শ্রদ্ধাঞ্জলি-রশীদ তালুকদার : ঐতিহাসিক ছবি তুলে নিজেই ইতিহাস

নসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের সময় মিছিলে সবার সামনে মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে স্লোগানরত এক টোকাইয়ের ছবিটির কথা এখনো অনেকের মনে আছে। ছবিটি তোলার চার-পাঁচ মিনিট পরই শিশুটি মারা যায় পুলিশের গুলিতে। সাদা পোশাকের নারী মুক্তিযোদ্ধাদের সারিবদ্ধ মার্চের দৃশ্য, ষড়যন্ত্রমূলক আগরতলা মামলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের হাজিরা দিতে যাওয়ার ছবি বা ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের দৃশ্য_এসবই একেকটি অবিস্মরণীয় ছবি। এ ছবিগুলোসহ বহু ঐতিহাসিক ছবি তুলে যিনি নিজেই আজ ইতিহাস, তিনি হলেন নির্ভীক আলোকচিত্রী ক্যামেরাযোদ্ধা রশীদ তালুকদার।


গতকাল বুধবার রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিদায় জানানো হলো আলোকচিত্রী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা রশীদ তালুকদারকে। দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে পুলিশের একটি চৌকস দল বিউগল বাজিয়ে স্যালুট দিয়ে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিদায় জানায়। পরে তাঁর লাশ আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালের নিউরো সার্জারি ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রশীদ তালুকদার ইন্তেকাল করেন।
ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের দিনগুলোতে রশীদ তালুকদার আন্দোলনরতদের ছবি তুলেছিলেন নির্ভয়ে। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকচক্রের রক্তচক্ষু ফাঁকি দিয়ে দেশের এ-প্রান্ত থেকে ওই-প্রান্ত ঘুরে বেড়িয়ে যে ছবিগুলো তুলেছিলেন, সেগুলোর মাধ্যমে দেশে-বিদেশে আমাদের মুক্তিসংগ্রামের কথা পেঁৗছে যায়। পাইওনিয়ার ফটোগ্রাফার অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী রশীদ তালুকদার ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ঢাকা শহরে গণহত্যার অসংখ্য ছবি ক্যামেরাবন্দি করেন। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ শিবিরে ঘুরে ঘুরেও ছবি তোলেন তিনি। স্বাধীনতার পর তাঁর ক্যামেরাবন্দি টাঙ্গাইলে কাদের সিদ্দিকীর কাদেরিয়া বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের চিত্র তাঁকে এনে দিয়েছিল পুলিৎজার পুরস্কার। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর তোলা ছবি দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তিনি বহুবার পুলিশের নির্দয়, নির্মম প্রহারে আহত হয়েছিলেন।
বাংলাদেশ ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রশীদ তালুকদার তাঁর কর্মজীবনে জাপান ফটোগ্রাফিক সোসাইটি ও আশাহি শিমবুন থেকে সেরা আলোকচিত্রীর পুরস্কার, ইউনেস্কো, থাইল্যান্ড ও বিপিএস স্বর্ণপদকসহ দেশি-বিদেশি ৭৫টি পুরস্কার পেয়েছেন।
রশীদ তালুকদার ১৯৩৯ সালের ২৪ অক্টোবর মাদারীপুর জেলার কালকিনি থানার দক্ষিণ রমজানপুরের তালুকদার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা আবদুল করিম তালুকদার চাকরি করতেন রেল বিভাগে। মাত্র ছয় বছর বয়সেই তিনি রাজশাহীর স্টার স্টুডিওর মরহুম মোতাহার হোসেনের কাছে ফটোগ্রাফিতে হাতেখড়ি নেন। ১৯৬২ সালে দৈনিক সংবাদে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ফটোসাংবাদিকতা শুরু। এখানে কাজ করেন প্রায় এক যুগ। জানা যায়, আলোকচিত্রী হিসেবে তাঁকে জীবনের প্রথম অ্যাসাইনমেন্টটি দিয়েছিলেন শহীদুল্লাহ কায়সার। এরপর ১৯৭৫ সালে রশীদ তালুকদার যোগ দেন দৈনিক ইত্তেফাকে। টানা ৩২ বছর ইত্তেফাকে কাজ করে তিনি অবসরে যান ২০০৭ সালে। এরপর থেকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেই তিনি সময় কাটাচ্ছিলেন।
রশীদ তালুকদারের ভাতিজা কালের কণ্ঠের আলোকচিত্রী মঞ্জুরুল করিম বলেন, মানুষ হিসেবে রশীদ তালুকদার ছিলেন অমায়িক। সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। কিন্তু তিনি চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করতেন। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। তবে এক ছেলে চঞ্চল এবং দুই মেয়ে তুলি ও অগি্নকে নিয়ে পারিবারিক জীবনে তিনি সুখীই ছিলেন।
রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিদায় জ্ঞাপন : গতকাল দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে তাঁর নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। প্রেস ক্লাবে পুলিশের একটি চৌকস দল বিউগল বাজিয়ে স্যালুট দিয়ে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিদায় জানায়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ, আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমদ, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ইকবাল সোবহান চৌধুরী, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন অপর অংশের মহাসচিব শওকত মাহমুদ, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক, প্রেসক্লাবের সভাপতি কামালউদ্দিন সবুজ ও সাধারণ সম্পাদক আবদাল আহমেদ, বিশিষ্ট সাংবাদিক শফিকুর রহমান প্রমুখ।
এদিকে বিভিন্ন সংগঠন ও সর্বস্তরের মানুষের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রশীদ তালুকদারের মরদেহ সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হয়। এখানে শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সাজেদা চৌধুরী, মতিয়া চৌধুরী, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, সিপিবির পক্ষ থেকে মঞ্জুরুল আহসান খান, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, বাসদের খালেকুজ্জামান, জাসদের নাজমুল হক প্রধান ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এ ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, শিল্পকলা একাডেমী, কবিতা পরিষদ, উদীচী, আইটিআই, বাংলা একাডেমী, বাংলাদেশ ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন, পদক্ষেপ বাংলাদেশ প্রভৃতি সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়।
বিভিন্ন মহলের শোক : রশীদ তালুকদারের মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এ ছাড়া ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, বাংলাদেশ ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, বাংলাদেশ যুব মৈত্রী, জাতীয় গণতান্ত্রিক লীগ, নারী মুক্তি আন্দোলন, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ন্যাপসহ প্রভৃতি সংগঠন শোক জানায়।

No comments

Powered by Blogger.