মা by ইমদাদুল হক মিলন

নিজের জীবনের চেয়েও ছেলেকে বেশি ভালোবাসেন মা। স্বামী নেই, একমাত্র ছেলেই তাঁর সব কিছু। কী যে মমতায়, কী যে যত্নে ছেলেকে বড় করেছেন। মাটিতে রাখেননি পিঁপড়ায় কামড় দেবে। মাথায় রাখেননি উকুনে কামড় দেবে। ছেলেকে রেখেছেন তিনি বুকে, হৃদয়ের কাছে।


এই ছেলে বড় হলো, এক মেয়ের প্রেমে পড়ল। কিন্তু মেয়ে তার প্রস্তাবে সাড়া দেয় না। ছেলে লেগেই আছে তার পেছনে। মেয়ে নিরুপায় হয়ে একদিন বলল, আমি তোমার প্রস্তাবে রাজি হতে পারি, কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে।
কী শর্ত?
তোমার মায়ের হৃদযন্ত্র আমাকে উপহার দিতে হবে।
ছেলে একটু চিন্তিত হলো। তারপর বলল, ঠিক আছে, আমি আমার মায়ের কাছে যাচ্ছি। আমার মা আমার জন্য সব করতে পারেন। মনে হয় এটাও তিনি করবেন।
ছেলে মায়ের কাছে গেল। ঘটনা খুলে বলল। শুনে মা বললেন, বাবা, তোমার জীবনের কোনো সাধ আমি অপূর্ণ রাখিনি। তুমি যখন যা চেয়েছ আমি তোমাকে দিয়েছি। যা বলেছ, আমি তা-ই করেছি। তুমি আমার আত্মা, আমার হৃদয়। আমার হৃদয় আমারই হৃদয় চেয়েছে, আমি কি তাকে তা না দিয়ে পারি? তুমি আমাকে হত্যা করো, নিয়ে যাও আমার হদযন্ত্র। উপহার দাও তোমার প্রেমিকাকে, খুশি করো তাকে। আমি চাই আমার হৃদযন্ত্রের বিনিময়ে আমার ছেলে পাক তার প্রেমিকাকে, খুশি হোক সে, সুখী হোক।
মাকে হত্যা করে তাঁর হৃদযন্ত্র নিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে প্রেমিকার বাড়ির দিকে ছুটতে শুরু করল ছেলে। এমন উন্মাদের মতো ছুটছিল, পথে পাথর-কঙ্কর কত কী ছড়িয়ে আছে কোনো কিছুই খেয়াল করছিল না। হঠাৎই এক পাথরে হোঁচট খেয়ে পড়ল। বুকের কাছে দুই হাতে ধরা মায়ের রক্তাক্ত হৃদযন্ত্র। ছেলে হোঁচট খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মায়ের হৃদযন্ত্র কথা বলে উঠল, ব্যথা পেয়েছ বাবা?
এই হচ্ছেন মা।
মায়ের চেয়ে আপন কে আছে এই পৃথিবীতে? মায়ের চেয়ে বড় কে আছে?
