জেলহত্যা দিবস-একাত্তরের চেতনাই সব বাধা দূর করে দেবে by এএসএম সামছুল আরেফিন

ঘাতকচক্র এবং তাদের পেছনে থাকা অপশক্তির টার্গেট ছিল একাত্তরের নেতৃত্বকে দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে দেওয়া। রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং মুক্তিযুদ্ধের সমরনায়ক, সবাই ছিল তাদের নিশানায়। এ জন্য তারা পরিকল্পিতভাবে অগ্রসর হয়েছে এবং একের পর এক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কেবল বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে তারা নিশ্চিন্ত ছিল না। বাঙালি জাতি তার অন্তর্নিহিত শক্তিতে ফের একাত্তরের ধারা ও চেতনা ফিরিয়ে আনতে ঐক্যবদ্ধ হবে, এ বিষয়ে তাদের স্পষ্ট উপলব্ধি


ছিল। ২ নভেম্বর মধ্যরাতের পর বাইরে থেকে যাওয়া ঘাতকরা কারাগারের সুরক্ষিত পরিবেশে যাবতীয় বাধা উপেক্ষা করে চারজন জাতীয় নেতাকে একটি কক্ষে একত্র করে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে নিরাপদে চলে যাওয়ার অন্য কোনো ব্যাখ্যা হতে পারে না


