Monday, January 19, 2026
ইরান আন্দোলন ২০২৬: কেন আলাদা ও ব্যাপক? by এস এম জারিফ
ইরান আন্দোলন ২০২৬: কেন আলাদা ও ব্যাপক? by এস এম জারিফ
এর আগে ইরানে শিক্ষার্থীরা তাঁদের অধিকারের জন্য, ভোটাররা তাঁদের চুরি হয়ে যাওয়া ভোটাধিকার ফিরে পেতে, কখনো বা সাধারণ পরিবারগুলো দ্রব্যমূল্যের চাপ সইতে না পেরে পথে নেমে এসেছে। যুগের পর যুগ যেন একই গল্পের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।
২০০৯ কি ’২২ কি ’২৬—প্রতিবার গল্পটা আগে থেকেই লেখা ছিল বলে মনে হয়েছে। বিক্ষুব্ধ মানুষেরা রাজপথে নামেন, দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা পুরোনো ভাষায় কথা বলেন এবং অবধারিতভাবে বহিঃশত্রুর ওপর দোষ চাপান। অতঃপর আন্দোলনরত মানুষেরা বিক্ষোভের কড়া জবাব পান। শেষমেশ শক্তিশালী রাষ্ট্রব্যবস্থার জয় হয়। আবার ফিরে আসে নীরবতা।
তবে যা-ই বলা হোক না কেন, এবারের বাতাসটা অন্য রকম। ইরানের শাসনব্যবস্থার গভীরে এবার কিছু একটা নড়ে উঠেছে।
ইরানে চলমান এই আন্দোলন কোনো একক রাষ্ট্রীয় নীতি বা ব্যর্থতার প্রতিক্রিয়া নয়। বরং দিনের পর দিন বয়ে চলা অর্থনৈতিক মন্দা, চূড়ান্ত পর্যায়ের সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রান্তিকীকরণ ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের পুনরাবৃত্তি জমে জমে এ অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে।
বিভিন্ন সমীক্ষা, প্রবাসে বসবাসরত ইরানি নাগরিকদের বয়ান ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ইরানের নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যকার বিরাজমান সম্পর্ক বিপর্যয়কর এক অবস্থায় পর্যবসিত হয়েছে। এর ভেতর নতুন প্রজন্মের তরুণদের অংশগ্রহণ আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ একটি নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। এটুকু পরিষ্কার যে তরুণেরা রাষ্ট্র হিসেবে ইরানের আদর্শিক ভিত্তির (যাকে ভিলায়াতে ফকীয় বা ইসলামি বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধান বলা হয়ে থাকে) খুব একটা ভক্ত নয়।
রাজনৈতিক ইসলামের দুর্দিন
প্যারিস ইনস্টিটিউট অব পলিটিক্যাল স্টাডিজের বিশেষজ্ঞ ফারিদ ভাহিদ ‘লে মোঁদ’ পত্রিকায় যুক্তি দেখিয়েছেন যে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ‘ক্লিনিক্যাল ডেথ’ বা মৃত্যুশয্যায় পৌঁছে গেছে। তাঁর মতে, একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থায় উদ্ভূত সমস্যা সমাধানের জন্য ‘মস্তিষ্ক’ ও একটি ‘হৃদয়’ প্রয়োজন। ভাহিদের দাবি, ইরান এর দুটিই হারিয়েছে। কেননা ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের কাছে মুদ্রাস্ফীতি বা সামাজিক হতাশার কোনো সমাধান নেই। তারা কেবল সামরিক দমন-পীড়নের মাধ্যমে পেশিশক্তি দেখিয়েই সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছে।
এটিকে সব ধ্বংসের সূচনা ধরা যায়। ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার সামনে নাগরিকদের বিক্ষোভ দমনে সহিংসতা চালানোর ব্যাপক সক্ষমতা থাকলেও পুরো বিষয়টি আর ‘সজীব’ রাজনৈতিক সত্তার প্রতিনিধিত্ব করছে না।
লন্ডনভিত্তিক রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের (চ্যাথাম হাউস) মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক সানাম ভাকিলের ‘ইরানস লুমিং লিডারশিপ ক্রাইসিস’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেছেন, ইরানিরা রাজনৈতিক ইসলামের ধারণাকে বাতিল করেছে। অর্থাৎ রাষ্ট্র ও নাগরিকের আদর্শিক লড়াইয়ে নাগরিকেরা ইতিমধ্যে জয়ী হয়েছেন। তাঁরা এখন ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ পৃথকীকরণ চাইছেন। জনগণ এমন একটি রাষ্ট্র চাইছে যেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতা থাকবে আর বাকি বিশ্বের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে।
