এই গ্রহের প্রধান মাতব্বর যুক্তরাষ্ট্র যখন সদম্ভে ও প্রকাশ্যে বিরোধিতার ঘোষণা দেয়, তখন এ কথা বুঝতে কারো অসুবিধা থাকে না যে জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্যপদ পাওয়ার প্রশ্নে ফিলিস্তিনের আবেদনের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে! তবু এই 'নিশ্চিত' অনিশ্চয়তা ও মার্কিন হুমকি-ধমকি উপেক্ষা করেই জাতিসংঘের দরবারে হাজির হয়েছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ন্যায়বিচারের আশায়, অধিকার ও মর্যাদা পাওয়ার দাবিতে।


সংগত কারণেই প্রশ্ন ওঠে, 'চূড়ান্ত' বিজয় অধরা থাকবে জেনেও কেন ও পথ মাড়াতে গেল তারা?

বিজয়ের পথে এক ধাপ...
গত ৩১ অক্টোবর জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করেছে ফিলিস্তিন। বলা বাহুল্য, এই স্বীকৃতি ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য এক বিরাট সুসংবাদ। তাদের আ@ি@@@ক, আইনগত ও নৈতিক দাবির পক্ষে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের আন্তরিক সমর্থনেরই প্রকাশ এই সদস্যপদ প্রাপ্তি সংবাদ। এর প্রতিক্রিয়ায় যেমনটা বলেছেন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস, 'এ ঘটনার মধ্য দিয়ে অধিকার, ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতার বিজয় হয়েছে।' আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইউনেস্কোর সদস্যপদ লাভের মাধ্যমে স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা পাওয়ার পথে আরো এক ধাপ এগিয়ে গেল ফিলিস্তিন, অন্তত নৈতিকভাবে তো বটেই। নিরাপত্তা পরিষদের ভোটাভুটিতে নিজেদের পক্ষে নূ্যনতম প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভোট জোগাড়ে সমর্থ হলে আরেকটি নৈতিক বিজয়ের স্বাদ পাবে ফিলিস্তিন।

'তবুও ন্যায়ের পক্ষে...'
ইউনেস্কোর সদস্যপদ পাওয়ার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের রক্তচক্ষুকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েই ১০৭টি দেশ ফিলিস্তিনের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে ফিলিস্তিনের বিপক্ষে ভোট পড়ে মাত্র ১৪টি। বিরোধী শিবিরে অনিবার্যভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে ছিল তাদের পরম মিত্র ইসরায়েল, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও জার্মানির সমর্থন। ভোটদানে বিরত থেকেছে জাপান, ব্রিটেনসহ ৫২টি দেশ। বিশেষভাবে উল্লেখ করার কথা, তহবিল বন্ধের মার্কিন হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও ইউনেস্কো ফিলিস্তিনকে পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ দেওয়া-না দেওয়ার প্রশ্নে ভোটাভুটির আয়োজন করে। এতে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য দেশগুলোর সমর্থনের ভিত্তিতে ফিলিস্তিনকে সদস্যপদ দেয় বিশ্ব সংস্থাটি।

'নিষ্ঠুর' প্রতিশোধ!
এ ঘটনায় সংক্ষুব্ধ যুক্তরাষ্ট্র ওই দিনই ইউনেস্কোকে তাদের তহবিল বন্ধের ঘোষণা দেয়। ওয়াশিংটনের সাফ বক্তব্য, 'ফিলিস্তিনকে ইউনেস্কোর সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার লক্ষ্যে ভোটাভুটির আয়োজন দুর্ভাগ্যজনক। এটি একটি অপরিপক্ব সিদ্ধান্ত। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে উপেক্ষার শামিল এ ভোটাভুটি।' এ বক্তব্যের পক্ষে তাদের যুক্তি, শান্তি প্রক্রিয়ায় প্রকৃত অগ্রগতির জন্য ইসরায়েলের সঙ্গে ফিলিস্তিনের যে কঠিন দরকষাকষি হওয়া প্রয়োজন, ফিলিস্তিনের এ ধরনের সদস্যপদ প্রাপ্তির ব্যাপারটি তা ব্যাহত করবে।
ইউনেস্কোর মোট বাজেটের প্রায় এক-চতুর্থাংশের জোগান দেয় যুক্তরাষ্ট্র। সুতরাং তাদের অর্থ বরাদ্দ বন্ধ করার ঘোষণা প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতাকে অনেকখানি দুর্বল করবে নিঃসন্দেহে। চলতি মাসেই ইউনেস্কোকে ছয় কোটি ডলার দেওয়ার কথা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। আপাতত তারা তা দেবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে।

