কত সহজেই ভুলে যাওয়া শিখেছে মানুষ by শাকিল ফারুক

প্রকৃতি নাকি শূন্যস্থান পছন্দ করে না। সত্যিই হয়তো। কেউ চলে গেলে পৃথিবীতে তেমন ছায়া পড়ে না। জীবন চলে জীবনের নিয়মেই। কিন্তু কারো কারো চলে যাওয়া দীর্ঘশ্বাসের গভীর ক্ষত তৈরি করে দিয়ে যায়। একা দীর্ঘ রাত বিরান পথে হেঁটে যেতে যেতে হঠাৎ বুকের বাঁ পাশটায় হাহাকার বেজে ওঠে। সঞ্জীব চৌধুরীর চলে যাওয়াটা তেমনই। সবার প্রিয় এই মানুষটা দলছুট হয়েছেন চার বছর হলো, তবু আজও পেরোনো গেল না তাঁর দীর্ঘ ছায়া। চোখটা আজও পোড়ায় তাঁর জন্য!


১৯ নভেম্বর ছিল সঞ্জীবদার চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০৭ সালের এই দিনে হঠাৎ করেই চলে গেলেন অন্য কোথাও, অন্য কোনোখানে। নিজেই বলে গিয়েছিলেন, 'আমি রাগ করে চলে যাব, ফিরেও আসব না। আমি কষ্ট চেপে চলে যাব, ফিরেও আসব না।' কিন্তু কোন রাগ আর কী কষ্ট নিয়ে না-ফেরার দেশে নিরুদ্দেশ হলেন, তা জানা হলো না আজও। জানা হবেও না। কেবল সঞ্জীবদার চলে যাওয়ার কারণটাই নয়, জানা হবে না আরো অনেক কিছুই। বাংলাদেশের আধুনিক সংবাদপত্র ইতিহাসে বিরাট অংশজুড়ে সঞ্জীবদার বিচরণ। সংবাদপত্রে আধুনিকতা ও রুচিশীলতার অনেক ধারণাই এসেছে রোগাশোকা এই মানুষটার মগজ থেকে। তাঁর হাতের ছোঁয়ায় দক্ষ হয়ে উঠেছেন প্রচারমাধ্যমের বহু কর্মী। সেই কর্মীদের হাতেই এখন দেশের শীর্ষস্থানীয় বহু প্রচারমাধ্যমের কর্তৃত্ব। সুযোগ পেলেই এখনকার প্রতিষ্ঠিত বহু গণমাধ্যমকর্মীকেও দেখি 'সঞ্জীবদার হাত ধরেই তো লেখালেখি শিখেছি' ধরনের কথা বলে আত্মতুষ্টিতে ভুগতে। কিন্তু সেই মানুষগুলোই যখন বিস্মৃত হন সেই সঞ্জীব চৌধুরীর কথা, তখন অবাক হওয়া কিংবা কষ্ট পাওয়ার অনুভূতি লোপ পায়। কেবল নিস্পৃহতার সঙ্গে দেখে যাই, এমন মানুষের মৃত্যুদিনে দুয়েক কলম বা কয়েক সেকেন্ডের একটা সংবাদও প্রকাশিত বা প্রচারিত হয় না। হয়তো কেউ মনেও রাখে না। কেবল এটিএন নিউজ বাদে ১৯ নভেম্বর আর কোনো প্রচারমাধ্যমেই বিশেষভাবে সঞ্জীবদাকে স্মরণ করতে দেখা যায়নি কাউকে। কেউ কেউ করেছেন, তবে দায়সারাভাবে। সঞ্জীবদার জন্য কষ্টে বুকে ফেটে যায় কতজনের, কিন্তু তাঁকে মনে রাখার সময় কারো নেই। মাত্রই তো চারটা বছর, এই কটা দিনেই তাঁকে ভুলে গেলাম! কত সহজেই ভুলে যাওয়া শিখেছে মানুষ। এসব ঠুনকো প্রচারণার অভাবে সঞ্জীব চৌধুরীর মাহাত্ম্য কমবে না বটে, তবে তাঁকে নিয়ে বছরজুড়ে মায়াকান্না যে মানুষগুলোর, তাঁরা যে কেবলই নিজের মান বাড়াতেই সঞ্জীবদার নামটা ব্যবহার করেন তা জানা হয়ে গেল ভালোভাবেই। আজন্ম খেয়ালী মানুষটা হয়তো মুখ টিপে হাসছেন কিংবা দ্বিমুখী স্বভাবের ওই মানুষগুলোকে দেখছেন করুণার চোখে।
কিন্তু যে তরুণরা এখনো বুঝতে চেষ্টা করে সঞ্জীব চৌধুরীর অভিমান, তারা ভোলেনি। সঞ্জীবদার মৃত্যুদিনে তেমনই কয়েক তরুণের উদ্যোগে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে স্মরণানুষ্ঠান। সাংস্কৃতিক ইউনিয়ন আয়োজিত 'মুক্তস্রোতে জ্বলুক আগুন' শীর্ষক একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও সঞ্জীব চৌধুরীর স্মরণে। কোনো স্বার্থের সন্ধানে নয়, অকৃত্রিম আবেগ থেকে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সঞ্জীবদার গান গেয়ে তাঁকে স্মরণ করেছিল এক ঝাঁক তরুণ। সেই অনুষ্ঠানে এসেছিলেন সঞ্জীব চৌধুরীর গড়ে তোলা 'দলছুট' ব্যান্ডের সদস্যরা। গান গাইতে নয়, কথা বলতে।
১৯ নভেম্বর 'দলছুট'ও কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করেনি। কারণ? তারা সঞ্জীবদার মৃত্যুদিন পালন করতে চায় না। কষ্টের এই দিনটাকে নাকি তারা মনে করতে চায় না। ২৫ ডিসেম্বর সঞ্জীবদার জন্মদিনে তারা নতুন অ্যালবামের প্রকাশনা উৎসবের আয়োজন করেছে। মৃত্যুদিনটাকে কষ্টের দিন বলে উদ্যাপন না করার যুক্তিটা ঠিক মনঃপূত হয় না। 'দলছুট' সদস্যদের কী মনে হয়, রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে আয়োজিত অনুষ্ঠানটা আনন্দ আয়োজন হিসেবে উদ্যাপিত হয়েছে? কারো মনে করা বা না করায় সঞ্জীবদার কিচ্ছুটিও আসে যায় না। যারা দেখেছে জীবনের নিভৃত কুহক, যারা বুঝেছে সঞ্জীব চৌধুরীর মর্ম_তাদের হৃদয়ে কিংবা নিজের গানের সুরে সারাটা জীবন মিশে থাকবেন সঞ্জীবদা। সঞ্জীব চৌধুরীর মৃত্যু নেই।

No comments

Powered by Blogger.