আরেক আলোকে-শহীদ জিয়া স্মরণে by ইনাম আহমদ চৌধুরী

ভাবলে অবাক হতে হয়, রাজনীতিতে সে সময় অনভিজ্ঞ এক তরুণ কর্মকর্তা কী অদম্য সাহস, অপরাজেয় মনোবল ও অসীম দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে ইতিহাসের এক ক্রান্তিলগ্নে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে জাতির দিকনির্দেশনা স্থির করে দেন। ঘোষণা-উত্তর স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে সফল সেক্টর কমান্ডার হিসেবে সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ করে বিজয় ছিনিয়ে আনতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।


পৃথিবীতে স্বল্পসংখ্যক সফল ও স্মরণ্য রাষ্ট্রনায়কদের মধ্যে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নাম সুনিশ্চিতভাবেই সুপ্রতিষ্ঠিত। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই একটি নতুন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দরিদ্র ও অনগ্রসর দেশ, যা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় দোদুল্যমান_ তাতে স্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে, একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোয় তাকে স্থাপন করে, দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের ভিত্তি সুদৃঢ় করে উন্নয়নের রাজপথে চলমান করিয়ে দেওয়ার বিরল কৃতিত্বের বিতর্কাতীত অধিকারী শহীদ জিয়াউর রহমান। ভাবলে অবাক হতে হয়, রাজনীতিতে সে সময় অনভিজ্ঞ এক তরুণ কর্মকর্তা কী অদম্য সাহস, অপরাজেয় মনোবল ও অসীম দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে ইতিহাসের এক ক্রান্তিলগ্নে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে জাতির দিকনির্দেশনা স্থির করে দেন। ঘোষণা-উত্তর স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে সফল সেক্টর কমান্ডার হিসেবে সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ করে বিজয় ছিনিয়ে আনতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। আবার সফল মুক্তিসংগ্রাম-উত্তরকালে মধ্য সত্তরের চরম অস্থির এক রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিতে কাণ্ডারি হয়ে জাতিকে এক বিপর্যয়ের মুখ থেকে রক্ষা করেন এবং সার্বভৌমত্ব, জাতীয়তাবাদ ও উন্নয়নের সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর স্থাপন করে জাতির অস্তিত্ব ও স্থায়ীত্ব নিশ্চিত করেন।
জিয়ার নেতৃত্বের প্রথম দিকেই ১৯৭৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর ভারতের তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি সঞ্জীব রেড্ডি রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় প্রেসিডেন্ট জিয়ার কৃতিত্ব ও সম্ভাবনা সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত প্রশংসাবাণী উচ্চারণ করতে গিয়ে এক ঐতিহাসিক সত্যকে তুলে ধরেন এই ভাষায়_ 'ণড়ঁৎ ঢ়ড়ংরঃরড়হ রং ধষৎবধফু ধংংঁৎবফ রহ ঃযব ধহহধষং ধহফ ঃযব যরংঃড়ৎু ড়ভ ুড়ঁৎ পড়ঁহঃৎু ধং ধ নৎধাব ভৎববফড়স ভরমযঃবৎ যিড় ধিং ঃযব ভরৎংঃ ঃড় ফবপষধৎব ঃযব রহফবঢ়বহফবহপব ড়ভ ইধহমষধফবংয.' প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর জুনের প্রথম সপ্তাহে লন্ডনে কমনওয়েলথ সেক্রেটারিয়েট আয়োজিত এক শোকসভায় তদানীন্তন কমনওয়েলথ মহাসচিব স্যার শ্রীধাত রামফাল যথার্থ উক্তি করেছিলেন_ 'প্রেসিডেন্ট জিয়া বাংলাদেশে শুধু যে একদলীয় রাজনীতির পরিবর্তে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তা নয়; এ উন্নয়নকামী দেশকে সার্বিক উন্নয়নের রাজপথে পরিচালিত করেছিলেন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে সার্কের মাধ্যমে ঐক্য-বন্ধনে গ্রথিত করা তার এক স্বপ্ন। তার অকালমৃত্যুতে তার দেশ এক নিপুণ সংগঠক ও সফল রাষ্ট্রনায়ককে শুধু হারাল না, দক্ষিণ এশিয়া হারাল এক দূরদর্শী স্বাপি্নক, উন্নয়নশীল জগৎ হারাল এক মহান নেতা, কমনওয়েলথ হারাল সৌ-ভ্রাতৃত্বে বিশ্বাসী আস্থা সৃষ্টিকারী এক অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব।'
