রক অ্যান্ড রোল, তার রাজপুত্র, আর রাংতা দিন by অনির্বাণ ভট্টাচার্য

ন্মাদনার ইংরেজি কী? এলভিস প্রিসলি। কিংবা প্রথম সুপারস্টার, নিয়ম ভাঙা আর পাগলামিও বলা যেতে পারে। ৮ জানুয়ারি ছিল তাঁর জন্মদিন। লিখেছেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য। আনন্দবাজার পত্রিকার সৌজন্যে। মেমফিস। একদিন দুপুর। সান রেকর্ডসের স্টুডিও। একটা ছেলে খুব ইতস্তত করে দরজা ঠেলে ঢুকল। তারপর অল্প তুতলে বলল, একটা গান রেকর্ড করা যাবে? মায়ের জন্মদিনের উপহার (যদিও সে দিনটা দুই মাস আগেই পেরিয়েছে, হাতখরচা জমেছে তো এখন!)।


সান রেকর্ডসের সর্বেসর্বা স্যাম ফিলিপ্স তখন স্টুডিওতে নেই, কিন্তু সহকারী মারিয়ন কেউসকার ছিলেন। তিনি ভ্যাবাচ্যাকা ছেলেটাকে প্রশ্ন করলেন, 'ও হে ছোকরা, কার মতো গাও তুমি?' ছেলেটা ভেবে পেল না, কার মতো। বলল 'কারো মতো না।' মারিয়ন বুঝলেন, বেশি ঘাঁটিয়ে লাভ নেই। চার ডলার দক্ষিণা নিয়ে স্টুডিওতে ঢুকিয়ে দিলেন।
না, এর পরই ছেলেটা ভগবান হয়ে যায়নি। সে মুহূর্তের আগে এলভিসের জীবনে আসবেন স্যাম ফিলিপ্স। স্যাম ঠিক সোজা রাস্তায় হাঁটা পাবলিক ছিলেন না। মানে খারাপ কিছু না, জাস্ট চলতি হাওয়ার উল্টো ফুটে ভাসতে ভালোবাসতেন। স্যাম তখন এ ঘাট সে ঘাট করে বেড়াচ্ছেন একটা ব্যতিক্রমী গলার খোঁজে। যে গলা হবে হয়তো কোনো 'সাদা চামড়া'র, কিন্তু তা থেকে বেরোবে একটা 'নিগ্রো' মানুষের ঝাঁঝ। সেই আদিম ব্ল্যাক স্পিরিট। যে স্পিরিট পাওয়া যেত কিছু মার খাওয়া কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাসের গোঙানিতে। আমেরিকার সুনসান, অপরিচিত আবহাওয়ায় চাবুক খেতে খেতে ওরা শুধু গাইত, মনে করত ফেলে আসা ঘরবাড়ির কথা। সেটাই তো 'ব্লুজ'। তেমনই তো গসপেল মিউজিক। আর না পেরে ঈশ্বরের কাছে হাউমাউ করে কান্না। যার ব্যথা নেই, তার গলা থেকে এ স্বর কিছুতেই বেরোবে না।
এলভিস আবার ছোট থেকেই এমন সব এলাকায় বড় হচ্ছিল। বাবা ভার্নন হদ্দ গরিব, মা গ্ল্যাদিস-ই টেনেটুনে সংসার চালাতেন। তাঁদের পাড়ায় ভরাভর্তি শ্বেতাঙ্গ, কিন্তু সব্বাই প্রায় সমাজের পিরামিডের এক্কেবারে তলানি। মানে দেখতে এক, সম্মানে আরেক। পাড়ার চৌহদ্দি পেরিয়েই আবার কালো মানুষের ভিড়। ছোট্ট এলভিসের খেলার বন্ধু ছিল ওই ভিড়। ফলে এলভিসের মনে শুরু থেকেই লেগে যাচ্ছিল, ওদের আদবকায়দা, ওদের ভাষা, ওদের গান আর ওদের ওই স্পিরিট। সেই সব নিয়ে ভালোই কাটত বিকেলগুলো, শুধু বাড়ি ফেরার কম আলোয় বড্ড কষ্ট হতো। মনে হতো, আর একটু হাত ছড়িয়ে যদি থাকা যেত...কষ্টে আরো হাওয়া দিত পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়া ট্রেন। পার হয়ে যাওয়া হুইসেল সব সময় বেদনা দেওয়া। ঠিক অপরাজিত...
ফেরা যাক, সান রেকর্ডসের স্টুডিও। এলভিসের গান শুনে মারিয়ন তেমন একটা অভিভূত হননি বটে, কিন্তু কোথায় যেন মনে হয়েছিল, স্যাম এই গলাটা একবার শুনুক। স্যাম শুনলেন, তারপর বললেন, আরো দেখতে হবে। স্যাম এলভিসকে স্টুডিওতে ডেকে বললেন, পছন্দের যা ইচ্ছে গাও। সঙ্গে জুড়ে দিলেন স্কটি মুর আর বিল ব্ল্যাককে, গিটার ও বেস-এ।
