ভারতে মাওবাদী বিদ্রোহ-অরণ্যে, কমরেডদের সঙ্গে by অরুন্ধতী রায়

দরজার নিচ দিয়ে আসা খামবন্ধ একচিলতে টাইপ করা চিঠিটি ভারতের গুরুতর নিরাপত্তা হুমকির সঙ্গে আমার মোলাকাত নিশ্চিত করেছে। মাসের পর মাস আমি তাদের জবাবের জন্য প্রতীক্ষা করছিলাম। ছত্তিশগড়ের দান্তেওয়াদার মা দান্তেশ্বরী মন্দিরে আমাকে তাদের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।


দান্তেওয়াদা এক অদ্ভুত শহর। যেন কোনো সীমান্ত শহরকে ভারতের একদম মাঝখানে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। একটি যুদ্ধের উৎপত্তিস্থল এটি, যেখানে সবকিছু উল্টে গেছে।
ইন্দ্রাবতী নদী পেরুলেই মাওবাদী নিয়ন্ত্রিত এলাকা। পুলিশ একে বলে ‘পাকিস্তান’। সেখানে গ্রামগুলো বিরান কিন্তু জঙ্গলে গিজগিজ করছে মানুষ। বনের গ্রামগুলোর বিদ্যালয়গুলো হয় উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, নয়তো সেগুলোতে আস্তানা গেড়েছে পুলিশ। এখানকার অরণ্যের জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ভয়াবহ এক যুদ্ধ ঘোষণা করেছে ভারত সরকার। প্রকাশ্যে এ যুদ্ধের অস্তিত্ব স্বীকার না করলেও, এই যুদ্ধ নিয়ে সরকার গর্বিত। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (এই যুদ্ধের সিইও) পি চিদাম্বরম বলেছেন, ‘অপরাশেন গ্রিন হান্ট’ বলে কিছু নেই, সব মিডিয়ার সৃষ্টি। অথচ বিরাট অঙ্কের টাকা ঢালা হচ্ছে এর পেছনে, জমায়েত করা হচ্ছে লাখ লাখ সেনা। এই যুদ্ধের রণাঙ্গন মধ্য ভারতের অরণ্য হলেও, আমাদের সবার জন্য এর পরিণতি গুরুতর।
বনের মধ্যে মুখোমুখি হওয়া দুই পক্ষের মধ্যে কোনো তুলনা চলে না। একদিকে রয়েছে বিপুল আধা সামরিক বাহিনী; যাদের রয়েছে অর্থ, অস্ত্রক্ষমতা, মিডিয়া ও এক উদীয়মান পরাশক্তির দম্ভ। অন্যদিকে রয়েছে মামুলি অস্ত্রে সজ্জিত সাধারণ গ্রামবাসী, যাদের পেছনে রয়েছে দারুণ সংগঠিত, প্রচণ্ডভাবে উদ্দীপ্ত মাওবাদী গেরিলাদের লড়াকু শক্তি। রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের লড়াইয়ের ইতিহাস অনেক পুরোনো: পঞ্চাশের দশকের তেলেঙ্গানা বিদ্রোহ, ষাটের দশকের শেষ থেকে সত্তরের দশক অবধি পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও অন্ধ্র প্রদেশের শ্রীকাকুলাম এবং আবার আশির দশক থেকে অন্ধ্র, বিহার ও মহারাষ্ট্রে তারা মুখোমুখি হয়েছে। এখন পর্যন্ত এই লড়াই চলছে। পরস্পরের কৌশল ও যুদ্ধপ্রণালী দুই পক্ষের কাছেই অনেক পরিচিত। প্রতিবারই মনে হয়েছে, মাওবাদীরা কেবল পরাজিতই নয়, একেবারে নির্মূল হয়ে গেছে। কিন্তু প্রতিবারই আগের থেকে সংগঠিত, সংকল্পবদ্ধ ও প্রভাবশালী হয়ে তারা ফিরে এসেছে। আজ আবার তাদের অভ্যুত্থান ছড়িয়ে পড়ছে ভারতের খনিসমৃদ্ধ ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, উড়িষ্যা ও পশ্চিমবঙ্গের বনাঞ্চলে। ভারতের লাখ লাখ আদিবাসীর এই মাতৃভূমি আজ করপোরেট জগতের স্বপ্নভূমিও বটে।