জিয়ার স্মৃতিতর্পণ প্রসঙ্গে আরেকটি ঘটনা মনে পড়ছে। আমি তখন জেদ্দায় ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইডিবি অপারেশন্স) দায়িত্বপ্রাপ্ত ভাইস প্রেসিডেন্ট। ব্যাংকের পঞ্চাশোর্ধ্ব সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে একটি দেশ আফ্রিকার মালি। কর্তব্য নিবন্ধনে গিয়েছিলাম রাজধানী বামাকোয়। অনুসঙ্গী ছিলেন ব্যাংকের দু'তিন কর্মকর্তা। মনে পড়ছে, যার মধ্যে ছিলেন তরুণ অর্থনীতি বিশ্লেষক আবদুল্লাহ গুল, বর্তমানে তুরস্কের মহামান্য প্রেসিডেন্ট, যিনি গত বছর রাষ্ট্রীয় সফরে ঢাকায় এসেছিলেন। মালির সরকারি নেতাদের সঙ্গে ব্যাংকের সহায়তাপ্রাপ্ত কতিপয় উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে আলোচনান্তে দেশের তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট কোনারে বললেন, 'জেনে খুশি হলাম, আপনি বাংলাদেশের। ও দেশের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। উন্নয়নকামী দেশগুলোর অগ্রগতির জন্য তিনি এক উল্লেখযোগ্য নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। তার তিরোধানে এলডিসি দেশগুলোর অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। তারা হারিয়েছে এক অন্যতম যোগ্য নেতা।' অবাক বিস্ময়ে শুনছিলাম এক প্রয়াত প্রেসিডেন্টের প্রতি আরেক দেশের এক ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের শোকাপ্লুত শ্রদ্ধা নিবেদন। বহু বছর ব্যবধানে এক বহু দূরদেশে। প্রেসিডেন্ট কোনারে আরও বললেন, 'তার স্মৃতিতে রাজধানীর একটি প্রধান সড়কের নামকরণ করেছি আমরা। ইচ্ছা করলে আপনি গিয়ে দেখে আসতে পারেন।' তারই নির্দেশনায় প্রটোকলের কর্মকর্তা সমভিব্যহারে গিয়ে দেখলাম শহরের প্রশস্ততম রাজপথ কিং ফাহদ সরণির অব্যবহিত পরেই এভিনিউ জিয়াউর রহমান। দু'দিকে বৃক্ষশ্রেণীর মধ্যে প্রসারিত দীর্ঘ প্রশস্ত রাজপথ। মনে পড়ল তুরস্কে দেখেছিলাম জিয়া স্মরণে আরেকটি সরণি। জান্নাতবাসী জিয়া সেদিন ওই সুদূরে ভ্রমণকারী এক বাঙালির হৃদয় গর্বে ভরিয়ে দিয়েছিলেন। গিনির প্রেসিডেন্ট সিকো তুরে, ফিলিস্তিনের নেতা ইয়াসির আরাফাত, ভুটানের রাজা ওয়াংচুক_ আরও বহু এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্যের নেতৃবৃন্দের কাছে শুনেছি বহু বছর ব্যবধানে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়া সম্পর্কে শোক ও শ্রদ্ধা মিশ্রিত প্রশস্তি_ রাষ্ট্রাচারের প্রয়োজনতাড়িত গতানুগতিক উক্তিগুলো নয়_ অন্তরের অন্তস্তল থেকে উৎসারিত আবেগঘন শ্রদ্ধা নিবেদন। সবার মনে, দেশে ও বিদেশে, ক্ষমতাধরদের মধ্যে ও সাধারণ্যে, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়া যে এক পরম সম্মানের আসন চিরকালের জন্য দখল করে আছেন, তা কিসের জন্য? কিসের জোরে? এর মধ্যে তো কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, নেই রাষ্ট্রাচারের অলঙ্ঘনীয় নির্দেশ, নেই দ্বিপক্ষীয় প্রশস্তি বিনিময়ের রীতিনীতি। এর কারণ হচ্ছে, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিগৃহীত, বঞ্চিত ও দুর্বল দেশগুলোর মধ্যে ঐক্যবন্ধন সৃষ্টি করে তাদের ন্যায্য দাবি আদায়, 'সার্ক'-এর সৃষ্টি_ আল আকসা কমিটির আলোচনা, এলডিসি দেশগুলোর স্বার্থরক্ষা_ এবম্বিধ বিষয়ে তার নেতৃস্থানীয় বলিষ্ঠ অগ্রণী ভূমিকা পালন। আরও রয়েছে দেশের মধ্যে জাতির বিভিন্ন জটিল সমস্যা সমাধান, জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক শ্রীবৃদ্ধি, জাতীয়তাবাদের ভিত্তি