সমকালীন প্রসঙ্গ-সমকালের সপ্তম বর্ষ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা by বদরুদ্দীন উমর

সমকালের ৬ বছর পূর্ণ হলো। ২০০৫ সালে যাত্রা শুরু করে এই পত্রিকা এখন বাংলাদেশের একটি প্রথম শ্রেণীর পত্রিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দৈনিক পত্রিকা প্রতিষ্ঠার জন্য এখন কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। কিন্তু শুধু পুঁজি বিনিয়োগ করলেই একটা পত্রিকা দাঁড়ায় না।


যে কোনো পত্রিকার প্রতিষ্ঠা অর্জনের ক্ষেত্রে যারা পত্রিকা পরিচালন করেন ও তাতে নিয়মিত শ্রমদান করেন তাদের ভূমিকাই মুখ্য। সমকালও এদিক দিয়ে ব্যতিক্রম নয়।
একটি পত্রিকা কোন মূল নীতির ওপর দাঁড়িয়ে পরিচালিত হবে তার নির্ধারক পত্রিকায় কর্মরত ব্যক্তিরা নন। বলাবাহুল্য, এটা নির্ধারিত হয় যিনি পুঁজি বিনিয়োগ করেন তার ধ্যান-ধারণা, নীতি ও প্রয়োজনের দ্বারা। এদিক দিয়ে বিচার করলে পত্রিকার সম্পাদক থেকে নিয়ে সবাইকে একটা নির্দিষ্ট নীতির কাঠামোর মধ্যে কাজ করতে হয়।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা বলা হয়। এর প্রয়োজন ও গুরুত্ব বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু তা হলেও এই স্বাধীনতা বলতে ঠিক কী বোঝায় ও কার স্বাধীনতা বোঝায় এ নিয়ে স্পষ্ট ধারণা খুব কম লোকেরই আছে। সাধারণত সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা যখন বলা হয়, তখন সরকারি নিষেধাজ্ঞা বা নিয়মকানুনের বিষয়টিই সামনে আসে। এটা এক বাস্তব ব্যাপার। কারণ, দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কত দূর থাকবে তা বহুলাংশে সরকারই নির্ধারণ করে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার এ স্বাধীনতা নাগরিকদের যতখানি দিতে পারে কোনো স্বৈরতান্ত্রিক বা ফ্যাসিস্ট সরকার তা দিতে পারে না। আবার কোনো গণতান্ত্রিক সরকারও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কতখানি দেয় তার মধ্যেও তারতম্য থাকে। নির্বাচিত এবং নামে গণতান্ত্রিক সরকারকেও প্রায়ই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের ও মিটিং-মিছিলের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করতে এবং সে বিধিনিষেধ অমান্য করলে অমান্যকারীদের ওপর হামলা করতে দেখা যায়।
সংবাদপত্র মতপ্রকাশের একটা মাধ্যম এবং সে হিসেবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বলতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাই বোঝায়। কিন্তু এই স্বাধীনতা কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যাপার নয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অর্থ কোনো বিশেষ বিষয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নয়। সমাজে ও জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করতে থাকার সময় মানুষের অনেক কিছু করার প্রয়োজন হয়। অনেক অধিকারের জন্য সংগ্রাম করতে হয়। সরকারসহ বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের কাছে সম্পর্কিত লোকদের দাবি-দাওয়া জানাতে হয়, অনেক কিছুর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হয়, অনেক ধরনের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক করণীয় বিষয়ে আলাপ-আলোচনার প্রয়োজন হয়। যদি কোনো সরকার সাধারণভাবে এসবের স্বাধীনতা দেয় তাহলে তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণভাবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাও তারা দিয়ে থাকে। কিন্তু সর্বক্ষেত্রে যদি মতপ্রকাশের ও সংঘবদ্ধ কাজকর্মের বিরুদ্ধে সরকার নানা প্রকার বিধিনিষেধ আরোপ করে রাখে, তাহলে সেই অবস্থায় সংবাদপত্র অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করবে এমন হয় না। বিভিন্ন ক্ষেত্রে মতপ্রকাশ ও কর্মের স্বাধীনতার সঙ্গে অঙ্কের হিসাব মিলিয়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নির্ধারিত না হলেও এ দুইয়ের মধ্যে সম্পর্ক অবশ্যই থাকে। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যদি কোনো সরকার স্টিমরোলার চালিয়ে দমন-পীড়ন করতে নিযুক্ত থাকে, তাহলে তারা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বজায় রাখবে এমনটি সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে এখন সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নেই এটা বলা যাবে না। তবে এ ক্ষেত্রেও স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার। কারণ, স্বাধীনতা কোনো ঢালাও ব্যাপার নয়। সমাজে নানা শ্রেণী, পেশা, চিন্তা-চেতনা ও কর্মধারার মানুষ আছে। তাদের প্রয়োজন ও কাজকর্মের মধ্যে বৈচিত্র্য আছে। কাজেই কোন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সরকারের বা শাসকশ্রেণীর পছন্দ ও কোন মতপ্রকাশের তারা বিরোধী এটা নির্ভর করে সরকারের চরিত্রের ওপর। এ ক্ষেত্রে শ্রেণীচরিত্রের গুরুত্ব সব থেকে বেশি হলেও শুধু শ্রেণীর দ্বারাই ঢালাওভাবে স্বাধীনতার সীমা নির্দিষ্ট হয় না। চরিত্রের অন্যদিকও থাকে। একই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত একটি দল সাম্প্রদায়িক, অন্য দল অসাম্প্রদায়িক হতে পারে। এক দল অতিরিক্ত জাতিবিদ্বেষী, অন্য দল বা দলগুলো কম জাতিবিদ্বেষী, কম ভাষাবিদ্বেষী হতে পারে। এছাড়া অন্য প্রকার পার্থক্যও বিভিন্ন দলের মধ্যে থাকে, যা তাদের নীতিনির্ধারণকে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত করে। এ কারণে দেখা যায় যে, শ্রেণীবিরোধিতার ক্ষেত্রে শোষক-শাসক শ্রেণীর প্রতিনিধি হিসেবে তাদের মধ্যে স্বার্থের ঐক্য থাকলেও, অন্য পার্থক্যের কারণে একেক সরকারের ক্ষমতায় থাকাকালে মতপ্রকাশের ও কর্মের স্বাধীনতার মধ্যে তারতম্য ঘটে। শাসকশ্রেণীর মধ্যে একটা মৌলিক স্বার্থগত ঐক্য থাকলেও অখণ্ড শ্রেণী কাঠামোর মধ্যে থাকা লোকদের, সমাজের বিভিন্ন অংশের, অন্যান্য স্বার্থের পার্থক্য ও দ্বন্দ্ব থাকে। এসবের প্রতিফলন বিভিন্ন সরকারের নীতির মধ্যে ঘটে। এর বহিঃপ্রকাশ নানাভাবে দেখা যায়। মতপ্রকাশ ও কর্মের স্বাধীনতার সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে এসব পার্থক্য ক্রিয়াশীল থাকে। তাই শ্রেণী আচরণের দিক দিয়ে শাসকশ্রেণীর বিভিন্ন দলের নীতি অভিন্ন হলেও অন্যান্য বিষয়ে প্রত্যেক সরকারের নীতি এবং আচরণ একই প্রকার হয় না। বাংলাদেশে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ সরকারের নীতি ও কার্যকলাপের দিকে তাকালে এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।
নির্দিষ্ট শ্রেণীচরিত্রের কারণে শাসকশ্রেণীর যে কোনো সরকারই অন্য শ্রেণীর স্বাধীনতা প্রয়োজনমতো সীমিত করে। এ উদ্দেশ্যে তারা ঘোষিত এবং অঘোষিতভাবে নানা ধরনের বিধিনিষেধ অন্যদের ওপর জারি রাখে। সব জাতীয় সংবাদপত্র কোনো বিশেষ দলের সঙ্গে গাঁটছড়ায় বাঁধা না থাকলেও তাদের প্রত্যেকটিই শাসকশ্রেণীর প্রতিষ্ঠান। এই হিসেবে শাসকশ্রেণীর স্বার্থ কাঠামোর মধ্যে থেকেই তারা কাজ করে। তাদের কাজ করতে হয়। এ কারণে স্বাধীনতার বিষয়ে তাদের একটা হিসাব থাকে। এই হিসাব অনুযায়ী শাসকশ্রেণীর