আজ ৩ নভেম্বর। জেলহত্যা দিবস। জাতির ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত দিন। এমন একটি দিবস যে দেশ পালন করতে হয়, তার চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কিছু হতে পারে না। বাংলাদেশ একাত্তরে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের এ দেশীয় এক দল সহযোগীকে নিয়ে মাসের পর মাস শহর ও গ্রামে দিনের পর দিন গণহত্যা চালিয়েছে। বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। ধর্ষণ ও লুটপাট চালিয়েছে। ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে তার বাসভবনে হত্যা করা হয়েছে। তিনি অতি সাধারণ জীবনযাপন করছিলেন। কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলে নিজেকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চাননি। বাসভবন কিংবা অফিসে তার কাছে সবার ছিল অবাধ প্রবেশাধিকার। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার জন্য তাকে বিভিন্ন সময়ে সতর্ক করা হয়েছে। কিন্তু তিনি কিছুতেই জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চাননি। ঘাতকরা এ সুযোগই নিয়েছিল। একই ঘাতক চক্র ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী চারজন জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এবং এম কামরুজ্জামানকে ৩ নভেম্বর হত্যা করেছিল। তারা কিন্তু সে সময়ে নিরাপত্তাহীন পরিবেশে ছিলেন না। ১৫ আগস্টের পর ক্ষমতাসীন শাসকরা তাদের আটক করে দেশের প্রধান কারাগারে রেখে দিয়েছিল, যেখানে তাদের সব ধরনের নিরাপত্তা প্রদানের ব্যবস্থা থাকার কথা। ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বর হত্যাকাণ্ড থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে ঘাতকরা ছিল বেপরোয়া। তারা বাঙালি জাতির মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করায় যে কোনো পন্থা অনুসরণে ছিল সংকল্পবদ্ধ। ৭ নভেম্বর একাত্তরের রণাঙ্গনের অসম সাহসী যোদ্ধা মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ এবং কর্নেল এটিএম হায়দারসহ কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা ছিল এরই ধারাবাহিকতা। প্রহসনের বিচারে কর্নেল তাহেরের ফাঁসিও কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। ঘাতকচক্র এবং তাদের পেছনে থাকা অপশক্তির টার্গেট ছিল একাত্তরের নেতৃত্বকে দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে দেওয়া। রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং মুক্তিযুদ্ধের সমরনায়ক, সবাই ছিল তাদের নিশানায়। এ জন্য তারা পরিকল্পিতভাবে অগ্রসর হয়েছে এবং একের পর এক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কেবল বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে তারা নিশ্চিন্ত ছিল না। বাঙালি জাতি তার অন্তর্নিহিত শক্তিতে ফের একাত্তরের ধারা ও চেতনা ফিরিয়ে আনতে ঐক্যবদ্ধ হবে, এ বিষয়ে তাদের স্পষ্ট উপলব্ধি ছিল। ২ নভেম্বর মধ্যরাতের পর বাইরে থেকে যাওয়া ঘাতকরা কারাগারের সুরক্ষিত পরিবেশে যাবতীয় বাধা উপেক্ষা করে চারজন জাতীয় নেতাকে একটি কক্ষে একত্র করে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে নিরাপদে চলে যাওয়ার অন্য কোনো ব্যাখ্যা হতে পারে না।
দেশের দুর্ভাগ্য যে, জেল হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ীদের কার্যত কোনো বিচারের সম্মুখীন হতে হয়নি। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের পর দুই দশক ধরে ক্ষমতাসীনদের কেউই এ জন্য অর্থবহ উদ্যোগ গ্রহণে উৎসাহ বা আগ্রহ না দেখানোর কারণ বোধগম্য। কারা কী উদ্দেশ্যে মুক্তিযুদ্ধের নায়কদের একের পর এক হত্যা করল তার কোনো তদন্ত হয়নি। 'রাজনীতিতে এমনটি হয়েই থাকে'_ এমন মনোভাব ছিল প্রকট। তবে তাদের উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট_ দেশকে ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িক ধারায় পরিচালিত করা। দেশকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে রাখা। এ শক্তি জিয়াউর রহমানকে সামনে রেখে অনেক অঘটন ঘটিয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকেও রেহাই দেয়নি, কিংবা বাঁচাতে পারেনি বা তার চেষ্টা করেনি।
পঁচাত্তরের বিয়োগান্ত ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে বিভেদের রাজনীতি নতুন মাত্রা পেয়েছে। রাজনীতি হয়েছে দ্বিধাবিভক্ত। আমাদের জাতিগত পরিচয় করা হয়েছে প্রশ্নবিদ্ধ। মূল্যবোধ ও নৈতিকতার অবক্ষয় প্রকট। যার প্রভাবে রাষ্ট্র ব্যবস্থা হয়ে পড়েছে দুর্বল। মুক্তিযুদ্ধের প্রক্রিয়ায় দেশ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। সব শ্রেণী-পেশার মানুষের ঐক্যের মূলে শুধু একটি স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠা নয়, সমৃদ্ধ গরীয়ান-মহীয়ান স্বদেশও ছিল সবার প্রত্যাশা। কিন্তু ১৫ আগস্ট এবং তার পরবর্তী সময়ের বিয়োগান্ত ঘটনাপ্রবাহে নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়া দেশবাসী সে লক্ষ্য অর্জনের পথে অগ্রসর হতে গিয়ে বারবার হোঁচট খেয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ষড়যন্ত্রকারীরা এটাই চেয়েছিল।
স্বাধীনতা-পরবর্তী চার দশকে আমরা নানা ধরনের শাসন ব্যবস্থা দ্বারা পরিচালিত হয়েছি। কখনও গণতন্ত্র, কখনও সামরিক শাসন, কখনও-বা সামরিক ছত্রছায়ায় বেসামরিক শাসন। সামরিক শাসনবিরোধী প্রবল জনমতের কারণে ১৯৯১ সালে দেশে ফের সংসদীয় ধারা প্রবর্তিত হয়। গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের ধারা চালু হয়। কিন্তু একাত্তরের চেতনা ধরে একটি উন্নত দেশ গড়ে তোলার লক্ষ্য অর্জন রয়ে গেছে অধরা। ৫ বছর পরপর যেমন সরকার পরিবর্তন ঘটছে, তেমনি পরিবর্তন ঘটছে সংবিধানের, শিক্ষা নীতির, এমনকি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেরও। মাত্র চার দশক আগে সংঘটিত আমাদের জাতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবের অধ্যায়ের বিকৃত ব্যাখ্যা কখনও কখনও এমনকি সরকারিভাবেও উপস্থাপন করা হচ্ছে। ওই সময়ের কোটি কোটি প্রত্যক্ষদর্শী এখনও সক্রিয় জীবনে রয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকে বেঁচে আছেন। প্রকৃত ইতিহাস ও ঘটনাপ্রবাহ বিবৃত রয়েছে সংবাদপত্র এবং অন্য অনেক দলিলে। তারপরও চলছে মিথ্যাচার। এমনকি স্বাধীনতা ঘোষণার দিনটিও পর্যন্ত বদলে ফেলার হীন চেষ্টা চলে।
এ অবস্থা পরিবর্তনে আপামর জনগণের সক্রিয় ভূমিকা চাই। বিশেষভাবে এগিয়ে আসতে হবে নাগরিক সমাজকে। আমরা এগিয়ে চলার পথে বারবার হোঁচট খাচ্ছি। আমাদের সঠিক গন্তব্য চিহ্নিত হয়ে আছে। কিন্তু পথে পথে পড়ছে কঠিন বাধা। যারা এ কাজ করছে তারা অবুঝ নয়, ঝোঁকের মাথাতেও কিছু করে ফেলা হচ্ছে না। বরং তারা কাজ করে চলেছে পরিকল্পিতভাবে। এ থেকে উত্তরণের উপায় দেশবাসীর সামনে স্পষ্ট করে তুলতে প্রয়োজন সংগঠিত ও সচেতন প্রয়াস। ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য চিহ্নিত হয়েছে। এ থেকে বিচ্যুত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু এটা মনে রাখতে হবে যে, যারা লক্ষ্যচ্যুত করার চেষ্টা চালাচ্ছে তারা মোটেই দুর্বল শক্তি নয়। স্বার্থ হাসিলের জন্য তারা কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে তার নজির ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ও ৭ নভেম্বরে সংঘটিত নৃশংসতা। নারী ও শিশুদের হত্যা করতেও তারা দ্বিধা করেনি। রাষ্ট্র ক্ষমতা ফিরে পেতে তারা এখনও তৎপর। তাদের কারণে গণতন্ত্র ফের বিপন্ন হতে পারে। নাগরিক সমাজ তা প্রতিরোধে সক্রিয়তা না দেখালে ফের দুঃসময়ের মুখোমুখি হয়ে পড়তে পারে প্রিয় স্বদেশ ভূমি। জাতির জনকের হত্যাকাণ্ডের বিচার নিষ্পন্ন হতে দীর্ঘ প্রায় সাড়ে তিন দশক অপেক্ষা করতে হয়েছে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় নেতাদের হত্যাকাণ্ডের বিচার কার্যক্রম এখনও বলা যায় প্রাথমিক পর্যায়ে। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের সাহসী যোদ্ধাদের হত্যাকাণ্ডের বিচারের কোনো উদ্যোগ তো এখন পর্যন্ত নেওয়াই হয়নি। এ কঠিন অবস্থার মধ্যেই আমাদের অসম সাহসে এগিয়ে চলা সেই ধ্রুবতারা সামনে রেখে_ একাত্তরের চেতনায় সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠন।

এএসএম সামছুল আরেফিন : মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক
 

No comments

Powered by Blogger.