শীতের বারতা

ড়ঋতুর এ দেশে একেকটি ঋতু যেন একেকটি উৎসব। হেমন্তের নবান্ন উৎসব শেষ হতে না হতেই শুরু হয়ে গেল শীত উৎসব! জীবনযাত্রার অনেক ক্ষেত্রেই পরিবর্তন নিয়ে আসছে শীতের এইবারতা।লিখেছেনসুরবিপ্রত্যয়ীসকালবেলা অফিসে যাওয়ার পথে বের হয়ে ফয়সাল তো অবাক! কিছুই দেখা যাচ্ছে না, রাস্তাঘাট সবই যেন অচেনা। কুয়াশা ঢেকে দিয়েছে চারদিক।


আর কয়েকজন তো রীতিমতো জবুথবু হয়ে শাল-সোয়েটার পরেও শীতে কাঁপছে! ফয়সালকে বাধ্য হয়েই এই সাতসকালেও গাড়ির হেডলাইট জ্বালাতে হলো। ফয়সাল মনে মনে ভাবল, শীত চলে এসেছে! কিন্তু এটা কোন মাস? কার্তিক। সাধারণত পৌষ-মাঘ মাসে শীতকাল হওয়ার কথা থাকলেও কয়েক বছর ধরে বৈশ্বিক উষ্ণতা, জলবায়ু পরিবর্তন ও অন্যান্য প্রাকৃতিক কারণে শীতকালটা যেন সময়ের আগেই কড়া নাড়ছে বাঙালির জীবনে। তবে এটি মন্দ নয়, কারণ ফয়সালের প্রিয় ঋতু শীত।
শুধু ফয়সালই নয়, তার মতো অনেকেরই প্রিয় বছরের এই সময়টি। অন্যান্য ঋতুর মতো শীতকালেও প্রকৃতি তার নিজস্ব রূপ ধারণ করে, সাজে অপরূপ সাজে। শীতকালে উত্তরের হিমেল হাওয়ায় অনেক গাছের পাতা ঝরে যায়, বিবর্ণ হয়ে পড়ে প্রকৃতি। শীতকাল রিক্ততার ঋতু, তবুও শীত নিয়ে আসে নানা আনন্দের উৎস। আমরা অনেকেই সারা বছর অপেক্ষা করে থাকি এ ঋতুটি অনুভব করার জন্য, এর সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য।
পল্লী জীবনে শীতকাল আসে হৈ হৈ রব করে, যেন কোনো অতিথির আগমন! শীতের সকাল পল্লীর জীবনকে কর্মজগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। তখন মাঠে তেমন কাজ থাকে না, ঘরে বসে সময় কাটাতে হয় কমবেশি সবাইকে। গল্প করে সময় কাটানোর চমৎকার সুযোগ আসে এই শীতের সকালে আগুন পোহানোর পরিবেশে। গ্রামে শীতের সকাল আরও বেশি উপভোগ্য হয়ে ওঠে শীতের পিঠা খাওয়ার মাধ্যমে। আবহাওয়া আর অবসর নিয়ে আসে পিঠা তৈরির ধুম যেন। তখন চারদিক সরব হয়ে ওঠে। বাড়িতে বাড়িতে শুরু হয় পিঠা বানানোর প্রতিযোগিতা। শীতের সকালে নরম রোদে বসে জিভে জল আনা স্বাদের গরম গরম ভাপা, রসে ডোবানো চিতই, পাটিসাপ্টা অথবা পুলি পিঠার জন্য সবাই চুলোর চারপাশ ঘিরে রাখে, কে আগে খাবে! আর এসব পিঠার বেশিরভাগই তৈরি হয় খেজুরের রস দিয়ে। শুধু পিঠাতেই নয়, শীতের সকালে সদ্য গাছ থেকে আনা খেজুরের রস পান করতেও দারুণ মজা। খেজুরের রস শীতের সকালের চমৎকার উপহার। গাছ থেকে সদ্য আনা টাটকা রস পান করে যে আনন্দ উপভোগ করা যায়, তার তুলনা নেই।
শীতের প্রকৃতি রহস্যময়! কুয়াশার চাদরে মোড়া গ্রামের প্রকৃতি অদ্ভুত সুন্দর। চারদিক ধোঁয়াচ্ছন্ন, খুব কাছের কোনো কিছুও চোখে ধরা পড়ে না, এমনই ঘন শীতের সকালের কুয়াশা। এক সময় কুয়াশা কাটিয়ে রোদ উঁকি দেয়। সেই দুর্লভ রোদ উপভোগের জন্য শিশু-কিশোরদের মধ্যে উৎসাহের সীমা থাকে না, যেখানে রোদ উঁকি দেয় সেখানেই ছুটে যায়।