রচনা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণ, দুরাচারমুক্ত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা_ সর্বোপরি ব্যক্তিগত জীবনে প্রশ্নাতীতভাবে উদাহরণ প্রতিষ্ঠা করে সর্বপ্রকার দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ_ এসব ক্ষেত্রে শহীদ জিয়ার অবিস্মরণীয় ভূমিকা ও নেতৃত্ব, তার অনমনীয় মনোবল, তার সৎ, সাধু ও নিঃস্বার্থ আচার-ব্যবহার, তার সুদূরপ্রসারী চিন্তা-পরিকল্পনা, তার অতুলনীয় আপসহীন দেশপ্রেম। অতি অল্প সময়ের মধ্যে এক বিভ্রান্ত, হতাশাগ্রস্ত জাতিকে যেন তিনি একটি জীয়নকাঠির মায়াবী ছোঁয়ায় আত্মবিশ্বাসী, প্রাণবন্ত ও সক্রিয় করে তুলেছিলেন। আজ যখন দেশে সত্য ও ন্যায় পদদলিত ও লুণ্ঠিত হচ্ছে দুরাচার ও পরাক্রমের প্রতিকারহীন অপরাধে, আজ যখন দেশের সর্বত্র বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে, আজ যখন জাতির গর্ব দেশের এক পরম আন্তর্জাতিক সম্মানী নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তি সরকারিভাবে নিগৃহীত, আজ যখন আইনের শাসন এক বিস্মৃতপ্রায় জীবনধারা, আজ যখন সরকারি কর্মকাণ্ড দুর্নীতি ও দলীয়করণের গভীরতম পঙ্কে নিমজ্জিত, মানবাধিকার যখন নির্লজ্জতম স্তরে পর্যবসিত, নিষ্পাপ কিশোরী ফেলানীর লাশ যখন সীমান্তে অসহায়ত্বের রক্তের স্বাক্ষর_ তখন প্রেসিডেন্ট জিয়ার সময়কে খুব মনে পড়ে। মনে পড়ে তার উদ্দীপনাময় নেতৃত্ব, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব প্রকাশে তার নিরঙ্কুশ সাহস, তার দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, তার নিঃস্বার্থ সফল রাষ্ট্র-পরিচালনা, জনগণকে সম্পৃক্ত করে দেশগড়ার তার নিরলস প্রচেষ্টা।
বর্তমানে দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, রাজনৈতিক স্বার্থজনিত কারণে জিয়ার ক্ষমতারোহণের প্রক্রিয়া নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি করে তার চরিত্র হননের অসাধু কিন্তু নিষ্ফল প্রচেষ্টা হচ্ছে। ঐতিহাসিক সত্য সংরক্ষণের জন্যই পুনরুক্তি করতে হয়। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এর মর্মন্তুদ ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের অন্যতম নায়ক আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষ নেতা, মুজিব মন্ত্রিসভার প্রবীণ সদস্য খন্দকার মোশতাক আহমদ যে মন্ত্রিসভা গঠন করেন তাতে সবাই ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতা বা আস্থাভাজন এবং অধিকাংশই ভূতপূর্ব মুজিব মন্ত্রিসভারই সদস্য। এ সম্পর্কে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ তার লেখা বই 'বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড : ফ্যাক্টস অ্যান্ড ডকুমেন্টস'-এ মোশতাক মন্ত্রিসভার সদস্যদের নামের তালিকা উল্লেখ করে মন্তব্য করেন, 'সবাই যেন থাকল। সবাই থাকল। থাকলেন না শুধু একজন' (পৃ. ১৪১)। এই মোশতাকই ২০ আগস্ট, ১৯৭৫ সালে সামরিক আইন জারি করে ১৫ আগস্ট থেকে এর কার্যকারিতা ঘোষণা করেন। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে হলো আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থান এবং তৎকালীন সেনাবাহিনীপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান হলেন বন্দি। কিন্তু জনগণ এটা মেনে নিল না, মানল না বাংলাদেশের সৈনিকরা। ৭ নভেম্বর ঘটে গেল সিপাহি-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান। অ্যান্থনি মাসকারেনহাস সেদিনের বর্ণনা দিয়েছেন (বাংলাদেশ : এ লিগ্যাসি অব ব্লাড, অনুবাদ, পৃ. ১২২) এভাবে_ 'উল্লসিত কিছু সৈনিক আর বেসামরিক লোক নিয়ে কতগুলো ট্যাঙ্ক ঢাকা শহরের মধ্যবর্তী এলাকায় চলাচল করতে দেখা যায়। এবার এই ট্যাঙ্ক দেখে লোকজন ভয়ে পালিয়ে না গিয়ে ট্যাঙ্কের সৈনিকদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে রাস্তায় নেমে আসে এবং উল্লাসে ফেটে পড়ে। চারদিন