কেনেডি সেন্টারে শুরুর আগে by জাহীদ রেজা নূর

ইএমকে সেন্টার—নামটা চেনা চেনা লাগছে কি? নিশ্চয় নয়। তবে খুব শিগগির নামটিকে খুব আপন মনে হবে। ওই তিনটি অক্ষরের মধ্যে লুকিয়ে আছে একজন অসাধারণ মানুষের নাম— এডওয়ার্ড এম কেনেডি। নামটি মনে পড়লেই চোখে ভাসে একাত্তর। মনে পড়ে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে এসে দাঁড়ায়নি।


মুক্তিযুদ্ধকে তারা বলছিল পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। ঠিক সে সময় সিনেটর কেনেডি এসেছিলেন এই উপমহাদেশে। তিনি বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ঢুকতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাতে বাদ সেধেছিল পাকিস্তান সরকার। ভারতের মাটিতে টেড কেনেডি দেখেছেন লাখ লাখ উদ্বাস্তু বাঙালিকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে তিনি জানালেন, কী চলছে এই দেশটায়। মার্কিন জনগণ বুঝতে পারল, গণহত্যা চলছে বাংলাদেশে।
১৯৭২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষণ দিলেন টেড কেনেডি। জানালেন বাংলাদেশের প্রতি মার্কিন জনগণের সমর্থনের কথা। সরকার ও জনগণ যে এক ব্যাপার নয়, সে কথাও স্পষ্ট করে প্রকাশ করলেন। সেই অসাধারণ ভাষণটি পড়লেই মানুষের প্রতি একজন সত্যিকার স্পর্শকাতর রাজনীতিবিদের অনুভূতির স্পর্শ পাওয়া যায়।
ধানমন্ডি ২৭ নম্বর রোডে মাইডাস ভবনের নবম তলায় ইএমকে সেন্টারের অবস্থান। এই তো সেদিন, ১৪ জুলাই এই সেন্টারে যাওয়ার সুযোগ হলো। বিশাল এই সেন্টারে টেড কেনেডির তিনটি ছবি দৃশ্যমান। একটিতে তিনি এয়ারপোর্টে, একটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ও অন্যটিতে তিনি বটগাছ লাগাচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই। মন ভরে যায় ছবিগুলো দেখে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া তাঁর ভাষণটিও টাঙানো আছে দেয়ালে।
সেন্টারটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে সেপ্টেম্বর মাসে, তবে তার আগে অনানুষ্ঠানিকভাবে সেন্টারটি ও তার কার্যক্রমের সঙ্গে পরিচিত হতে গিয়েছিলাম আমরা কয়েকজন সাংবাদিক। মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা, আমেরিকান সেন্টারের পরিচালক লরেন লাভলেস, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের আন্তর্জাতিক তথ্য কর্মসূচির সমন্বয়ক ডন ম্যাকল, পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক উপসহকারী সচিব জিম মুর ও শিক্ষাবিষয়ক ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টা মলি টিস, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি আক্কু চৌধুরী ও ইএমকে সেন্টারের পরিচালক এম কে আরেফ উপস্থিত ছিলেন। শুরুতে একটা ঘরোয়া আড্ডাই হয়ে গেল। সে আড্ডায় আক্কু চৌধুরী জানালেন, কেন ইএমকে বা কেনেডি সেন্টারের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের এই অংশীদারি। ছোট্ট আলোচনায় আক্কু চৌধুরী ১৯৭১ সালের প্রসঙ্গ তুলে আনলেন অবধারিতভাবে। সেই প্রসঙ্গেই টেড কেনেডির অসাধারণ ভূমিকার কথা আনতেও ভুললেন না। একটি নতুন পৃথিবী গড়ে তোলার জন্য মানুষে মানুষে সংযুক্তির যে কথা বললেন, তা রবীন্দ্রনাথের ভাষায় অনুবাদ করে বলা যায়, ‘যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে, মুক্ত করো হে বন্ধ’। আক্কু চৌধুরীর বক্তব্যের পর মার্কিন রাষ্ট্রদূত বললেন, ‘আমার আর বলার কিছু নেই।’ আক্কু চৌধুরী আমার মনের কথাই বলে দিয়েছেন। হূদয়ের গভীর থেকে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
কেনেডি সেন্টারটি হয়ে উঠবে তরুণ নেতৃত্বের মিলনকেন্দ্র। বারিধারার আমেরিকান সেন্টারটি তো থাকবেই, কেনেডি সেন্টারটিও চলবে পাশাপাশি। কেন ধানমন্ডিতে এই সেন্টার, তার ব্যাখ্যা করলেন লরেন লাভলেস। ‘ধানমন্ডির আশপাশেই অনেক বিশ্ববিদ্যালয়। এই এলাকার মানুষের পক্ষে বারিধারার আমেরিকান সেন্টারে গিয়ে কাজ করে আসা সম্ভব নয়। তাই ধানমন্ডির আশপাশের শিক্ষার্থী ও আগ্রহী সবার জন্য কেনেডি সেন্টারের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়েছে এখানে।’ বছরে এক হাজার টাকা দিয়ে সেন্টারের সদস্য হওয়া যাবে। এখানে থাকবে ওয়াইফাই সংযোগ, সহায়ক বই, ক্যাফে। আড্ডাগুলো হবে সৃজনশীল। তরুণদের নতুন ভাবনা, নতুন কাজকে উৎসাহ দেওয়ার জন্যই এই সেন্টারটি করা হয়েছে।
এখানে যাওয়ার জন্য সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। একটি সৃজনশীল পৃথিবী গড়ার অংশীদার হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দিচ্ছে কেনেডি সেন্টার। এ সুযোগ হারানো ঠিক হবে না।

No comments

Powered by Blogger.