'প্রতিশোধের বলি...'
বলা বাহুল্য, যুক্তরাষ্ট্রের 'নিষ্ঠুর' এ প্রতিশোধের বলি হবে পুরো বিশ্ব, বিশেষ করে অনুন্নত ও গরিব দেশগুলোতে ইউনেস্কোর শিক্ষা কার্যক্রম, বিজ্ঞানের অগ্রগতি এবং সংস্কৃতির লালন ও বিকাশবিষয়ক কর্মসূচি। স্বভাবতই প্রশ্ন তোলা যায়, বিশ্ব দরবারে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও আদর্শের ঝাণ্ডা তুলে ধরা যুক্তরাষ্ট্রের তহবিল বন্ধের এই সিন্ধান্ত কতটা যৌক্তিক ও ন্যায়সংগত? নিয়ম অনুযায়ী বেশির ভাগ দেশের সমর্থনের ভিত্তিতে ফিলিস্তিনকে সদস্যপদ দিয়েছে ইউনেস্কো। এর বাইরে আর কী-ই বা করার ছিল সংস্থাটির! কিন্তু তাদের দিক থেকে সহযোগিতার হাত ফিরিয়ে নেওয়া মানে তো কেবল ইউনেস্কোকে একা শায়েস্তা করা নয় অথবা 'বেয়াড়া' ফিলিস্তিনকে এককভাবে শিক্ষা দেওয়া নয়! সংস্থাটির কার্যক্রম স্থবির হওয়া মানে বিশ্বের অধিকাংশ দেশের বঞ্চিত হওয়া, ক্ষতির মুখে পড়া। বিষয়টি কি ওয়াশিংটন একবারও ভেবে দেখেছে?

'বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়'
ইউনেস্কোর সদস্যপদ পাওয়ার চেষ্টা করলে ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে রেখেছিল ইসরায়েল। সেই মতো তারা এরই মধ্যে অধীকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ইহুদি বসতি নির্মাণ ত্বরান্বিত করার ঘোষণা দিয়েছে। তবে ইহুদি রাষ্ট্রটির এ সিদ্ধান্তে তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র পশ্চিমা বিশ্বই নাখোশ হয়েছে সর্বাগ্রে। 'হিতাহিত-জ্ঞানহীন' ইসরায়েলি এই প্রতিশোধমূলক সিদ্ধান্তের সমালোচনায় সরব হয়েছে খোদ যুক্তরাষ্ট্রও। দেশটির ভাষ্য, ইসরায়েলের এ সিদ্ধান্তে 'গভীরভাবে হতাশ' তারা। ইউরোপীয় ইউনিয়নও (ইইউ) এ ব্যাপারে তাদের গভীর উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। তারা মনে করে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ইসরায়েলের বসতি নির্মাণ কার্যক্রম অবৈধ, যা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি স্থাপনের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান বাধা। তাই বসতি নির্মাণ কার্যক্রম গতিশীল করার সিদ্ধান্ত বদলাতে ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তারা। কাঙ্ক্ষিত শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে আলোচনার টেবিলে ফিরতেও আহ্বান জানিয়েছে ইউনিয়নটি। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানিরও স্পষ্ট মত, ইহুদি বসতি স্থাপন প্রক্রিয়ার গতি ত্বরান্বিত করার ব্যাপারে ইসরায়েলি ঘোষণা শান্তি প্রক্রিয়াকে অবশ্যই বাধাগ্রস্ত করবে, ব্যাহত করবে। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনও প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, গভীরভাবে উদ্বিগ্ন তিনি। বসতি নির্মাণ কর্মকাণ্ড বন্ধের জন্য ইসরায়েলের প্রতি আহ্বানও জানান মহাসচিব।

'প্রাপ্তিতেও প্রলম্বিত বঞ্চনা...'
ইউনেস্কোর সদস্যপদ পাওয়ার মধ্য দিয়ে এই প্রথম জাতিসংঘের অধীনস্থ কোনো সংস্থার পূর্ণাঙ্গ সদস্যের মর্যাদা পেল ফিলিস্তিন। কাজেই এক কথায় এটি তাদের জন্য বিরাট অর্জন এবং অবশ্যই গৌরবের। একই সঙ্গে এই সদস্যপদ লাভের মধ্য দিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে ফিলিস্তিনি আবেদন অনুমোদনের ভবিষ্যৎ আরো বেশি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। চলতি মাসেই কোনো একসময় নিরাপত্তা পরিষদের এ ব্যাপারে ফয়সালার লক্ষ্যে বৈঠকে বসার কথা। এরই মধ্যে পরিষদের সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত গুরুত্বপূর্ণ একটি কমিটি এ ইস্যুতে দুই দফা আলোচনায় বসেছে। তবে শেষতক তারা মতৈক্যে পেঁৗছতে পারেনি বলেই জানা গেছে। এ নিয়ে বিভক্ত কমিটি। ফলে ফিলিস্তিনের আকাশে দুর্ভাগ্যের কালো মেঘ এখনই কাটছে না, প্রকারান্তরে তা আরো ঘনীভূত হওয়ারই লক্ষণ দেখা যাচ্ছে বৈকি! যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগের হুমকির পর যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কলম্বিয়াও এ ব্যাপারে ভোটদানে বিরত থাকার ঘোষণা দিয়েছে। গত ৩ নভেম্বর তাদের এ ঘোষণার পর কার্যত ফিলিস্তিনের সদস্যপদ নিশ্চিত করার ব্যাপারটি জটিল আবর্তের পাকেচক্রে জড়িয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র তো আগেই এ ব্যাপারে তাদের ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগের ঘোষণা দিয়ে রেখেছে।