শহুরে জীবনেও লাগে শীতের ছোঁয়া, তবে গ্রামীণ জীবনের তুলনায় সেটি ক্ষীণই বলা চলে। ব্যস্ততা আর ইট-কাঠের খাঁচার মাঝে প্রকৃতিটাকে উপভোগ করার সুযোগ খুব কমই পায় শহরবাসী। শীতের কুয়াশায় বাড়িঘর, পথঘাট আচ্ছন্ন হয়ে গেলেও স্তিমিত হয় না শহরের কর্মব্যস্ত জীবন। প্রয়োজনে হেডলাইট জ্বালিয়ে ঘন কুয়াশার মধ্যে শহরে গাড়ি চলে। মানুষ এর মধ্যেই ছুটে চলে অফিসে, বাজারে, কলকারখানায়। তবে অনেকেই শীত উপভোগ করতে এ সময় ছুটে যায় নিজের গ্রামে, শিকড়ের টানে, ছেলেবেলার শীতকালকে আর একবার মনে করতে।
শহরে শীতের আগমনটা বোঝা বেশ সহজ। ফুটপাতগুলোয় যখন ভাপা আর চিতই পিঠার পসরা সাজিয়ে বসে মহিলারা আর রাত বাড়তেই শীতের কষ্টে থাকা মানুষগুলো আগুনের তাপ পোহায়, তখনি টের পাওয়া যায় নগর জীবনে শীতের ছাপ। ঋতুর পরিবর্তনের সঙ্গে আমাদের জীবনযাপনেও আসে বিস্তর পরিবর্তন। এক রাতের ব্যবধানেই বদলে যায় পোশাক-আশাক, সাজসজ্জা। কাল পর্যন্ত যেখানে কেবল একটি জামা গায়ে দিয়েই বের হয়ে যাওয়া যেত নিদ্বর্িধায়, আজ শীতের ভয়ে পরতে হবে সোয়েটার, কোট বা শাল। শীত সুযোগ করে দেয় ফ্যাশনে আরেকটু নতুনত্ব ও ভিন্নতা আনতে। আবার এর মধ্যেই তোড়জোড় শুরু হয়ে যায় লেপ-কম্বল বের করে রোদে শুকানোর। এক বছর আলমারির এককোণে ন্যাপথলিন আর পলিথিনে জড়িয়ে থাকা পোশাক আর লেপ-কম্বলগুলো আবার দেখবে সূর্যের মুখ, শুরু হবে আবার তাদের কাজ।
শীতের প্রকৃতি অন্য বছরগুলোর মতো এবারও আমন্ত্রণ জানিয়েছে অতিথি পাখিদের। শীতের প্রকৃতির এ এক অপরূপ দৃশ্য। পাতা ঝরা, জীর্ণতা আর শুষ্কতার মাঝে যেমন রয়েছে এক মন খারাপ করা ব্যাপার, তেমনি এর সঙ্গেই শীতের প্রকৃতি রঙিন হয়ে ওঠে অতিথি পাখিদের কলরবে। তবে এর সৌন্দর্য উপভোগ করতে যেতে হবে বিশেষ কিছু জায়গায়।
শীতকাল অনেকের কাছেই খুব প্রিয়, এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, শীতের রাতে কফি হাতে প্রিয়জনের সঙ্গে আড্ডা, সকালবেলা লেপের নিচ থেকে শিশুর না ওঠার আকুতি_ এসব কিছু হাড়-কাঁপানো শীতেরই দান। তবে এই ছোট ছোট বিলাসিতার মাঝেও রয়ে যায় কিছু মানুষের কষ্ট; শীতের কষ্ট, রোদের দেখা না পাওয়ার কষ্ট, শীতের বিশেষ পোশাক না থাকার কষ্ট! কোনো এক শিশু স্কুলের খাতায় রচনা লেখে 'আমার প্রিয় ঋতু শীতকাল', আবার সেই একই সময়ে আরেক শিশু শীতের কষ্টে মুহ্যমান। এই বিভেদ ঘোচাতে পারি আমরা নিশ্চয়ই। এবারের শীতকালটা সবারই প্রিয় ঋতু হয়ে উঠুক, কষ্টগুলোর মুখে ফুটে উঠুক একমুঠো হাসি, শীতের বারতা নিয়ে আসুক ঝলমলে রঙিন দিন।

No comments

Powered by Blogger.