মায়ের চেয়ে বহুল উচ্চারিত শব্দ আর নেই। জন্মের পর, চোখ খোলার পর যে মানুষটিকে প্রথম দেখে শিশু, সেই মানুষটি মা। পৃথিবীর যেকোনো দেশে যেকোনো ভাষায় শিশু প্রথম উচ্চারণ করে 'ম' শব্দটি। 'ম' থেকে মা। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস তাঁর বিখ্যাত 'বাঙ্গালা ভাষার অভিধান' গ্রন্থে 'মা' শব্দের ব্যাখ্যা করেছেন 'সকল জাতির ভাষার আনুকৃত'। সারা পৃথিবীতে মাকে নিয়ে কত গল্পগাথা, কত গান, কবিতা, নাটক, গল্প, উপন্যাস, সিনেমা। কত রূপকথা, কত লোকগাথা। গ্রাম্য কবি লেখেন 'মায়ের চেয়ে আপন কেহ নাই রে।' আবার কেউ লেখেন 'মধুর আমার মায়ের হাসি।' মা-হারা এক গ্রাম্য কিশোরী গভীর জ্যোৎস্না রাতে মায়ের জন্য কাঁদে আর গায়,
'মাগো তোমার মতো নেয় না কেহ আমায় বুকে টানি
আঁচল দিয়া মোছায় না কেউ আমার চোখের পানি
হায়রে মা জননী আমার, হায়রে মা জননী।'
পুরান ঢাকার নামকরা এক মাস্তানকে চিনতাম। বহু খুন-খারাবি, অত্যাচার-নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ছিল। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজিতে ওস্তাদ। সে যে রাস্তা দিয়ে হাঁটত, তাকে দেখলেই ভয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে সরে যেত মানুষ। মায়ের মৃত্যুতে এই মাস্তান রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে শিশুর মতো গড়াগড়ি খেয়ে কেঁদেছিল। মাগো, ও মা, মা, আমারে তুমি কার কাছে রাইখা গেলা! আমি অহন থাকুম কার কাছে? কে আমারে দেখব? কে আমার ভাত বাইড়া রাইত জাইগা বইসা থাকব?
কিশোরী মেয়েটি তার মাকে নিয়ে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। বাস আসার পর হুড়োহুড়ি লেগে গেল। বাসে উঠতে গিয়ে রাস্তায় পড়ে গেলেন মা। কিশোরী মেয়েটি আগেই বাসে চড়ে গিয়েছিল, মাকে পড়ে যেতে দেখে চলন্ত বাস থেকে ঝাঁপ দিয়ে পড়ল। তারপর মাকে জড়িয়ে ধরে এমন আকুলি-বিকুলি, মাগো, ও মা, কোথায় ব্যথা পাইলা তুমি? কও আমারে, কও। মায়ের মাথা হাতায়, পিঠ হাতায় আর কাঁদে। কোথায় ব্যথা পাইলা মা?
মা তেমন ব্যথা পাননি, মেয়েকে কিছুতেই বোঝাতে পারছিলেন না সে কথা। দূর থেকে এই দৃশ্য দেখে নিজের মায়ের কথা মনে পড়েছিল আমার। বুকটা হু-হু করে উঠেছিল।
এক বয়স্ক ভদ্রলোককে দেখলাম একদিন। আমার আত্মীয়। ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে গেছে। তিনি দাদা-নানা হয়ে গেছেন। তখনো বেঁচে আছেন তাঁর মা। ভদ্রলোকের বুকে ব্যথা হচ্ছিল। স্ত্রী, ছেলেমেয়ে কাউকে কিছু না বলে তিনি চলে এলেন মায়ের ঘরে। অতিবৃদ্ধ মা তাঁর বিছানায় বসে তসবিহ জপছেন। বুড়ো ছেলে এসে শিশুর ভঙ্গিতে মায়ের কোলে শুয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন। আমার বুক ব্যথা করে মা। তুমি আমার বুকে একটু হাত বুলাইয়া দাও।
গভীর মমতায় ছেলের বুকে হাত রাখলেন মা। আস্তে আস্তে হাত বুলাতে লাগলেন ছেলের বুকে। কাইন্দো না বাজান, কাইন্দো না। এই তো আমি তোমার বুকে হাত বুলাইয়া দিতাছি। এখনই দেখবা তোমার বুকের বেদ্না কইমা গেছে।
