আজ বিশ্ব মা দিবস-এই মায়েরা ভালো নেই by শরীফা বুলবুল

'আমার নাতিকে আমার জীবনের মতো মনে হয়। নাতির প্রতি এই মায়াই আমার জীবনে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার বউমা বলেছে, এ কারণে নাতি নাকি আমার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। তাই নিজের সুখ ত্যাগ করে এখানে চলে আসলাম, যদি মায়া কাটে! ছেলের সুখ-শান্তিই তো আমার শান্তি।'


দীর্ঘশ্বাস ভরা এ কথাগুলো নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিমানী মায়ের। তাঁর সারা মুখে লেপ্টে আছে বিষণ্নতার মেঘ। মাথার চুল এলোমেলো। পরনে একটা সাদামাটা শাড়ি। কথা বলতে বলতে চোখের কোণ চিকচিক করে উঠল তাঁর।
সেই মা আরো বললেন, 'আমি একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল সেন্টারের চিকিৎসক ছিলাম। আমার বউমা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ভিসির মেয়ে। সে অসুস্থ হলে তাকে তো দেখভাল করার জন্য তার মা-বাবা আছে। কাজের লোক আছে। সে কাজের লোকের কথা বেশি শোনে। আমি অসুস্থ হলে আমাকে দেখার তো কেউ নেই! আমি একা। আমার কোথাও কেউ নেই। আমি এখানে আছি, কেউ জানে না। আমার দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। তাদের পারিবারিক, সামাজিক জীবন আছে। আমার জন্য ওদের স্বাভাবিক জীবনে ব্যাঘাত ঘটুক- আমি চাই না। প্লিজ, এসব বিষয়ে প্রশ্ন করবেন না।' ভেজা চোখে বললেন, 'আমি যেন এখানেই মরতে পারি।'
আজ ১৩ মে, বিশ্ব মা দিবস। এ দিবস সামনে রেখেই কথা হয় প্রবীণ হিতৈষী সংঘে বসবাসরত কয়েকজন মায়ের সঙ্গে।
একজন প্রবীণ কারো মা, কারো বাবা, কারো দাদা, কারো দাদি কিংবা কারো নানা-নানি। দেশের সর্বস্তরের এই প্রবীণ জনগোষ্ঠীর কল্যাণের কথা চিন্তা করেই অধ্যক্ষ ডা. এ কে এম আবদুল ওয়াহেদ ১৯৬০ সালের ১০ এপ্রিল ধানমণ্ডির নিজ বাসভবনে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরাবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি আগারগাঁও ছয়তলাবিশিষ্ট প্রবীণ নিবাস এবং চারতলাবিশিষ্ট হাসপাতাল নিয়ে প্রবীণদের সেবায় নিয়োজিত। প্রবীণদের শারীরিক, মানসিক, আবাসিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পুনর্বাসনমূলক সেবাদানের পাশাপাশি সমাজের অন্যান্য প্রজন্মকে বার্ধক্য বিষয়ে অবহিত, সংবেদনশীল করার চেষ্টাও রয়েছে তাদের কর্মকাণ্ডের আওতায়।
কথা হয় নার্গিস সুফিয়া আকতার নামের আরেক মায়ের সঙ্গে। প্রবীণ হিতৈষী সংঘে তিনি আছেন তিন বছর ধরে। তাঁর এক ছেলে, তিন মেয়ে। ছেলে অস্ট্রেলিয়ায় থাকে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। স্বামী ফজলুল হক বসুনিয়া একজন পুলিশ অফিসার। ২৭ বছর সংসার করার পর আরেকটা বিয়ে করে তিনি নতুন সংসার নিয়ে ব্যস্ত আছেন। অভিমানে ঠোঁট কাপছিল এই মায়ের। পদ্মপাতায় শিশিরবিন্দুর মতো দুই চোখে টলটল করছিল জল। এই বুঝি ঝরে পড়বে! বললেন, 'আমার সাজানো জীবন এমন এলোমেলো হয়ে যাবে কোনো দিন ভাবিনি। ভাবিনি, আমাকে এখানে এভাবে নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করতে হবে। জীবন আমার কাছে এখন একটা বিরাট বোঝার মতোই ভারী মনে হয়। আমি বড় একা হয়ে গেলাম। আমার একা একা ভালো লাগে না।'
নার্গিস সুফিয়া বলেন, 'আমাদের বাড়ি রংপুরে। ওই শহরেই আমরা থাকতাম। সেখানকার সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়ে টাকা-পয়সা ব্যাংকে ফিঙ্ড ডিপোজিট করে ওটা দিয়ে চলছি। ছেলে মাঝেমধ্যে যোগাযোগ করে। মেয়েরা ফল, কোল্ড ড্রিংকসসহ এটা-সেটা কিনে দেয়। এভাবেই কেটে যাচ্ছে আমার নিরানন্দ জীবন।'
