গুলশানের এই বাড়িটি ওয়াসার এমডির জন্য-ভাড়া মাত্র ২২ হাজার by অমিতোষ পাল

যে বাড়ির মাসিক ভাড়া কমপক্ষে তিন লাখ টাকা, সেটা মাত্র ২২ হাজার টাকায় বরাদ্দ নিয়েছেন ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ড. তাকসিম এ খান। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া সত্ত্বেও নিয়ম লঙ্ঘন করে তিনি বাড়িটি বরাদ্দ নিয়েছেন। তবে বাড়িটিতে তিনি থাকেন না। দেশি-বিদেশি বন্ধুদের আপ্যায়নের কাজে ব্যবহার করেন।


বাড়িটি তাঁকে বরাদ্দ দেওয়ায় ঢাকা ওয়াসার লোকসান হয়েছে প্রায় কোটি টাকা। জানা গেছে, রাজধানীর অভিজাত আবাসিক এলাকা গুলশান ২ নম্বর সেকশনের ৫৫ নম্বর সড়কের ১২ নম্বরের বাড়িটি একসময় ঢাকা ওয়াসার চেয়ারম্যানের বাসস্থানের জন্য বরাদ্দ ছিল। নব্বইয়ের দশকে ওয়াসায় নির্বাহী ক্ষমতা এমডির হাতে দেওয়ার পর আর কোনো চেয়ারম্যানকে বাড়িটি বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। ২০০১ সালের দিকে কৃষিবিদ জাভেদ ইকবাল প্রভাব খাটিয়ে মাসিক মাত্র ৫০ হাজার টাকায় বাসাটি ভাড়া নেন। জোট সরকারের শেষ দিকে তিনি বাড়িটি ছেড়ে দেন।
সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, গুলশানের কূটনৈতিক এলাকায় প্রায় ছয় বিঘা জমির ওপর তৈরি বাড়িটি প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। ফটকের একপাশে ইংরেজিতে লেখা 'বাসা-১২, রোড-৫৫, গুলশান।' আরেক পাশে লেখা 'বীরবিক্রম ইমামুজ্জামান সড়ক।' ভেতরে রয়েছে একটি আধুনিক দৃষ্টিনন্দন ডুপ্লেঙ্ বাসভবন। সামনে দেশি-বিদেশি ফুলগাছের বাগান। দেয়ালঘেঁষে আম, নারিকেল, পেয়ারা জলপাইসহ নানা ধরনের গাছপালা ছড়িয়ে আছে। বাড়ির পেছনে রয়েছে একটি পুকুর। এগুলো দেখাশোনার জন্য রয়েছে ওয়াসারই চারজন কর্মী। নিরাপত্তাকর্মী আক্কাস এ প্রতিবেদককে জানান, স্যার এখানে থাকেন না। মাঝেমধ্যে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। দেশি-বিদেশি অতিথিরা এলে সময় কাটিয়ে যান।
গতকাল রবিবার দুপুর আড়াইটায় আক্কাসের সঙ্গে কথা বলার সময়ে বাড়ির ভেতর থেকে বের হয় ঢাকা মেট্রো খ-১১-৯৮৫১ নম্বরের একটি সাদা রঙের দামি প্রাইভেট কার। চালক মতিউর জানান, 'এই প্রাইভেট কারটি ঢাকা ওয়াসার। স্যার এটা সব সময় এখানে রেখে দেন। অতিথিদের প্রয়োজন পড়লে তখন এটা ব্যবহার করা হয়। একটু আগে ফোন করে স্যার সচিবালয়ে যেতে বলেছেন। এখন সেখানেই যাচ্ছি। আর স্যার ব্যবহার করেন ওয়াসা থেকে পাওয়া পাজেরো স্পোর্টস ব্র্যান্ডের নতুন গাড়ি।' মতিউরের কথায় বোঝা যায়, বাড়ির মতো প্রাইভেট কারটিও তিনি অবৈধভাবে ব্যবহার করছেন।
জানা গেছে, ওয়াসার এমডির নিয়োগ তিন বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক হওয়ায় তিনি বাসা বরাদ্দ পেতে পারেন না। কিন্তু তিনি ২০০৯ সালের ১৪ অক্টোবর ওয়াসাতে যোগদানের এক মাস পর ওয়াসার ১৬৩তম বোর্ড সভায় বাসাটি ব্যবহার করার জন্য অনুমোদন করিয়ে নেন। তৎকালীন বোর্ড চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা তাঁর বন্ধু হওয়ার সুবাদে তিনি সেটা অনুমোদন দেন। বিনিময়ে তাঁর বেতন থেকে প্রতি মাসে ২২ হাজার ৫০০ টাকা কর্তনের কথা বলা হয়।