ছেলে কান্না থামালেন এবং ধীরে ধীরে তাঁর বুকের ব্যথা কমে এলো।
অবস্থাপন্ন এক বাড়ির কথা বলি। মা আর যুবক ছেলে থাকে বাড়িতে। এক রাতে ডাকাত এলো। তাদের হাতে রামদা, ছুরি, বন্দুক। সিন্দুক, আলমারির চাবির গোছা ডাকাতদের হাতে দিয়ে প্রচণ্ড ঝড়ে মা পাখি যেমন করে ডানা ছড়িয়ে ছানাদের আগলান, ঠিক সেই ভঙ্গিতে ছেলেকে আড়াল করে দাঁড়ালেন মা। তোমরা আমার বাড়ির সব নিয়ে যাও, যা আছে সব নিয়ে যাও। আল্লাহর দোহাই লাগে, আমার ছেলের গায়ে হাত দিয়ো না।
এই হচ্ছেন মা।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর 'জননী' উপন্যাসে লিখলেন, 'কাত হইয়া শুইয়া পাশে শায়িত শিশুর মুখের দিকে এক মিনিট চাহিয়া থাকিয়াই তাহার মনে হইয়াছিল ভিতরে একটা অদ্ভুত প্রক্রিয়া ঘটিয়া চলিবার সঙ্গে সঙ্গে ছেলের মুখখানা তাহার চোখে অভিনব হইয়া উঠিতেছে। কতটুকু মুখ, কী পেলবতা মুখের! মাথা ও ভ্রুতে চুলের শুরুর আভাস আছে। বেদনায় জমানো রসের মতো তুলতুলে আশ্চর্য দুটি ঠোঁট। একি তার ছেলে? এই ছেলে তার? গভীর ঔৎসুক্যে সন্তর্পণে শ্যামা হাত বাড়াইয়া ছেলের গাল ও চিবুক ছুঁইয়াছিল। বুকের স্পন্দন অনুভব করিয়াছিল। এই বিচ্ছিন্ন ক্ষীণ প্রাণস্পন্দন কোথা হইতে আসিল।'
সৃষ্টিকর্তার পর মা-ই হচ্ছেন মানুষের সবচেয়ে বড় স্নেহের আশ্রয়স্থল। সন্তানের হৃদয়ের শান্তি-স্বস্তি সবই এনে দিতে পারেন একজন মাত্র মানুষ। তিনি মা।
মুক্তিযুদ্ধে বীর সন্তান রুমিকে হারিয়ে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম হয়ে উঠেছিলেন আমাদের সবার মা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে শ্রেষ্ঠতম গ্রন্থটি তিনি লিখেছেন। 'একাত্তরের দিনগুলি'। আমাকে খুবই ভালোবাসতেন। ১৯৮৩ সালের কথা। বছরখানেক আগে বিয়ে করেছি। বাংলা একাডেমীর বইমেলায় দেখা। আমি দুই হাতে তাঁকে জড়িয়ে ধরেছি। গভীর অভিমানের গলায় বললেন, 'তুই আমার এমন অপদার্থ ছেলে, বউটাও দেখালি না।'
এখনো কোনো কোনো গভীর রাতে হঠাৎ করে ঘুম ভাঙলে এই মায়ের কথা আমার মনে পড়ে। গোপনে চোখ ভাসে চোখের জলে। মনে পড়ে আরেক মায়ের কথা। তিনি আমার মা। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাবা মারা গেলেন। তখন তাঁর বয়স ৪২-৪৩ বছর। আমরা ১০টা ভাইবোন। বড় ভাই জগন্নাথ কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়েন। আমি আর আমার বড় বোনটি এসএসসির ক্যান্ডিডেট। মুক্তিযুদ্ধের জন্য পরীক্ষা দিইনি। এখনকার সিটি করপোরেশন তখন ছিল ঢাকা মিউনিসিপ্যাল কমিটি। বাবা কেরানির চাকরি করেন। এতগুলো ছেলেমেয়ে নিয়ে ওই ছোট চাকরিতে সংসার চলে না। চাকরির ফাঁকে ফাঁকে টিউশনি করতেন। এক কাবলিওয়ালার কাছ থেকে সুদে কিছু টাকা ধার নিয়েছিলেন। সেই টাকা শোধ করতে পারছিলেন না দেখে এক দুপুরে কাবলিওয়ালাটি তিনজন মিলিশিয়া নিয়ে গেণ্ডারিয়ায় যে বাসায় আমরা থাকি, সেখানে এসে হাজির। বাবা বাসায় ছিলেন না। জন্তুগুলো পরদিন সকালে আসবে বলে শাসিয়ে গেল। বাসায় ফিরে