স্বজনদের না চেনার ভান সুপ্তির! by রাব্বী রহমান

সেগুনবাগিচা থেকে উদ্ধার হওয়া আজমেরী সুপ্তি জেসি অবশেষে স্বজনের দেখা পেয়েছেন। তেজগাঁওয়ে পুলিশের উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনে গিয়ে গতকাল বুধবার সুপ্তির সঙ্গে দেখা করেছেন তাঁর মা, বোন ও ভাশুর। কিন্তু সুপ্তি বলেন, 'ওরা আমার পরিচিত কেউ না।'সংবাদমাধ্যমে প্রচারের সুবাদে সুপ্তির সর্বশেষ সংবাদ জানতে পারেন নিকট আত্মীয়রা। আর গতকাল সকালে সুপ্তির মা, বোন ও ভাশুর পুলিশ হেফাজতে থাকা সুপ্তির সঙ্গে দেখা


করেন নানা প্রমাণসহ। কিন্তু সুপ্তি তাঁদের কাউকে চিনতে পারেননি। তবে একজন সিনিয়র সাংবাদিক দেখা করলে তাঁকে চিনতে পারেন সুপ্তি। পুলিশ ও চিকিৎসকদের ধারণা, আত্মীয়রা তাঁকে হত্যা করবে, এমন ভীতি থেকে সুপ্তি তাঁদের না চেনার ভান করছে।
গতকাল দুপুরে তেজগাঁওয়ে পুলিশের উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনে গিয়ে দেখা যায়, সুপ্তির মা ওয়াহিদা বেগম, দুই বোন বিউটি ও লিপি এবং ভাশুর আরশাদ দেখা করেতে এসেছেন সুপ্তির সঙ্গে। কিন্তু সুপ্তি তাঁদের কাউকে চিনতে পারেননি বলে জানান তাঁরা। একজন সিনিয়র সাংবাদিক দেখা করলে তাঁকে চিনতে পারেন সুপ্তি। ওই সময় কথা হয় সুপ্তির সঙ্গে সাংবাদিকদের। সুপ্তি আগের মতোই নিজেকে আমেরিকায় জন্মগ্রহণকারী বলে পরিচয় দিচ্ছেন। মা-বোন পরিচয়ে যাঁরা দেখা করতে এসেছেন, তাঁদের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেন তিনি। সুপ্তির সঙ্গে কথা বলে ধারণা পাওয়া যায়, তাঁর সম্পত্তি ও টাকা আত্মসাৎ করার জন্য তাঁকে হত্যা করা হতে পারে_এই ভয়ে তিনি কাউকে চিনতে পারছেন না বলে দাবি করছেন। আগের মতোই অসংলগ্ন কথা বলছিলেন সুপ্তি।
পরে কথা হয় সুপ্তির মা ও বোনদের সঙ্গে। তাঁরা বলেন, ১৯৭২ সালে সুপ্তির জন্ম। পাঁচ বোন, দুই ভাইয়ের মধ্যে সুপ্তি সবার বড়। তাঁর বাবার নাম ইউসুফ আলী। গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রায়পুরায়। ১৮-১৯ বছর আগে দশম শ্রেণীর ছাত্রী সুপ্তি রাজধানীতে রুস্তম নামে এক আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে এসে হারিয়ে গিয়েছিলেন। পরে বিয়ে করে একদিন তাঁর স্বামী আশরাফকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে হাজির হন। সে সময় তাঁর মা তাঁদের মেনে নেন। এর পরও কয়েকবার গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলেন সুপ্তি ও তাঁর স্বামী আশরাফ।
স্বজনরা আরো জানান, সুপ্তির বাসায় গেলে স্বজনদের সঙ্গে তিনি দুর্ব্যবহার করতেন। ফলে মা-বোনও তাঁর বাসায় যাতায়াত কমিয়ে দেন। পরে সুপ্তি ও আশরাফের সমস্যার বিষয়টি ধরতে পেরে আশরাফের বড় ভাই আরশাদকে ফোনে বিষয়টি জানিয়ে চিকিৎসা করানোর তাগিদ দেন তাঁরা কয়েকবার। সর্বশেষ গত ২৯ অক্টোবর রায়পুরায় যান আশরাফ। সেখানে গিয়ে আশরাফ তাঁদের জানান, সুপ্তি অসুস্থ, তাঁর চিকিৎসা প্রয়োজন। কিছু টাকাও ধার চান। বাড়ি ভাড়া দিতে পারছেন না। কারণ সুপ্তি ব্যাংকের চেকবই ছিঁড়ে ফেলেছে। চেকবই পেতে দেরি হবে। সে সময় আশরাফ জানান, তাঁরা সেগুনবাগিচায় ভাড়া থাকেন।
