চরাচর-সেই ১৫ নভেম্বর

০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর প্রাক-শীতে সিডর নামের সুপার সাইক্লোন বা মহাঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশের ওপর স্মরণকালের ভয়াবহ আঘাত হানে। ঝড়টির বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ২৪০ কিলোমিটার। সঙ্গে ছিল ২৫ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাস। একটি ঝড়ের গতিবেগ ঘণ্টায় ২২১ কিলোমিটার ছাড়িয়ে গেলে তা সুপার সাইক্লোনে পরিণত হয়। এ পর্যন্ত সিডরই হচ্ছে বাংলাদেশে রেকর্ড করা সাইক্লোনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ও সর্বোচ্চ গতিবেগসম্পন্ন।


এর বিস্তৃতি এত বেশি ছিল যে তা বাংলাদেশের আয়তনের চেয়েও পাঁচ গুণ বড়। সিডরের সেই ক্ষত এখনো শুকায়নি। আক্রান্ত দুর্দিন কাটেনি এখনো। সিডরের পর আক্রান্তদের কল্যাণে অনেক কথা বলা হয়েছে বটে; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের কল্যাণ কতটা কী হয়েছে বিদ্যমান বাস্তবতার মধ্যেই নিহিত আছে এর উত্তর। ৯ নভেম্বর সিডর-ঘূর্ণিঝড়টির উৎপত্তি হয় আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণ-পূর্ব দিকের অঞ্চলে। সেখান থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে কিছুটা সরে সরাসরি সুন্দরবন উপকূলে আঘাত হানে। এর মূল কেন্দ্র ছিল সুন্দরবনঘেঁষা বলেশ্বর নদের মোহনায়। এ কারণে বরগুনা ও বাগেরহাট জেলার বিষখালী, বলেশ্বর ও পায়রা নদীর মোহনা এবং তীরবর্তী অঞ্চলগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঝড়টি সামান্য পূর্বদিকে বাঁক নেওয়ায় পটুয়াখালী ও পিরোজপুর জেলাও ক্ষতির শিকার হয়। এরপর সামান্য একটু পূর্বদিকে ঘুরে সোজা বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চল অর্থাৎ ঢাকার ওপর দিয়ে সিলেটের পাশ ঘেঁষে আসামের দিকে গিয়ে ঝড়টি দুর্বল হয়ে পড়ে। এরপর ১১ নভেম্বর একটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড় সৃষ্টি হয় বলে বার্তা পাওয়া যায়। এ সময় ইন্ডিয়ান ম্যাটেওরোলজিক্যাল ডিপার্টমেন্ট (আইএমডি) ঘটনাটি নিম্নচাপ বলে অভিহিত করে সতর্কসংকেত পাঠায়। জয়েন্ট টাইফুন ওয়ার্নিং সেন্টার (জেটিডবি্লউসি) একে মৌসুমি ঝড় বলে চিহ্নিত করে। নভেম্বরের ১২ তারিখেই (আইএমডি) একে ঘূর্ণিঝড় সিডর হিসেবে চিহ্নিত করে আরো উন্নত বার্তা পাঠায়। জেটিডবি্লউসির তথ্যমতে, ১৫ নভেম্বর ঝড়টির সর্বোচ্চ গতিবেগ ২৫০ কিলোমিটারে ওঠে এবং ভোরে বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানে। ঝড়টি শক্তিশালী হয়ে হারিকেনের আকার নিলে নাসা সেটিকে সাফির সিম্পসন মানদণ্ডে প্রচণ্ড অর্থাৎ চতুর্থ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করে। প্রলয়ঙ্করী মহাঘূর্ণিঝড় সিডর বাংলাদেশের ১৬টি জেলাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করাসহ ৩০টি জেলার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করে। সরকারি হিসাবে প্রাণহানির সংখ্যা তিন হাজার ৩২ জন। বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা ১০ হাজারের কম হবে না বলে বিভিন্ন সূত্র তখন জানায়। চার লাখ ৬১ হাজার ৩৯৯ একরের ফসল সম্পূর্ণ এবং ১২ লাখ ২৫ হাজার ৩০৪ একরের ফসল আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই সঙ্গে সুন্দরবন থেকে শুরু করে টেকনাফ পর্যন্ত ৭১০ কিলোমিটার উপকূলীয় বনের ব্যাপক ক্ষতি হয়। বিচ্ছিন্ন দ্বীপ সেন্টমার্টিন থেকে সুন্দরবনের রায়ভ্যালি পর্যন্ত সিডরের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে ৩৬ ঘণ্টা আগেই দেশের মানুষ জানতে পেরেছিল সিডর নামে প্রলয়ঙ্করী মহাঘূর্ণিঝড় তাদের দিকে ধেয়ে আসছে। আত্মরক্ষার সময় ও সুযোগ পাওয়ায় ঝড়ের প্রচণ্ডতার তুলনায় প্রাণহানির সংখ্যা কম হয়।
আজিজুর রহমান

No comments

Powered by Blogger.