এ কথা শুনে বাবা এমন ভয় পেলেন, অবিরাম টয়লেটে যেতে লাগলেন। অক্টোবর মাস। মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায় চলছে। দেশ এগোচ্ছে স্বাধীনতার দিকে। সেই অবস্থায় আমরা তাঁকে ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে গেলাম। রাত ১টায় হার্ট অ্যাটাকে বাবা মারা গেলেন। আমাদের ঘরে ১০টা টাকা নেই। মা আমাদের নিয়ে গভীর সমুদ্রে পড়লেন। কী করে যে দিনগুলো কাটবে! দেশ স্বাধীন হলো। মা তাঁর বাবার দিককার কিছু সম্পত্তি পেয়েছিলেন বিক্রমপুরের মেদিনী মণ্ডল গ্রামে। একের পর এক সেই সম্পত্তি বিক্রি করতে লাগলেন, আমাদের খাইয়ে-পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে চাইলেন। সেই সময় আমার মায়ের যে কষ্ট আমি দেখেছি, ১০টি সন্তান নিয়ে যে যুদ্ধ তাঁকে আমি করতে দেখেছি, আমি চাই না পৃথিবীর কোনো সন্তান তার মায়ের ও-রকম কষ্টের চেহারা দেখুক, দুঃখ-বেদনার চেহারা দেখুক। এমনও দিন গেছে, বাসায় বাজার হয়নি, অথবা রাতে একবেলা আমরা খেতে বসেছি, সবার খাওয়া হয়েছে, শুধু মায়ের বেলায় গিয়ে ভাতে টান পড়ে গেছে। সারা দিনের ও-রকম হাড়ভাঙা খাটুনির পর মা না খেয়ে শুয়ে পড়েছেন। এভাবে ১০টি ছেলেমেয়েকে তিনি দাঁড় করালেন। সবাই যখন দাঁড়াল, তখন তিনি একদিন বিছানায় পড়লেন। চার বছর বিছানায় থেকে ২০০৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি চলে গেলেন। ফেব্রুয়ারি বইমেলা চলছে। আমি কয়েক দিন মেলায় যেতে পারলাম না। শেষ পর্যন্ত একদিন গেছি। আমার খুব প্রিয় একজন লেখক আহমেদ মোস্তাফা কামালের সঙ্গে দেখা। টুকটাক কথা বলার পর সে চলে যাচ্ছে, আমি পেছন থেকে বললাম, কামাল, আমার মা মারা গেছেন। শুনে কামাল দিশেহারা ভঙ্গিতে ছুটে এলো। মুখে কোনো কথা নেই, আমার বুকে তার ডানহাতটা রাখল। আমি টের পেলাম, একজন প্রকৃত লেখক এভাবে তার সহানুভূতি প্রকাশ করল।
শামসুর রাহমানের সঙ্গে খুবই চমৎকার সম্পর্ক ছিল আমার। অনেক দিন আগে একদিন ফোন করেছি। কবি, কেমন আছেন?
কবি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। আমার মা চলে গেছেন। আমার আর এখন কেউ নেই।
কবি তখন অবসর জীবন যাপন করছেন। দৈনিক বাংলা থেকে অবসর নিয়ে বাড়িতেই থাকেন। ওই বয়সী একজন মানুষের মায়ের জন্য এই আকুলতা দেখে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম।
ফরিদুর রেজা সাগরের মা বিখ্যাত লেখক রাবেয়া খাতুন। সাগর চ্যানেল আই নিয়ে রাত দেড়টা-দুইটা পর্যন্ত ব্যস্ত। মা রাবেয়া খাতুন এখনো রাত জেগে বসে থাকেন, কখন ছেলে ফিরবে। ছেলেকে না খাইয়ে তিনি খান না, ঘুমাতে যান না।
কোলন ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য নিউ ইয়র্কে গেলেন হুমায়ূন আহমেদ। ১২টা কেমো নেওয়ার পর শুধু মাকে দেখার জন্য দেশে ফিরলেন। দুই সপ্তাহ থেকে আবার নিউ ইয়র্কে যাবেন, তাঁর অস্ত্রোপচার হবে। আমি বুঝতে পারি ছেলে যতটা মায়ের জন্য আকুল, মা তারচেয়ে অনেক বেশি আকুল ছেলের জন্য।
এ রকম কত মায়ের কথা বলব?
