চারুকলায় নবান্ন উৎসব আজ-এল ঘ্রাণময় অগ্রহায়ণ by নওশাদ জামিল

ধুনিক বাংলা কবিতার পথপ্রদর্শক কবি জীবনানন্দ দাশ হেমন্তকে কেন এত ভালোবেসেছিলেন কে জানে!তাঁর কাছে হেমন্ত ছিল 'ঋতুর রাজা', বসন্ত নয় কিংবা বর্ষাও নয়। জীবনানন্দের সত্তাজুড়ে ছিল কার্তিক-অগ্রহায়ণের ইন্দ্রিয়াতুর রূপ, গন্ধ ও স্পর্শময় অনুভূতি। বোধ হয়, জীবনানন্দের আগে আর কোনো বাঙালি কবি হেমন্ত ঋতুর গুপ্ত সৌন্দর্য ও ঐশ্বর্যকে এমন সূক্ষ্মভাবে কবিতায় তুলে আনেননি।


'অবসরের গান' কবিতায় তিনি যখন লেখেন 'চারিদিকে নুয়ে পড়ে ফলেছে ফসল/তাদের স্তনের থেকে ফোঁটা ফোঁটা পড়িতেছে শিশিরের জল/প্রচুর শস্যের গন্ধ থেকে-থেকে আসিতেছে ভেসে', তখন বোঝা যায়, এ দৃশ্য অগ্রহায়ণের। এ অনুভূতি নতুন ফসলের, নবান্ন উৎসবের। কবির প্রিয় ওই অগ্রহায়ণ এসে গেল প্রকৃতিতে।
১৪১৮ বঙ্গাব্দের পহেলা অগ্রহায়ণ আজ মঙ্গলবার। এ দিনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে শুরু হবে উৎসবের ধুম। চারুকলায় আজ সকালে বসবে জাতীয় নবান্ন উৎসবের বর্ণিল আয়োজন। 'নিজের গোলায় তুলব ধান, গাইব গান, ভরবে প্রাণ'_ফসল কাটা ও ঘরে তোলার এক আনন্দের মৌসুম শুরু হলো বাংলার প্রকৃতিতে। এ আনন্দ গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে নিয়ে এলো নবান্নের বার্তাও। কৃষকের গোলায় আজ থেকে উঠবে নতুন ধান। নতুন ধানের গন্ধে নেচে-গেয়ে উঠবে কৃষাণ-কৃষাণী।
বরেণ্য কবি আল মাহমুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, 'শরৎকালীন আবহাওয়াকে দ্রুত পেছনে ফেলে দিয়ে এ মাসটি এসে নতুন ফসল, শীতের সব শাক-শস্য-তরিতরকারি এবং মাছ-মাংস নিয়ে হাজির হয়। এ মাসে সব মাছই স্বাদযুক্ত হয়। নিশান উড়িয়ে দেয় ভোজনবিলাসীদের খাদ্যের দস্তরখানি। এ ছাড়া পিঠা-পায়েস তো আছেই। অগ্রহায়ণ মনে হয় খুব দ্রুত আসে এবং খুব তাড়াহুড়ো করে শীতের জনশূন্য রাস্তায় অন্তর্হিত হয়।'
স্বল্প সময়ের জন্য এলেও বাতাসে অগ্রহায়ণের ঘ্রাণ পাওয়া যাচ্ছে কিছু দিন ধরেই। তবে তা ঢাকায় নয়, গ্রামে। নগরে আজ উৎসব হলেও প্রকৃত বিষয় হলো অগ্রহায়ণের রূপ ও উৎসব শহরকেন্দ্রীক নয়। শহরজুড়ে শীতের সামান্য আমেজ থাকলেও শস্যভরা, ঘ্রাণময় অগ্রহায়ণ এখানে নেই। এর পরও হাজার বছরের ঐতিহ্যকে মনে রেখে শহরেও নবান্ন উৎসব হবে_তা বড় আনন্দের।
অগ্রহায়ণ বাংলা সনের অষ্টম এবং শকাব্দের নবম মাস। প্রাচীন বাংলা ভাষায় এ মাসটিকে আঘন নামে চিহ্নিত করা হতো। 'অগ্রহায়ণ' শব্দের অর্থবছরের যে সময় শ্রেষ্ঠ ব্রীহি (ধান) উৎপন্ন হয়। অতীতে অগ্রহায়ণে প্রচুর ধান উৎপাদিত হতো বলেই একে ধরা হতো বছরের প্রথম মাস।
বাঙালি হিন্দু সমাজের বিশ্বাস অনুযায়ী, অগ্রহায়ণ মাস বিবাহের পক্ষে বিশেষ শুভ মাস। পশ্চিমবঙ্গের লোকসমাজে অগ্রহায়ণ মাসকে 'লক্ষ্মীর মাস' মনে করা হয়। এ ছাড়া অগ্রহায়ণ মাসে নবান্ন উৎসব ও লক্ষ্মীপূজার বিশেষ আয়োজন তো ঐতিহ্যেরই অনুষঙ্গ।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, একসময় অগ্রহায়ণই ছিল বাংলা বছরের প্রথম মাস। ফসল তোলার উৎসব ও নববর্ষের উৎসব_এই দুই উৎসব ধারণ করে অগ্রহায়ণ বিশাল বাংলার জনজীবন প্রতিষ্ঠিত ছিল দীর্ঘকাল। এ প্রসঙ্গে কবি ও প্রাবন্ধিক আহমদ রফিক বলেন, 'অগ্রহায়ণ মাসকে বছর শুরুর মাসের মর্যাদা ছেড়ে দিতে হলো মোঘল সম্রাটের হিসাব-নিকাশের কারণে। আর বছর শুরুর জয়ের টিপ পড়ানো হলো রুদ্র বৈশাখের কপালে। সম্রাটের খাজনা আদায়ের হিসাবের পাল্লা ভারী হোক বা না হোক, আবহাওয়া ও পরিবেশের বিচারে বৈশাখ কিন্তু এ দেশে উৎসব অনুষ্ঠানের উপযোগী মাস নয়। কড়া রোদ, গুমট গরম, মাঝেমধ্যে কালবৈশাখী ঝড়ের তাণ্ডব নিয়ে সময়টা মোটেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অনুকূল নয়, উপভোগ্য তো নয়ই। সে তুলনায় অগ্রহায়ণের শীতের আমেজমাখা রোদ, আকাশে গাঢ় নীলের বিস্তার, বাতাসের গরম ছোঁয়া সবকিছুই যেন নববর্ষ বা যে কোনো অনুষ্ঠানের উপযুক্ত সময়।'
চারুকলায় নবান্ন উৎসব আজ : প্রতিবছরের মতো এবারো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় বসছে 'নবান্ন উৎসব'। উৎসবের আয়োজন করেছে জাতীয় নবান্নোৎসব উদ্যাপন পর্ষদ। সকাল ৭টা ১ মিনিট থেকে নবান্ন উৎসবের সূচনা হবে। 'নবান্ন উৎসব ১৪১৮' উদ্বোধন করবেন প্রবীণ সাংবাদিক, ছড়াকার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ফয়েজ আহমেদ। উদ্বোধনী কথনে অংশ নেবেন পর্ষদের চেয়ারম্যান লায়লা হাসান, আহ্বায়ক শাহরিয়ার সালাম ও চারুকলা অনুষদের ডিন শিল্পী মতলুব আলী।

No comments

Powered by Blogger.