শহুরে সুবোধ ভদ্রলোকদের পক্ষে বিশ্বাস করা সহজ যে যারা নির্বাচনকে ভাওতাবাজি মনে করে, সংসদকে বলে শুওয়ের খোয়াড় এবং যারা খোলাখুলি ভারতীয় রাষ্ট্রকে উচ্ছেদ করতে চায়; সরকারের সঙ্গে লড়াই চলছে সেই মাওবাদীদের। তারা সহজেই ভুলে যায়, মাও-য়ের জন্মেরও শত বছর আগে থেকেই মধ্যভারতের উপজাতীয় জনগণ প্রতিরোধ চালিয়ে আসছে। না লড়লে তারা মুছে যেত। ব্রিটিশ সরকার, জমিদার ও সুদখোর মহাজনদের বিরুদ্ধে হো, ওরাঁও, কোল, সাঁওতাল, মুণ্ডা ও গণ্ডরা বারবার বিদ্রোহ করেছে। প্রতিবারই নৃশংসভাবে তাদের দমন করা হয়েছে, খুন হয়েছে হাজারে হাজারে, কিন্তু তারা বশ মানেনি। এমনকি স্বাধীনতার পরের প্রথম অভ্যুত্থানগুলোও ঘটিয়েছে তারাই। নকশালবাড়ী আন্দোলন ভারতের প্রথম মাওবাদী আন্দোলন। তখন থেকেই নকশালী রাজনীতি ও আদিবাসীদের প্রতিরোধ একাকার হয়ে গেছে।
ভারতের সরকারগুলো সব সময় তাদের প্রান্তিক করে রেখেছে। ১৯৫০ সালে গৃহীত ভারতের নতুন সংবিধানে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক বিধিগুলো বহাল রাখা হলে আদিবাসীদের জন্মভূমি রাষ্ট্রের হাতে চলে যায়। রাতারাতি রাষ্ট্র তাদের খেদিয়ে অল্প কিছু জায়গার মধ্যে জড়ো করে। তারা বঞ্চিত হয় বনের ফলফলাদি থেকে, তাদের জীবনযাত্রাকে বেআইনি করে দেওয়া হয়। তারা ভোটাধিকার পায়, কিন্তু হারায় তাদের জীবনধারণের উপায় আর সম্মান।
যতবার বড় বাঁধ, সেচপ্রকল্প কিংবা খনি করার প্রয়োজনে বিপুলসংখ্যক মানুষকে সরাতে হয়েছে, প্রতিবারই সরকার ‘উপজাতীয়দের মূল ধারায় সামিল’ করা অথবা তাদের ‘উন্নয়নের সুফল’ দেওয়ার কথা বলেছে। ভারতে কেবল বাঁধ বানাতেই তিন কোটি মানুষকে উচ্ছেদ হয়ে যেতে হয়েছে। তারা হলো ভারতের প্রগতির বাস্তুহারা, আর তাদের বড় অংশই হলো উপজাতীয়। তাই যখনই সরকার উপজাতীয়দের কল্যাণের কথা বলে, তখনই তারা দুশ্চিন্তায় পড়ে।
অতি সম্প্রতি ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম জানিয়েছেন, তিনি চান না উপজাতীয় সংস্কৃতি ‘জাদুঘরে থাকুক’। কিন্তু পেশাগত জীবনে করপোরেট আইনজীবী হিসেবে যখন তিনি বেশ কয়েকটি খনি কোম্পানির হয়ে কাজ করছিলেন তখন আদিবাসীদের কল্যাণে তাঁর আগ্রহ ছিল বলে জানা জায় না। গত পাঁচ বছরে ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, উড়িষ্যা ও পশ্চিমবঙ্গের সরকার খনি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে শত শত বিলিয়ন ডলারের শত শত সমঝোতাপত্র সই করেছে। ইস্পাত ও লৌহ কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, অ্যালুমিনিয়াম পরিশোধনাগার, বাঁধ ও খনির জন্য করা এসব চুক্তির সবই হয়েছে গোপনে। এসবের মাধ্যমে টাকা বানানোর স্বার্থে আদিবাসীদের বসতি ছাড়তেই হবে।
অতএব, এই যুদ্ধ।
একটি দেশ যা নিজেকে বলে গণতান্ত্রিক, তা যখন নিজ সীমান্তের ভেতরেই যুদ্ধ ঘোষণা করে, তখন কেমন হয় সেই যুদ্ধ? প্রতিরোধের কোনো সুযোগ তখন থাকে কি? মাওবাদী কারা? তারা কি কেবলই কোনো অচল মতবাদ কায়েম করতে চাওয়া নৈরাজ্যবাদী, নাকি অসহায় উপজাতিদের স্বার্থের সঙ্গী? সশস্ত্র সংগ্রাম মাত্রই অগণতান্ত্রিক?