'হিসাব-নিকাশের খতিয়ান'
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য রাষ্ট্রের সংখ্যা ১৫। এর মধ্যে স্থায়ী পাঁচ সদস্য রাষ্ট্র হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন। পরিষদে কোনো একটি প্রস্তাব উত্থাপিত হলে তার ফয়সালায় ভোটাভুটির আয়োজন করা হয়। সে ক্ষেত্রে প্রস্তাবটি পাসের জন্য পক্ষে নূ্যনতম ৯টি ভোটের প্রয়োজন। কোনো স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র প্রস্তাবের বিপক্ষে ভেটো দেওয়ার মানে ওই প্রস্তাব আর আলোর মুখ দেখবে না।

'মিত্র-অমিত্র'
ফিলিস্তিনি আবেদনের পক্ষে নিরাপত্তা পরিষদের ছয় সদস্য রাষ্ট্র ব্রাজিল, চীন, ভারত, রাশিয়া, লেবানন ও দক্ষিণ আফ্রিকা তাদের স্পষ্ট সমর্থনের কথা জানিয়েছে। কূটনীতিকরা মনে করেন, জার্মানি এ ব্যাপারে ভোটদানে বিরত থাকতে পারে অথবা বিপক্ষেও ভোট দিতে পারে। তবে তাদের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার আশঙ্কার পাল্লাই ভারী বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরিষদের অন্য সদস্য পর্তুগাল তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেনি। তবে এ দেশটিও ভোটদানে বিরত থাকতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের অনুমান। তবে গ্যাবোন ও নাইজেরিয়া ফিলিস্তিনকে সমর্থন দিতে পারে বলে কূটনীতিকরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করেছিলেন।
নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির ফিলিস্তিনি ইস্যুতে পরপর দুই দফা আলোচনার অগ্রগতি বিশ্লেষণে কূটনীতিকরা অনেকটা নিশ্চিত যে চূড়ান্ত পর্যায়ে ফিলিস্তিনের পক্ষে হয়তো ছয়টির বেশি ভোট পড়বে না!
ইউনেস্কোর সদস্যপদ পাওয়ার ব্যাপারে ফিলিস্তিনের পক্ষে ভোট দিয়েছিল ফ্রান্স। এর পর ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের মনে আশা উস্কে ওঠে, নিরাপত্তা পরিষদের ফয়সালার দিন হয়তো ফিলিস্তিনের পক্ষে দাঁড়াবে তারা। তবে সে আশার গুড়ে ইতিমধ্যে কাঁকর পড়েছে দেশটির ঘোষণায়। ভোটদানে বিরত থাকার কথা জানিয়েছে তারা। সম্প্রতি ফ্রান্সের কান শহরে অনুষ্ঠিত জি-টুয়েন্টি সম্মেলনের এক ফাঁকে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় বসেছিলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। সে সময় ইউনেস্কোর সদস্যপদের ব্যাপারে ফিলিস্তিনের পক্ষে ফ্রান্সের ভোট দেওয়ায় নিজের অসন্তুষ্টির কথা জানান ওবামা। ওই বৈঠকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে 'মিথ্যাবাদী' বলে নিজের মনের ঝালও ঝাড়েন সারকোজি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মন রক্ষায় শেষতক ইসরায়েলের পক্ষেই নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট।

'নৈতিক জয়-পরাজয়!'
আখেরে হিসাবের খাতা ফাঁকা থাকলেও প্রাপ্তিযোগ শূন্য বলে মানেন না অনেকেই! জাতিসংঘের সদস্যপদ পাওয়ার প্রশ্নে ফিলিস্তিনি ইস্যুতেও অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, নিরাপত্তা পরিষদে দেশটির প্রস্তাব পাস না হলেও শেষতক নৈতিক জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে তাদের! যুক্তরাষ্ট্রের হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও যদি ফিলিস্তিনের ঝোলায় কোনোভাবে ৯টি ভোট জমা হয়, তবে তা দেশটির জন্য বিরাট এক নৈতিক জয় হিসেবেই পরিগণিত হবে। আর সে অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র পড়বে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে। তখন ফিলিস্তিনকে ঠেকাতে ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকবে না তাদের। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যদি তা-ই হয়, তবে তা হবে যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক পরাজয়! আর ইসরায়েল? লজ্জায় তাদেরও নাক কাটা যাবে!
sarkar.shraban@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.