আরেক মা মীরা চৌধুরী নিজে থেকেই বললেন, 'আমি ভালো নেই। আমার সব সময়ই মন খারাপ থাকে। ভালো লাগে না এই নিঃসঙ্গতা। আমার ইচ্ছা করে বেড়াতে যেতে। কিন্তু কি করব! এখানে অনেক আত্মীয়স্বজন আছে, তারা কেউ কোনো দিন বলে না যে আমার বাসায় বেড়াতে আসো। ফেলে আসা সুখস্মৃতিগুলো খুব মিস করি। এখানে মন খুলে কথা বলার কেউ নেই আমার। সংসারের সাধটা আমার ভালো করে পূর্ণ হলো না। তবু আমি একজন সফল মা। আমি আমার সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করেছি। এটাই আমার সুখ। আমার একমাত্র ছেলে, নাম স্বপন চৌধুরী। সে আমেরিকায় থাকে। আমার স্বামী জোসেফ চৌধুরী ছিলেন আইএলওর ডিরেক্টর। ওর সঙ্গে ১০ বছর বয়সে আমার বিয়ে হয়। কিন্তু বিয়ের পর দিনই সে লন্ডন চলে যায়। ফিরে আসে আমি ম্যাট্রিক পাস করার পর। এর পরের দিনগুলো বেশ আনন্দে কেটেছিল। কয়েক বছর আগে কর্তব্যরত অবস্থায় সে হঠাৎ মারা যায়। তারপর ছেলে বাইরে চলে যাওয়ার পর আমি একেবারেই একা হয়ে গেলাম। ছেলে সপ্তাহে দুই দিন আমাকে ই-মেইল করে। আগে মা দিবসে ছেলে উইশ করত। এখন করছে কি না দেখার সুযোগ নেই। দিলু রোডে আমাদের ছোট্ট একটি বাড়ি ছিল, দেখার কেউ নেই বলে বিক্রি করে দিয়ে তিন বছর ধরে এখানে আছি।'
বর্তমান অবস্থা বর্ণনা করে মীরা চৌধুরী বলেন, 'এ রকম জীবন কেউ চায়? উনি মারা যাওয়ার পরই তো আমি এখানে আসলাম। আমার সময় কাটে পত্রিকা ও বই পড়ে, সেলাই করে। আমি খ্রিস্টান বলে এখানে আমাকে অনেকে ভালো চোখে দেখে না। এখানেও একধরনের নিঃসঙ্গ আমি।'
নার্গিস জাহান নামের আরেক মায়ের কাছে কেমন আছেন জানতে চাইলে অনেকটা ক্ষোভ ও অভিমানী স্বরে বলেন, 'দুনিয়ায় আমার কেউ নেই। স্বামী মারা যাওয়ার পর কোনো সহায়-সম্পত্তি না থাকায় বাবার বাড়ি চলে আসি। কিন্তু সেখানে ভাইয়ের বউয়ের গঞ্জনা, মা-বাবার লাঞ্ছনায় আমার জীবন বড় কষ্টময় হয়ে উঠেছিল। একসময় পল্লবী প্রাইমারি স্কুলে পাঁচ বছর শিক্ষকতা করেছি। কিন্তু অ্যাজমাসহ নানারকম অসুস্থতার কারণে সেটা করতে পারছিলাম না। আমি এখন বেঁচে আছি আমার ছোট বোনের সহায়তায়।'
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক মা বলেন, 'ওপরঅলা জানেন, আমি কেমন আছি। মানুষের চোখে ধুলো দিয়ে ভালো থাকার ভান করব কার জন্য! আমি ভালো থাকলে কি আর আমেরিকার নিউ জার্সি থেকে এখানে চলে আসি! আমার এক ছেলে, এক মেয়ে। ওরা নিউজার্সিতে থাকে। আমার স্বামী অনেক অসুস্থ। সে ওখানকার সিটিজেন। তিন মাস পর আমারও হওয়ার কথা ছিল। ছেলের বউ আমাকে কাজের বুয়ার মতো খাটাতে চায়। আমি মান-সম্মান নিয়ে এখানে চলে এসেছি।' তিনি অভিযোগ করেন, 'প্রবীণ হিতৈষী সংঘের কর্মীরা অনেকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। এখানে যাঁরা থাকেন তাঁরা অন্ধ বোবা কালা হয়ে থাকেন। কিছুই বলেন না। এখানে সব সময় পানি থাকে না। প্রবীণদের জন্য বাথরুম ও গোসলের ভালো ব্যবস্থা নেই। বিনোদনেরও ব্যবস্থা নেই। মনে করেছিলাম, নরক থেকে স্বর্গে এসেছি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, নরকেই আছি।'
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রবীণ হিতৈষী সংঘের সহকারী পরিচালক বদরুল আহসান কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আমি এ অভিযোগ বিশ্বাস করি না। প্রবীণদের সেবার জন্যই তো এসব লোকজনকে রাখা হয়েছে। আমার জানা মতে, দুর্ব্যবহারের কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে এ রকম আচরণ যদি কেউ করে থাকে, তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। সমস্যা হচ্ছে, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর প্রবীণরা এখানে আসেন। তাঁদের চাহিদাও ভিন্ন ভিন্ন।'
স্বাস্থ্যসেবা যথেষ্ট নয় মায়ের

No comments

Powered by Blogger.