প্রত্যেক মানুষেরই দুই মা। এক মা গর্ভে ধারণ করেন, আরেক মা দেশমাতৃকা। এক মা অবলীলাক্রমে তাঁর বুক খালি করেন আরেক মায়ের জন্য। দেশের মুক্তির জন্য, দেশের স্বাধীনতার জন্য এক মায়ের কাছ থেকে আরেক মা উদ্ধারে ছোটেন সন্তান। 'একবার বিদায় দে মা, ঘুরে আসি'। দেশমাতৃকাকে রবীন্দ্রনাথ বলেন 'ওগো মা, তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফেরে'।
কালের কণ্ঠের তৃতীয় জন্মদিন গেল ১০ জানুয়ারি ২০১২। আমরা ৩০ জন শহীদ জননীকে সম্মাননা জানালাম। এক মা তাঁর চার ছেলেকে হারিয়েছেন স্বাধীনতাযুদ্ধে। স্টেজে সেই মা আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, আমার চার ছেলে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছে, আমার কোনো দুঃখ নেই। বাংলাদেশ তো স্বাধীন হয়েছে। এই যে তোমরা আছ, তোমরাই তো আমার ছেলে।
এই হচ্ছেন আমাদের মা। বাংলার মা।
আজাদের মায়ের কথা শুনেছিলাম বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর কাছে। পরে সেই মাকে নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন আনিসুল হক। উপন্যাসের নাম 'মা'। আজাদ ছিলেন এক দুর্দান্ত মুক্তিযোদ্ধা। ঢাকায় গেরিলা অপারেশনের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে ধরা পড়লেন পাকিস্তানিদের হাতে। রমনা থানায় তাঁকে রাখা হলো। খবর পেয়ে মা এলেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। এসে বললেন, 'শক্ত হয়ে থেকো বাবা। সহযোদ্ধাদের নাম বোলো না।' আজাদ বললেন, 'না মা, বলব না। তুমি কাল যখন আসবে, আমার জন্য ভাত নিয়ে এসো। কত দিন ভাত খাই না।'
পরদিন ছেলের জন্য ভাত নিয়ে গেছেন মা। গিয়ে দেখেন, ছেলে নেই। নেই তো নেই-ই। ছেলেকে আর ফিরে পাননি মা। তারপর ১৪ বছর বেঁচে ছিলেন আজাদের মা। কিন্তু একটি দিনের জন্যও ভাত মুখে দেননি। তাঁর ছেলে ভাত খেতে চেয়েছিল, ছেলের মুখে ভাত তুলে দিতে পারেননি, তিনি সেই ভাত কেমন করে খান!
এই হচ্ছেন আমাদের মা। বাংলার মা।
থানায় আজাদকে থাকতে দেওয়া হয়েছিল খোলা মেঝেতে। মাথার তলায় বালিশ ছিল না। আজাদের মা যত দিন বেঁচে ছিলেন মেঝেতে শুয়ে থাকতেন, তাঁরও মাথার তলায় বালিশ থাকত না। এক মায়ের স্বাধীনতার জন্য আরেক মায়ের এই ত্যাগ বাংলাদেশ কেমন করে ভুলবে!