তিনজন মিলে অনেকক্ষণ ধরে হিট সব গান গাইল, স্যামের তাও মন ভরে না। স্যাম বুঝতে পারছিলেন, এদের দিয়েই হবে, কিন্তু সেই স্পার্ক তখনো আসছিল না। সেই স্পার্ক এল, যখন ওরা আর না পেরে খানিক জিরিয়ে নিচ্ছিল। এলভিস হঠাৎ তারস্বরে গেয়ে উঠল, 'দ্যাট্স অল রাইট মামা...' (বিখ্যাত গাইয়ে আর্থার ক্রুডাপের একটি গান)। খেলার ছলেই স্কটি আর বিল সঙ্গত করতে লাগল। স্যাম হঠাৎই শুনতে পেলেন সেই আদিম বেদনা। পাশের ঘর থেকে উঁকি দিয়ে বলে উঠলেন, 'আর একবার হোক, একটু মন দিয়ে।' এলভিস এবার পেট থেকে চেঁচিয়ে উঠল, 'দ্যাট্স অল রাইট মামা...' ভেঙে পড়ার মুহূর্তে যেন নিজেই নিজেকে অভয় দিচ্ছে।
ব্যস, এরপর এক রাতেই আমেরিকা দুলে গেল। আর পৃথিবী পেল তার প্রথম সুপারস্টার। রেডিওর সব নব-ই তখন ওর স্বর খুঁজছে। মুশকিল হলো, এলভিস এসবের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না। ফলে দেখতে দেখতেই নিজের রান্না করা উন্মাদনায় চোখ বুজে ডুবে গেল। কথায় কথায় ক্যাডিল্যাক গাড়ি কিনে ফেলল, প্রায় প্রত্যেক শহরেই গার্লফ্রেন্ড পাতিয়ে ফেলল, হোয়াইট হাউসে গিয়ে প্রেসিডেন্ট নিঙ্নের ড্রয়ার পর্যন্ত ঘেঁটে তুলকালাম বাধাল। কারণ এ গ্রহে হিরো বলতে, আর কে-ই বা?
ওর শেষ জীবন টের পেয়েছিল, এই মাত্রাছাড়া কম্মের ফল। চাপ কমানোর বন্ধু হলো ড্রাগ। মৃত্যুর কারণ। 'ব্লু হাওয়াই' ছবিতে এলভিস প্রিসলি কিন্তু ধ্বংসের কাহিনী, আজ থাক। আজ ভাবব না, কেন চার্চ ওর বিরুদ্ধে চলে গেল, কেন এফবিআই সমাজের এক বড় বিপদ হিসেবে চিহ্নিত করল ওকে, কেন ওকে মাঝরাতে বাবাকে ডাকতে হতো, টিভির ছবি অ্যাডজাস্ট করতে। এলভিসের গল্প এই সবের সঙ্গে আরো অনেক কিছুরও।
যেমন একটা শক্ত আস্তরণ ভেঙে বেরুনোর। যুদ্ধোত্তর আমেরিকায়, যখন সব্বাই লাইন মেনে হাঁটছে, তখন এলভিসই ুপ্রথম লাইন ছেড়ে বেরুল। আপাত সুগার-সুইট আবহাওয়া ঘেঁটে দিয়ে বলল, 'রক অ্যান্ড রোল আমি শুরু করিনি, ঢের আগেই নিগ্রোভাইয়ারা করে গিয়েছে। ওরা ক্রেডিট পাবে না কেন?'
তারপর জাস্ট তুড়ি মেরে গোটা সংস্কৃতির রূপ পাল্টে দিল। টিনএজারদের হাতে হাতে চলে এল রেকর্ড প্লেয়ার, রেডিও, গিটার। কখনো না দেখা একটা ইয়ুথ কালচার গড়ে উঠল, ওকে ধরে। আর স্টেজে দাঁড়িয়ে যখন এলভিস সমস্ত শরীরী পরিভাষা এঁকে-বেঁকে ওর আঙুল, পা আর গলা কাঁপাত, তখন হাজারো মেয়ে নির্দ্বিধায় মন সমর্পণ করত ওর পায়ে। শুধুই গলার ভাব বদলে, অন্যের শরীরে যদি কেউ এমন রিঅ্যাকশন আনতে পারে, সে অবশ্যই স্পেশাল। শুনেছি, রেডিওতে এলভিসের স্বর শুনেই কত মহিলা আত্মহননের শেষ পা থেকে ফিরে এসেছিলেন। বেঁচেছিলেন আরাম করে, তাজা হাওয়ায়। আর তাই বোধ হয়, কেউ কেউ এখনো এলভিসকে একলা রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। ওনলি ভরসা যে। এখনো।

No comments

Powered by Blogger.