ধরে তারা মনে করেছিল যে, খালেদ মোশাররফকে দিয়ে ভারত তাদের কষ্টার্জিত স্বাধীনতা খর্ব করার পাঁয়তারা চালাচ্ছে। এতক্ষণে তাদের দুঃস্বপ্ন কেটে গেল। সর্বত্রই জওয়ান আর সাধারণ মানুষ খুশিতে একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি শুরু করে। রাস্তায় নেমে তারা রাতভর স্লোগান দিতে থাকে_ বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, সিপাহি বিপ্লব জিন্দাবাদ, জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ ইত্যাদি। অবস্থা দেখে মনে হয়েছিল, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের গণজাগরণের মতো জনগণ আবার জেগে উঠেছে। এটা ছিল সত্যিই এক স্মরণীয় রাত।'
এই অভ্যুত্থানকারী সৈনিক-জনতাই বন্দিদশা থেকে জিয়াকে মুক্ত করে। এর আগে আওয়ামী লীগ নেতা ও স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাকের জারি করা আইনের ধারাবাহিকতায় খালেদ মোশাররফ-প্রশাসনে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিচারপতি সায়েম দায়িত্ব গ্রহণ করেন ৬ নভেম্বর ১৯৭৫। সেনাপ্রধান জিয়া তখন খালেদের হাতে বন্দি। ১৯৭৭ সালের ২০ এপ্রিল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ও সিএমএলএর দায়িত্ব পালন করেন বিচারপতি সায়েম। এ ঘটনাগুলোতে পরিষ্কারই দেখা যাচ্ছে জিয়া 'ক্যু' করে ক্ষমতায় আসেননি। তিনি দেশে সামরিক শাসন জারি করেননি। স্পষ্টতই প্রতীয়মান হচ্ছে, বাংলাদেশে একদলীয় শাসন এবং সামরিক আইন_ কোনোটারই প্রবর্তক জিয়া ছিলেন না।
জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকীতে তাকে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে জাতির এ ক্রান্তিলগ্নে তার অমর কথাগুলো (যা তার তথ্য উপদেষ্টা দাউদ খান মজলিশের মাধ্যমে ১৯৮১ সালে দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত হয়) স্মরণ করি_ 'বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের দর্শন শত শত বর্ষ ধরে এদেশের আপামর জনগণের অন্তরে চির জাগরূক রয়েছে। যুগ যুগান্তরের দেশপ্রেমিকদের হৃদয়ের মর্মমূলে নিহিত তাদের সর্ব উৎসাহ, উদ্যোগ ও প্রেরণার উৎস এই দর্শন। এতে নিহিত রয়েছে বাস্তব আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচি, যা দেশের ঐক্যবদ্ধ জনগণকে সমকালীন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির উপযোগী, বাস্তবমুখী ও সময়োচিত শান্তিপূর্ণ বিপ্লবের কর্মসূচি বাস্তবায়নে উদ্বুদ্ধ করে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সুসংহত করবে। জাতিকে সুনিশ্চিতভাবে অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির দ্বারপ্রান্তে পেঁৗছে দেবে এবং বিশ্বজাতির দরবারে বাংলাদেশকে মর্যাদা ও গুরুত্বের আসনে সুপ্রতিষ্ঠিত করবে।
'... আমাদের মূল লক্ষ্য তথা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিমূলে রয়েছে যে শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্ন, তাকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে পরিকল্পিত পদ্ধতিতে জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে। শোষণমুক্ত সমাজ বলতে মূলত বোঝায় ধর্ম, বর্ণ ও গোত্র নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, বাসস্থান ও পরিবার পরিকল্পনার মৌলিক চাহিদা পূরণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। ... এ কথা স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে যে, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে একটি শোষণমুক্ত সমাজ, যা হবে অত্যন্ত বাস্তব প্রগতিশীল একটি সমাজ, যাতে থাকবে সমতা, নিরপেক্ষতা ও ন্যায়বিচার।' আজকের দিনে জাতির জন্য আশা-উদ্দীপক অনুপ্রেরণার বাণী আর কী হতে পারে?

ইনাম আহমদ চৌধুরী : সাবেক সচিব ও
কলাম লেখক
 

No comments

Powered by Blogger.