লোকরা, তাদের দলীয় কার্যকলাপ, নানা ধরনের মতপ্রকাশের যে স্বাধীনতা পায় অন্যেরা সেটা পায় না। শাসকশ্রেণীর রাজনৈতিক দলগুলো সংবাদপত্রে যত প্রচার পায়, অন্য শ্রেণীর রাজনৈতিক দলের প্রচার সংবাদমাধ্যমে সেভাবে হয় না। শুধু তাই নয়, যেসব দলের কার্যক্রম শাসকশ্রেণী নিজের স্বার্থবিরোধী বলে মনে করে, তাদের প্রচার সংবাদপত্র বিশেষ করেই না। তাদের মিটিং-মিছিলের খবর তারা না ছাপতে পারলেই খুশি থাকে। যদিও ক্ষেত্রবিশেষে তার রিপোর্ট অল্পবিস্তর তারা ছেপে থাকে।
এ তো গেল শ্রেণীগত বা সরকারিভাবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের কথা। কিন্তু অন্যভাবেও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। স্বাধীনতার বিষয়টি আরও স্পষ্ট করার জন্য বলা দরকার যে, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বলতে আসলে সংবাদপত্র মালিক, সংবাদপত্রে কর্মরত লোকদের স্বাধীনতাই বোঝায় না। সংবাদ যেহেতু একটা সামাজিক ব্যাপার, এ জন্য সংবাদপত্রে মতপ্রকাশ এবং সংবাদপত্রে নিজেদের আন্দোলন, কার্যকলাপ ইত্যাদির রিপোর্ট প্রকাশ যেমন শাসকশ্রেণীর দরকার, তেমনি দরকার যারা শাসকশ্রেণীর বাইরে তাদের। কাজেই এই দ্বিতীয়দের স্বাধীনতা যদি না থাকে তা হলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আছে এ কথা বলা চলে না। এদিক দিয়ে বাংলাদেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা যে সংকুচিত এ নিয়ে কোনো সংশয় ও বিতর্ক নেই। এ কারণে প্রায়ই দেখা যায় যে, শাসকশ্রেণীবহির্ভূত দলের মিটিং-মিছিলের খবর, তাদের রাজনৈতিক দলের বক্তৃতা-বিবৃতির ঠাঁই জাতীয় সংবাদপত্রগুলোতে বিশেষ হয় না। অধিকাংশ সময়ই তাদের রিপোর্ট নিউজ রুমে পেঁৗছায় না এবং পেঁৗছালেও সেগুলো বাতিল কাগজের ঝুড়িতে নিক্ষিপ্ত হয়। অর্থাৎ এসব সংবাদ বেশ নির্বিঘ্নেই হত্যা করা হয়।
সাংবাদিক সমিতি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে আন্দোলন করে। কিন্তু তাদেরও অবাধ তথ্যপ্রবাহ ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে বিশেষ কিছু বলতে বা করতে দেখা যায় না। অনেক সময় তারা সাংবাদিকদের ওপর সরকারি হামলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। এই হামলা তাদের ওপর আসে বিরোধী দলের সমর্থক হিসেবে কোনো কিছু করার কারণে, অথবা সরকারি লোকজনের কোনো দুষ্কৃতির বিরুদ্ধে সংবাদ পরিবেশনের জন্য। কিন্তু যারা এভাবে কিছু সাহসের পরিচয় দেন তারাও সংবাদ প্রবাহের ক্ষেত্রে উপরোক্ত প্রতিবন্ধকতার কোনো প্রতিবাদ করেন না বা নিজেরা উদ্যোগী হয়ে এ ধরনের কোনো সংবাদ প্রকাশের চেষ্টা করেন না। এখানে অবশ্যই বলা দরকার যে, এক্ষেত্রে সংবাদ হত্যা বা গুরুত্বপূর্ণ সংবাদকে গুরুত্বহীনভাবে ছাপা যে সবসময় সরকারি চাপের কারণে হয় তা নয়। অনেক ক্ষেত্রে এ ব্যাপারে সরকারি বাধার প্রশ্ন না থাকলেও সেটা সংবাদপত্র কর্মীরা করে থাকেন নিজ নিজ অবস্থানের কারণেই। এ জন্য নিউজ রুমে যেসব সংবাদ হত্যা করা হয় তার একটা বড় অংশ হলো, এমন সব সংবাদ যা পত্রিকাটির সম্পাদক অথবা সংশ্লিষ্ট কর্মীরই অপছন্দ!
এসব অসুবিধাজনক শর্তে সংবাদপত্র পরিচালনা সহজ ব্যাপার নয়। কিন্তু এসব শর্তের অধীন থেকে সমকাল একটি জাতীয় দৈনিক হিসেবে নিজেকে যেভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এটা এক উল্লেখযোগ্য ব্যাপার। সমকালের সপ্তম বর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে পত্রিকার কর্তৃপক্ষ ও কর্মীদের আমার অভিনন্দন জানাই।
৩০.৫.২০১১
 

No comments

Powered by Blogger.