রওনা হওয়ার আগের দিন ঘন স্বরে মা বললেন, ‘আমার কেবলই মনে হচ্ছে, ভারতের এখন একটা বিপ্লব প্রয়োজন।’
ইন্টারনেটের একটি লেখা বলছে, মাওবাদী সংগঠনগুলোকে ‘নেতৃত্বহীন’ করতে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ভারতের ৩০ জন উচ্চপদস্থ পুলিশ অফিসারকে টার্গেট করে গুপ্তহত্যার প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। সংবাদমাধ্যমে খবর আসছে, ইসরায়েল থেকে অনেকগুলো যন্ত্র কেনা হয়েছে গরিবদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য মোক্ষম সব অস্ত্র: লেজার রেঞ্জ-ফাইন্ডার, থার্মাল ইমেজিং ইক্যুইপমেন্ট ও চালকবিহীন বিমান। মার্কিন সেনাবাহিনীতে এগুলো খুবই জনপ্রিয়।
রায়পুর থেকে দান্তেওয়াদা যাওয়ার ১০ ঘণ্টা পথের অঞ্চলটিকে বলা হয় ‘মাওবাদী উপদ্রুত’ এলাকা। উপদ্রব নির্মূল করাই নিয়ম। এভাবে গণহত্যার শব্দ আমাদের ভাষায় ঢুকে পড়েছে। রায়পুরের ঠিক বাইরেই বিরাট এক বিলবোর্ডে বেদান্ত ক্যান্সার হাসপাতালের বিজ্ঞাপন। উড়িষ্যায় এই কোম্পানি (এখানেই একসময় চাকরি করতেন আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) যেখানেই বক্সাইটের খনি বানায়, সেখানেই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে টাকা দেয়। এভাবেই খনি কোম্পানিগুলো আমাদের মনের মুকুরে জায়গা করে নেয়। তাদের এই কৌশলের নাম করপোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি (সিএসআর)—সামাজিক ভাবে দায়বদ্ধ করপোরেট। এই সিএসআরের মাধ্যমেই তারা তাদের অর্থনৈতিক কায়কারবার লোকচুক্ষুর আড়ালে রাখে। কর্ণাটক রাজ্যের সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদন বলছে, প্রতি টন লোহার জন্য খনি কোম্পানি সরকারকে দেয় ২৭ রুপি আর তাদের লাভ হয় পাঁচ হাজার টাকা। বক্সাইট কিংবা অ্যালুমিনিয়াম খনিতে লাভের হার আরও আরও বেশি। এভাবেই প্রকাশ্য দিবালোকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার লুট হয়ে যাচ্ছে। এই টাকা দিয়েই তারা নির্বাচন, বিচারক, সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেল, এনজিও ও সাহায্য সংস্থাগুলোকে কিনে রাখতে পারে। তাই কোথাও ক্যান্সার হাসপাতাল দেখলেই আমার সন্দেহ হয়, আশপাশে কোথাও খনি রয়েছে। তাই অবাক হওয়ার কিছু নেই যখন একটি সরকারি প্রতিবেদনেই বলা হয়, ছত্তিশগড়ের সরকারি মদদে গঠিত খুনে বাহিনী সালভা জুদামকে প্রথম অর্থদানকারীদের মধ্যে টাটা স্টিল ও এসার স্টিল অন্যতম।