সুপ্তির ভাশুর আরশাদ জানান, তাঁর বাবার নাম মোহাম্মদ এরশাদ ওরফে নান্না। তাঁরা দুই ভাই ও দুই বোন। ১৭-১৮ বছর আগে আশরাফ সুপ্তিকে বিয়ে করেন। তখন সুপ্তি নিজেকে খ্রিস্টান এবং যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বলে পরিচয় দেন। সে সময় তাঁর বাবা তাঁদের বিয়ে মেনে নেননি। পরে বিয়ে মেনে নিয়ে তাঁদের সঙ্গে থাকেন। কিন্তু সুপ্তির সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় তাঁদের আলাদা করে দেন। প্রতি মাসে সংসার খরচ দিতেন বাবা। তাঁদের পুরান ঢাকায় বাড়ি ছাড়াও এসএ প্যাকেজিং নামে একটি ব্যবসা ছিল। ২০০৭ সালে বাবা মারা যাওয়ার পর সবাই সম্পত্তি ভাগবাটোয়ারা করে নেন। প্রথমে ৫০ লাখ এবং পরে ৮৬ লাখ টাকা দেওয়া হয় তাঁদের। আশরাফ সেই টাকা সুপ্তির নামে এসআইবিএল শান্তিনগর ব্রাঞ্চে স্থায়ী আমানত করে দেন। এরপর তেমন একটা যোগাযোগ হতো না তাঁদের সঙ্গে। আরশাদ দাবি করেন, সুপ্তি ও তাঁর স্বামী মাদকাসক্ত ছিলেন। তাঁদের কয়েকবার চিকিৎসাও করা হয়েছে। গত আগস্টে সেগুনবাগিচার বাসায় যান তিনি। সেখানে তাঁর ভাই ও সুপ্তির অসুস্থতা টের পেয়ে চিকিৎসার জন্য অ্যাম্বুলেন্সও নিয়ে যান। কিন্তু আশরাফ তাঁকে বাধা দেন। এক মাস আগে তাঁর সঙ্গে আশরাফের শেষ কথা হয়। তখন আশরাফ চিকিৎসার জন্য ভারতে যাওয়ার কথা জানান তাঁকে।
সম্পত্তি বণ্টনে অনিয়ম হয়েছিল কি না জানতে চাওয়া হলে আরশাদ বলেন, আইন অনুযায়ী যার যা প্রাপ্য, সে তাই পেয়েছে। এখানে কোনো জালিয়াতি করা হয়নি। তিনি নিজে তাঁদের এসএ প্যাকেজিংয়ের নামে দুটি চেকে এক কোটি ৩৬ লাখ টাকা দিয়েছেন। জালিয়াতি করলে তো টাকাই দিতেন না।
পুলিশের উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের উপকমিশনার শামীমা বেগম জানান, সুপ্তির স্বামী আশরাফের খোঁজ এখনো পাওয়া যায়নি। তাঁর সন্ধানের চেষ্টা চলছে। সুপ্তির মা সুপ্তির এইচএসসির সার্টিফিকেট নিয়ে এসেছেন। সেখানে দেখা যায় সুপ্তি নিউ মডেল ডিগ্রি কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। এ ছাড়া কিছু কাগজপত্র দেখিয়েছেন এবং তাঁদের কথাবার্তা ও বিভিন্ন বিষয় পর্যবেক্ষণের পর তাঁদের সুপ্তির মা ও বোন বলেই মনে হয়েছে। সুপ্তির ভাশুর আরশাদের সঙ্গে কথা বললে তিনি সুপ্তির শিশুসন্তানটিকে লালন-পালন করবেন কিন্তু সুপ্তির চিকিৎসা ব্যয়ভার বহন করতে পারবেন না বলে জানান। তিনি আরো বলেন, পবিবারকে চিনতে না পারা এবং চিকিৎসার দায়ভার না নেওয়ার কারণে সুপ্তিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মাধ্যমে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে নিকট আত্মীয়রা বিষয়টি মনিটরিং করবেন।
কেউ মেরে ফেলতে পারে_এমন ভয় থেকে এক মাস ধরে স্ব্বেচ্ছায় বন্দিত্ব থেকে গত রবিবার বিকেলে আজমেরী সুপ্তি জেসিকে এক সন্তানসহ উদ্ধার করে পুলিশ।

No comments

Powered by Blogger.