বিক্রমপুরের মেদিনী মণ্ডল গ্রামে আজাদদের বাড়ি আর আমার নানাবাড়ি একই সীমানায়। আজাদ ও তাঁর মায়ের কথায় আজও চোখের জল ফেলে এলাকার মানুষ।
বাঙালি মা তাঁর সন্তানের সমগ্র সত্তাজুড়ে, হৃদয় এবং আত্মাজুড়ে। অবাক হলে বাঙালি সন্তানরা বলে, ওমা, কী আশ্চর্য! ব্যথা পেলে বলে, উহ মাগো। নিজের অজান্তেই বলে! কিন্তু মায়ের মর্যাদা কি আগের মতো আছে আমাদের কাছে? ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ায় কিংবা অন্যান্য আধুনিক দেশে অনেক আগেই বৃদ্ধ মা-বাবার জন্য তৈরি হয়েছে 'ওল্ডহোম'। গত ১০-১২ বছরে বাংলাদেশেও হয়েছে এ রকম প্রতিষ্ঠান। সেসব প্রতিষ্ঠানের বাতাস আজ ভারী হচ্ছে কত দুঃখিনী মায়ের দীর্ঘশ্বাসে, কত বাবার হাহাকারে! বাঙালি পরিবারের চেহারাটা একসময় ছিল এমন, মা-বাবা ছেলেমেয়েদের মানুষ করবেন, বড় করবেন, যাতে বৃদ্ধ বয়সে ছেলেমেয়েরা তাঁদের দেখাশোনা করে, সেবাযত্ন করে। আমাদের সেই মনোভাব ধীরে ধীরে ভাঙতে শুরু করেছে। আধুনিকতার নামে মা-বাবাকে আমরা দূরে সরিয়ে দিচ্ছি, পর করে দিচ্ছি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাড়ির বউটির কারণে ছেলে পারছে না তার মা-বাবাকে সংসারে রাখতে। এই হচ্ছে বাস্তবতা। কিন্তু বউটির ভাবা উচিত একদিন তার জীবনেও আসবে এই সময়। একদিন তার দীর্ঘশ্বাসেও ভারী হবে ওল্ডহোমের বাতাস। অথচ আমাদের চারপাশে কত মাতৃভক্তির ঘটনা। মায়ের আদেশ পালন করার জন্য ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ঝড়ের রাতে উত্তাল দামোদর নদ সাঁতরে পার হয়েছিলেন। হজরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.)-এর মা পানি খেতে চেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ছেলে পানির গ্লাস নিয়ে সারা রাত মায়ের শিয়রে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কখন মায়ের ঘুম ভাঙবে, কখন মাকে পানি খাওয়াবেন। ফ্রান্সের সম্রাট নেপোলিয়ান বোনাপার্টের হাতে বন্দি এক ইংরেজ সৈনিক পিপে দিয়ে পলকা এক নৌকা তৈরি করে সমুদ্র পাড়ি দিতে চেয়েছিল। ধরা পড়ার পর সম্রাটকে সে বলেছিল, দেশে আমার মা আছেন। মাকে দেখতে যাব। অনেক দিন মাকে দেখি না। সৈনিকের মাতৃভক্তি দেখে নেপোলিয়ান বোনাপার্ট নিজ জাহাজে করে তাকে ইংল্যান্ডে তার মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। আর আমরা দিনে দিনে মায়ের কাছ থেকে সরে যাচ্ছি। মাকে পর করে দিচ্ছি।
আজ মা দিবস। আমার মনে হয় মায়ের জন্য নির্দিষ্ট কোনো দিবস নেই, প্রতিটি দিবসই মা দিবস। প্রতিটি ঘণ্টা, প্রতিটি মিনিট, প্রতিটি সেকেন্ডই মায়ের জন্য। এক গর্ভধারিণী মা, আরেক মা দেশমাতৃকা। এই দুই মায়ের জন্যই আমাদের বেঁচে থাকা, আমাদের গভীর, গভীরতর ভালোবাসা। আমরা একই কণ্ঠে দুই মায়ের কথা বলব, 'মধুর আমার মায়ের হাসি/চাঁদের মুখে ঝরে/মাকে মনে পড়ে আমার, মাকে মনে পড়ে।' আবার বলব, 'ওমা, তোমার চরণ দুটি বক্ষে আমার ধরি/আমার এই দেশেতে জন্ম যেন, এই দেশেতে মরি।'

No comments

Powered by Blogger.