টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে আলোচনার প্রস্তাবকে স্বাগত জানাল ভারত-দিল্লি যাচ্ছেন দুই উপদেষ্টা

প্রস্তাবিত টিপাইমুখ বাঁধ ইস্যুতে আলোচনার জন্য বাংলাদেশের প্রস্তাবকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানিয়েছে ভারত। এ লক্ষ্যে প্রতিনিধিদল পাঠালে তাকেও স্বাগত জানাবে দেশটি। গতকাল মঙ্গলবার রাতে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়। বিবৃতিতে ভারত দাবি করে, টিপাইমুখ বাঁধের কারণে বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি হবে না। ঢাকায় কূটনৈতিক সূত্রগুলোও এ ধরনের বার্তা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।


এদিকে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ ইস্যুতে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে আজ বুধবার ভারতের রাজধানী নয়াদিলি্ল সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান ও আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী। ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, দিলি্লতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের উপদেষ্টা শিব শঙ্কর মেননের সঙ্গে তাঁদের বৈঠক হবে।
বৈঠকের আলোচ্যসূচি সম্পর্কে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গতকাল রাতে কালের কণ্ঠকে জানান, যৌথ ইশতেহারসহ দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনার সময় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের অগ্রগতি ছাড়াও সমসাময়িক বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনা হবে।
গতকাল ভারতীয় হাইকমিশনের বিবৃতিতে বলা হয়, টিপাইমুখ বাঁধের ব্যাপারে ১৯৭২ সাল থেকে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে। বিশেষ করে সিলেট ও ভারতীয় এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে এ বাঁধ নির্মাণের ব্যাপারে আলোচনা হয়েছিল।
ভারতীয় হাইকমিশন বলেছে, প্রস্তাবিত প্রকল্প নিয়ে ভারত সব সময় বাংলাদেশকে তথ্য দিয়ে আসছে। এর ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালের জুলাইয়ে যখন বাংলাদেশের সংসদীয় প্রতিনিধিদল সফর করেছিল তখনো একই ধরনের আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি বিশেষজ্ঞদের তৈরি সমীক্ষাসহ সব কিছু নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা হয়। তখন বলা হয়েছিল, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ করা হবে। সেচের জন্য পানি সরিয়ে নেওয়া ওই বাঁধ নির্মাণের উদ্দেশ্য নয়।
ভারতীয় হাইকমিশন আরো বলেছে, টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের ফলে পরিবেশগত কোনো প্রভাব পড়বে কি না সে বিষয়ে সমীক্ষা চালিয়ে এর বিশদ ফলাফলও বাংলাদেশকে জানানো হয়েছে। ভূমিকম্পের বিষয়টি মাথায় নিয়ে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা রেখেই ওই বাঁধের নকশা প্রণয়ন করা হয়েছে।
ভারতীয় হাইকমিশন জানায়, যৌথ উদ্যোগে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাবের বিষয়ে ভারত সফরকারী বাংলাদেশের সংসদীয় প্রতিনিধিদলকে জানানো হয়েছিল। যৌথ উদ্যোগে একটি কম্পানি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য থেকে গত ২২ অক্টোবর মণিপুর সরকার, এনএইচপিসি লিমিটেড এবং সুতলেজ জলবিদ্যুৎ নিগমের মধ্যে বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে এখনো ওই প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয়নি।
ভারতীয় হাইকমিশন আরো জানায়, ভারত সরকার বাংলাদেশকে সব সময় আশ্বাস দিয়েছে যে টিপাইমুখ বাঁধে বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি হবে না। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ থেকে প্রতিনিধিদলের সফরের জন্য ভারত সরকার অপেক্ষা করছে এবং সফরের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের কাছে ভারত আরো তথ্য চেয়েছে।
বাংলাদেশের সুরমা-কুশিয়ারা নদীর উজানে উত্তর-পূর্ব ভারতে আসামের বরাক নদের ওপর বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের উদ্যোগের কথা কয়েক বছর আগে জানাজানি হওয়ার পর এ দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। বিশেষজ্ঞরা ওই বাঁধের ফলে এ দেশে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন। খোদ ভারতেও ওই বাঁধ নিয়ে বিতর্ক আছে। বাংলাদেশ সরকারের তৎপরতায় ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর কোনো কিছু না করার আশ্বাস দেওয়া হয়। এরপর হঠাৎ করেই এ মাসের মাঝামাঝি টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণে বিনিয়োগ চুক্তির খবর সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলেছেন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের উষ্ণতম এ সময়ে এ দেশকে না জানিয়ে এভাবে গোপন চুক্তিতে তাঁরা বিস্মিত হয়েছেন। অব্যাহত সমালোচনার মুখে বাংলাদেশ সরকার ভারতকে অভিন্ন নদ-নদীতে হস্তক্ষেপ করার আগে আলোচনা করার এবং টিপাইমুখ বাঁধে বাংলাদেশের ক্ষতি হবে কি না তা জানতে যৌথ সমীক্ষা চালানোর তাগিদ দেয়। এ ছাড়া ভারতে একটি প্রতিনিধিদল পাঠানোর কথাও বলা হয়।

No comments

Powered by Blogger.