আমার পথে পড়ল ব্রিগেডিয়ার বি কে পনওয়ারের বিখ্যাত সন্ত্রাসবিরোধী ও জঙ্গলযুদ্ধ প্রশিক্ষণ কলেজ। তাঁর কাজ হলো দুর্নীতিবাজ ও বখাটে পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিয়ে জঙ্গল-কমান্ডো বানানো। প্রতি ছয় সপ্তাহে এখান থেকে ৮০০ পুলিশ সদস্য যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়ে বের হন। ভারতজুড়ে এ রকম আরও ২০টি কলেজ হচ্ছে। এভাবে পুলিশকে সেনা বানানো হচ্ছে (কাশ্মীরে হচ্ছে উল্টোটা। সেখানে সেনাবাহিনীই করছে পুলিশ ও প্রশাসনের কাজ)। যাই করা হোক, তাদের শত্রু হলো জনগণ।
দান্তেশ্বরী মন্দিরে সময়মতোই পৌঁছলাম। কথামতো আমার হাতে ক্যামেরা ও নারকেল, কপালে টিপ। কিন্তু ক্যাপ পরা কাউকে দেখা গেল না। কয়েক মিনিটের মধ্যে একটি কিশোর আমার সামনে এল। কিন্তু সংকেতবাক্য বলল না। সঙ্গে একটি আউটলুক পত্রিকা ও কলা আনার কথা তার, সেগুলোও দেখা গেল না। একটি চিরকুট দিল সে, তাতে লেখা: ‘আউটলুট পত্রিকা পাওয়া গেল না’। আর কলা?
‘খেয়ে ফেলেছি’, কিশোরটি বলল, ‘ক্ষুধা লেগেছিল।’
তার কাঁধে একটি ঝোলা। তার নাম মাংটু। এই নাকি ভারতের বৃহত্তম নিরাপত্তা হুমকি?
মন্দির থেকে হেঁটে কিছুটা এগোতেই সবকিছু দ্রুত ঘটতে লাগল। মোটরবাইকে করে দুটো লোক এল। তারা ইশারা করল যে ঠিক আছে। তাদের পেছনে চড়ে বসলাম। জানি না কোথায় যাচ্ছি। স্থানীয় পুলিশ সুপারের বাড়ি পার হলাম। গতবার এখানে এসে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। সেই এসপি অকপটে বলেছিলেন, ‘দেখুন ম্যাম, খোলাখুলি বলছি, এই সমস্যার সমাধান পুলিশ বা সেনাবাহিনী দিয়ে হবে না। এসব উপজাতীয়ের সমস্যা হলো, তারা লোভ বোঝে না। তাদের লোভী করে তুলতে না পারলে আমাদের কোনো আশা নেই। আমি আমার বসকে বলেছি, বাহিনীগুলো সরিয়ে নিন আর প্রত্যেক আদিবাসীর বাড়িতে একটি করে টেলিভিশন দিয়ে দিন। দেখবেন, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।’
আমরা শহর পেরিয়ে এলাম। তিন ঘণ্টা চলার পর হঠাৎ এক জায়গায় তারা থামল। আমি আর মাংটু নেমে পড়লাম। ঝোলা কাঁধে নিয়ে আমি এই পুঁচকে অভ্যন্তরীণ হুমকির পিছু পিছু রাস্তা ছেড়ে বনের ভেতর ঢুকলাম। দিনটা দারুণ সুন্দর। বনের মেঝে যেন ঝরাপাতার সোনায় মোড়া। কিছুটা যাওয়ার পর একটা নদী পড়ল।‘ওই পারে’ সেই এসপি বলেছিলেন, ‘কাউকে দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেওয়া আছে।’ নদীটা পার হতে হতে আমার সেই কথা মনে পড়ল। কিন্তু মাংটুকে মনে হলো নিশ্চিন্ত। ওর পিছু পিছু আমিও ঢুকে পড়লাম মাওবাদী অধ্যুষিত দণ্ডকারণ্যের অরণ্যের আরও গভীরে। ...
