ঢাকা-চট্টগ্রামে সংসদীয় আসন আরো বাড়বে! by কাজী হাফিজ

জনসংখ্যা অনুপাতে ঢাকা জেলায় সংসদীয় আসন আরো বাড়ানো হবে, নাকি ২০টি আসনই অপরিবর্তিত রাখা হবে- এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছে। গত সোমবার প্রকাশিত আদমশুমারির চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুসারে ঢাকার জনসংখ্যা ১০ বছরে প্রায় ৩৫ লাখ বেড়েছে। আগে ছিল ৯০ লাখ ৩৬ হাজার ৬৪৭ জন।


এখন হয়েছে এক কোটি ২৫ লাখ ১৭ হাজার ৩৬১ জন। বিদ্যমান আইন অনুসারে জনসংখ্যার হিসাবে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করতে গেলে ঢাকা জেলার আসন আরো ছয়টি বাড়িয়ে ২৬টিতে উন্নীত করতে হবে। সে ক্ষেত্রে কমবে দেশের বাকি জেলাগুলোর আসন সংখ্যা।
চট্টগ্রাম জেলার জনসংখ্যাও বিদ্যমান আইনে আসন বৃদ্ধির দাবি রাখে বলে নির্বাচনী আইন বিশ্লেষকদের ধারণা। এ জেলার জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৯ লাখ। এ জেলায় ১০ বছর আগে জনসংখ্যা ছিল ৬৯ লাখ ৬৬ হাজার ৪৫০ জন। এখন হয়েছে ৭৯ লাখ ১৩ হাজার ৩৬৫ জন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আদমশুমারির চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট আইন অনুসারে নির্বাচন কমিশনকে দ্রুত জাতীয় সংসদের আসনগুলোর সীমানা পুনর্নির্ধারণের কাজ শুরু করতে হবে। আগের কমিশন ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে সংসদীয় আসন আর না বাড়ানোর পক্ষে আইন সংশোধনের প্রস্তাব রেখেছিল। কিন্তু বর্তমান কমিশন তা গ্রহণ করেনি। এ অবস্থায় বিদ্যমান 'নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ অধ্যাদেশ-১৯৭৬' অনুযায়ী এ কাজ করতে গেলে ঢাকার আসন সংখ্যা বাড়ানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু এই ব্যবস্থা সমস্যা তৈরি করবে বলে অনেকের ধারণা।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ গত মঙ্গলবার কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আদমশুমারির চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়ে গেছে। এখন বিদ্যামান আইন অনুসারে অন্যান্য দেশের মতোই জনসংখ্যার ভিত্তিতে দ্রুত আমাদের সীমানা পুর্নির্ধারণের কাজ শুরু করতে হবে। ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে আসন সংখ্যা আর না বাড়ানোর বিষয়ে বিশেষ কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে কি না, তা আইন পর্যালোচনা করে আগামী সপ্তাহে কমিশন বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে'।
আগের কমিশনের ধারণা ছিল, জনসংখ্যা এবং ভোটার যতই বাড়ুক, সে অনুপাতে মফস্বল এলাকাকে বঞ্চিত করে শহরাঞ্চলে সংসদীয় আসন আর বাড়ানো ঠিক হবে না। কারণ, বড় শহরগুলোর জনসংখ্যার বেশির ভাগেরই স্থায়ী ঠিকানা মফস্বল এলাকায়। কর্মসংস্থানের জন্যই অস্থায়ীভাবে ঢাকাসহ অন্য বড় শহরগুলোতে তাদের অবস্থান। এই অবস্থার প্রভাব পড়ে ২০০৮ সালে সংসদীয় আসনের সীমানা সর্বশেষ পুনর্নির্ধারণীতে। প্রচলিত আইন মেনে ওই সময় পার্বত্য তিনটি জেলা বাদে দেশের ৬১টি জেলার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। এতে ঢাকার ১৩ আসন বেড়ে ২০টিতে উন্নতি হয়। অন্যদিকে আসন কমে যায় বেশ কয়েকটি জেলার। বিদ্যামান আইন বহাল রেখে আবারও সীমানা পুনর্নির্ধারণ করতে গেলে ঢাকাসহ অন্যান্য বড়শহরগুলোর আসন সংখ্যা আরো বেড়ে যাবে এবং কমবে মফস্বল এলাকার আসন সংখ্যা। এটা ঠেকাতে হলে অবশ্যই আইন সংশোধন করতে হবে।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন এ বিষয়ে গতকাল এ প্রতিবেদককে বলেন, 'আমরা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ আইন সংশোধন করার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। পুরনো এ আইন অনুসারে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করতে গেলে ঢাকা জেলার বর্তমান জনসংখ্যা হিসেবে আরো ছয়টি আসন বাড়াতে হবে। এতে মফস্বল আর বড় শহরের মধ্যে সংসদীয় আসনের ভারসাম্য থাকবে না।
এম সাখাওয়াত বলেন, 'আমাদের সময়ে (২০০৮ সালে) সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী জনসংখ্যা অনুপাতে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করতে গিয়ে গ্রামাঞ্চল বা মফস্বল এলাকার চেয়ে বিভাগীয় শহর অঞ্চলে সংসদীয় আসন বেড়ে যায়। ঢাকা জেলার আসনসংখ্যা বেড়ে যায় প্রায় দ্বিগুণ। অন্যদিকে বরগুনার মতো বেশ কয়েকটি জেলা থেকে একটি করে আসন কমে যায়, যা গ্রামীণ উন্নয়নের পরিপন্থী। বিভাগীয় শহরগুলোতে সংসদীয় আসনের পাশাপাশি সিটি করপোরেশন রয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলোতে মেয়র, কাউন্সিলর, সংরক্ষিত কাউন্সিলর রয়েছেন। এসব জনপ্রতিনিধিদের পাশাপাশি সংসদীয় আসন বেড়ে যাওয়া যৌক্তিক নয়। ঈদের ছুটিতে ঢাকা ফাঁকা হয়ে যায়। এর অর্থ, এই শহরের বেশির ভাগ মানুষই স্থায়ী নয়। অস্থায়ী জনসংখ্যা অনুসারে সংসদীয় আসন বাড়ানো সঠিক চর্চা নয়।' তিনি বলেন, সীমানা পুনর্নির্ধারণ আইন এমনভাবে সংশোধন করা প্রয়োজন- যাতে গ্রাম বা মফস্বল অঞ্চলের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে যোগাযোগ ব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

No comments

Powered by Blogger.