ওয়াসার এক কর্মকর্তা জানান, বাসাটি বরাদ্দের আগে সাবেক এমডি রায়হানুল আবেদিন কিছুদিন সেখানে ছিলেন। তখন রায়হানুল আবেদিন কয়েক লাখ টাকা খরচ করে ইন্টেরিয়র ডিজাইনের কাজ করান। মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে ড. তাকসিম আগের ইন্টেরিয়র ডিজাইন পরিবর্তন করে নতুন করে ডিজাইন করান। এ জন্য ওয়াসার তহবিল থেকে খরচ হয় প্রায় ১৫ লাখ টাকা। এ কাজের তদারক করেন ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী রুহুল আমিন ও মো. আক্তারুজ্জামান।
ঢাকা ওয়াসার আরেক কর্মকর্তা বলেন, বাড়িটি গুলশানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায়। আশপাশে বিভিন্ন বিদেশি দূতাবাসেরও অফিস আছে। এ ধরনের একটি বাড়ির মাসিক ভাড়া অন্তত তিন লাখ টাকা। অথচ এমডির বেতন থেকে কাটা যায় মাত্র সাড়ে ২২ হাজার টাকা। ফলে গত ৩১ মাসে ওয়াসার গচ্চা গেছে প্রায় কোটি টাকা।
হিসাব বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, ড. তাকসিমের মূল বেতন স্কেল এক লাখ টাকা। সরকারি কর্মীরা ঢাকায় গড়ে মূল বেতনের ৪৫ শতাংশ বাড়িভাড়া বাবদ পেয়ে থাকেন। সরকারি বাসায় থাকলে ওই অর্থ বেতন থেকে কাটা যায়। এ হিসাবে ৪৫ হাজার টাকা বাড়িভাড়া বাবদ কর্তন হওয়ার কথা। কিন্তু ড. তাকসিম এর মাত্র অর্ধেক দেন।
আরেক কর্মকর্তা বলেন, ড. তাকসিমের পরিবার স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। তিনি নিজেও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। ওয়াসার এমডি হওয়ার কারণে তিনি দেশে আছেন। রাজধানীর ৩/১০ নয়াপল্টনে শ্বশুরবাড়ি থেকে পাওয়া বাড়িতে বসবাস করেন। কাজেই তাঁর আর এই বাড়ি বরাদ্দ নেওয়ার কোনো কারণ নেই।
আরেক কর্মকর্তা বলেন, সম্প্রতি তিনি গুলশানের ওই বাড়িতে এক বিদেশি রাষ্ট্রদূতকে সংবর্ধনা ও আরেকজন রাষ্ট্রদূতকে বিদায়ী সংবর্ধনা দিয়েছেন। ওয়াসার এমডি হিসেবে তিনি এটা করতে পারেন কি না সেটা নিয়েও প্রশ্ন আছে। ওই অনুষ্ঠানে ব্যাপক আয়োজন করা হলেও তিনি মিডিয়ার কাউকে জানাননি।
এসব প্রসঙ্গে ড. তাকসিম এ খানের সঙ্গে কথা বলার জন্য তাঁর কার্যালয়ে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। একাধিকবার ফোনে চেষ্টা করেও তাঁর মন্তব্য পাওয়া যায়নি। অবশ্য জনতথ্য কর্মকর্তা জাকারিয়া আল মাহমুদ জানান, বাড়িটি ব্যবহার করার আগে তিনি বোর্ড সভায় অনুমোদন করিয়ে নিয়েছেন।
ঢাকা ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রহমতুল্লাহ বলেন, "বাড়িটি চেয়ারম্যানের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এখনো সেখানে 'ওয়াসা চেয়ারম্যানের বাসভবন' কথাটি লেখা আছে। আমি যদিও চেয়ারম্যান, তারপরও সেখানে থাকার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। শুনেছি এমডি সাহেব বরাদ্দ নিলেও সেখানে থাকেন না। ওয়াসার অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর থাকার জায়গা নেই। সেখানে একটা বহুতল ভবন বানিয়ে কোয়ার্টার হিসেবে বরাদ্দ দিলেও তো অনেকে থাকতে পারে। আর ভাড়া দিলেও তো অনেক টাকা ওয়াসার কোষাগারে জমা হয়।" তিনি জানান, 'এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে দেখব।'
ঢাকা ওয়াসার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহিদুর রহমান প্রধান বলেন, 'যতদূর মনে পড়ে আমার সময়েই মাসে ৫০ হাজার টাকা ভাড়া পাওয়া যেত। ওই ভাড়াও ছিল তখন বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম। এখন আরো বেশি ভাড়া হবে- সেটাই তো স্বাভাবিক।

No comments

Powered by Blogger.