অরণ্যে থাকার শেষ রাতে আমরা ক্যাম্প করলাম একটি পাহাড়ের ঢালে। এটা পার হলেই সেই রাস্তা, যেখানে আমাকে মোটরবাইক থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই কদিনে বনটাও যেন বদলে গেছে। চিরাউঞ্জি, তুলা আর আমগাছগুলোয় ফুল আর মুকুল ফোটা শুরু করেছে।
কুদুর গ্রামবাসীরা আমার জন্য সদ্য ধরা মাছ পাঠিয়েছে। আর পাঠিয়েছে বন থেকে পাওয়া আর তাদের ফলানো একাত্তর পদের ফল, সবজি, কলাই ডাল, পতঙ্গের একটি তালিকা। সামান্য একটি তালিকা, অথচ এটাই যেন তাদের দুনিয়াকে বোঝার মানচিত্র।
বনে খবর আসে ছোট ছোট চিরকুটে করে। ওরা বলে বিস্কুট। আমার জন্য এ রকম দুটি বিস্কুট এসেছে। কমরেড নর্মদা পাঠিয়েছে একটি কবিতা আর কমরেড মাসে পাঠিয়েছে সুন্দর এক চিঠি (অথচ কখনো কি জানব, কে এই নারী?)।
কমরেড সুখদেবের কম্পিউটারে আমি ইকবাল বানোর গাওয়া কবি ফায়েজ আহমদ ফায়েজের লেখা ‘হাম দেখেঙ্গে’ গানটি তুলে দিলাম। গানটি তিনি গেয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হকের দুঃশাসনের সময় লাহোরের একটি বিখ্যাত কনসার্টে।
যখন বাতিল আর অভিশপ্তরা বসবে উঁচুতে,
সব মুকুট আর সিংহাসন ধুলায় লুটাবে
হাম দেখেঙ্গে
জবাবে লাহোরের ৫০ হাজার দর্শক একসঙ্গে আওয়াজ তুলেছিল, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ, বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’। এত এত বছর পর সেই আওয়াজ আবার এই অরণ্যে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। অদ্ভুত, এই মিল!
‘যারা ভুল করে মাওবাদীদের চিন্তা অথবা কাজ দিয়ে সাহায্য করবে’, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের হুমকি দিয়েছেন। সংগীত ভাগাভাগি করা কি সে রকম অপরাধের পর্যায়ে পড়ে?
ভোরবেলায় আমি বিদায় নিলাম। হাঁটা শুরু করার পর এই প্রথম দেখলাম নীতি আর সুখদেব তাদের একে ৪৭-এর সেফটি ক্যাচ অন করে নিল। ‘আমাদের ওপর আক্রমণ শুরু হলে আপনি কী করবেন জানেন?’, বলল সুখদেব।
‘হ্যাঁ’, বললাম আমি, ‘সঙ্গে সঙ্গে আমরণ অনশন ঘোষণা করব।’ শুনে পাথরের ওপর বসে সে হাসতে লাগল।
এক ঘণ্টা ধরে আমরা পাহাড়ে উঠলাম। নিচে সেই রাস্তা, যা দিয়ে মাওবাদী অরণ্যে ঢুকেছিলাম। লুকিয়ে আমরা মোটরবাইকের আওয়াজের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। যখন তা এল, চকিতে লাল সালাম বলে বিদায় জানাল ওরা। লাল সালাম কমরেড।
পেছন ফিরে দেখি, তারা সেখানে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। হাত নাড়ছে। ছোট্ট এক বন্ধন। যখন দুনিয়া বাস করছে দুঃস্বপ্নের মধ্যে, তখন ওই মানুষেরা স্বপ্ন নিয়ে লড়াই করছে। প্রতি রাতে আমার এই সফরের কথা মনে আসে। মনে আসে সেই সব রাতের আকাশ, সেই সব বনের পথ। আমি যেন দেখি, আমার টর্চের আলোয় ক্ষয়ে যাওয়া চপ্পলের ওপর কমরেড কমলার পা হেঁটে চলেছে। জানি, সে এখনো ছুটে বেড়াচ্ছে। ছুটছে, কেবল তার নিজের জন্য নয়, আমাদের সবার হয়ে আশাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য।

ভারতের আউটলুক ম্যাগাজিন থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর ফারুক ওয়াসিফ।
অরুন্ধতী রায়: বুকার পুরস্কারপ্রাপ্ত ভারতীয় উপন্যাসিক।

No comments

Powered by Blogger.