এর অর্থ হলো, ইরানের শাসকগোষ্ঠী এখন শুধু আর একটি বিক্ষোভের বিরুদ্ধে লড়াই করছে না। তারা এমন এক সমাজের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, যে সমাজ ইতিমধ্যে মানসিকভাবে ভবিষ্যতে বসবাস শুরু করে দিয়েছে। আর সেই ভবিষ্যতে এই ধর্মকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার কোনো স্থান নেই।
ধুঁকছে ইরানের গ্র্যান্ড বাজার, হুমকির মুখে অর্থনীতি
ইরানের গ্র্যান্ড বাজারের বণিকশ্রেণি কাজার রাজবংশের আমল থেকে শুরু করে পাহলভি শাসন, এমনকি ইসলামি প্রজাতন্ত্র পর্যন্ত প্রতিটি শাসনব্যবস্থাতেই ইরানের অর্থনৈতিক স্নায়ুকেন্দ্রের ভূমিকা পালন করেছে। ইরানের ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে এর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে এখানকার বাজারিরা (ইরানের ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যিক কেন্দ্র বা গ্র্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ী ও বণিকশ্রেণিকে বোঝানো হয়) শুধু অর্থনীতির চালিকাশক্তিই নয় বরং রাষ্ট্রের নৈতিক বৈধতার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছেন।
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের সময় বাজারিরা ধর্মীয় নেতৃত্ব ও ছাত্রদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে শাহ সরকারের অর্থনৈতিক শিরা কেটে দিয়েছিলেন। পণ্যসরবরাহ বন্ধ করা ও ধর্মঘটের মাধ্যমে তাঁরা রাষ্ট্রযন্ত্রকে অচল করে দেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র বাজারকে শাসনের অন্তর্ভুক্ত করে। করছাড়, ধর্মীয় মর্যাদা ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে বাজারিদের আনুগত্য নিশ্চিত করা হয়।
তবে গত ডিসেম্বরের শেষে রিয়ালের দর ডলারের বিপরীতে ১৪ লাখ ৮০ হাজারে নেমে আসে। ৫০ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতি আর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যের চাপে এ আন্দোলন আর নাগরিকদের স্বাধীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
এমন অবস্থায় গ্র্যান্ড বাজার কার্যত অচল হয়ে পড়ে। আমদানি–নির্ভর বাজারে ডলার ছাড়া ব্যবসা অসম্ভব। রিয়ালের মানের পতনের কারণে আমদানি করা পণ্যের দুষ্প্রাপ্যতা দেখা চরমে পৌঁছায়। কাপড়, যন্ত্রাংশ, ওষুধ, ইলেকট্রনিকস–সহ সবকিছুর দাম কয়েক দিনের মধ্যে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের বাজারে এর সবচেয়ে প্রকট প্রভাব দেখা যাচ্ছে।
এরই ধারাবাহিকতায় ইরানের বাজারে ভোজ্যতেলের তীব্র সংকট চলছে। আমিষের প্রধান চাহিদা হিসেবে পরিচিত মুরগির মাংসের দাম এতটাই বেড়েছে যে তা খাদ্যতালিকায় রাখা কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছোটখাটো অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খরচ চালাতে না পেরে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
এমন পরিস্থিতিতে বাজারি ও অর্থনৈতিকভাবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত সাধারণ মানুষের মধ্যে একধরনের ঐক্য স্থাপিত হয়েছে। ‘বেঁচে থাকার লড়াই’ বা ‘রায়ট ফর সারভাইভাল’ নামে তাদের এ জোটবদ্ধ আন্দোলন শুরু হলেও দ্রুত তা রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয় এবং ৩১ প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে।
যখন মানুষ তাদের নিজ পরিবারকে খাওয়াতে ব্যর্থ হয়, তখন রাষ্ট্রের নিরাপত্তাবাহিনীর প্রতি তাদের ভয় কমতে থাকে। এ কারণে এই ক্ষুধার অর্থনীতির মধ্যে ইরানের জনগণকে রুখে দেওয়া ২০২২ সালের হিজাব আন্দোলনের চেয়ে কঠিন হবে।
ইরানের নিরাপত্তাবাহিনীও এই সংকটের বাইরে নয়। ইরানের মুদ্রার মানের পতনের কারণে বাসিজ ও আধা সামরিক বাহিনীর জন্য তাদের বেতন কার্যত মূল্যহীন হয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, নিরাপত্তাবাহিনীকে আর্থিক নিরাপত্তা দিতে না পারলে শাসনব্যবস্থায় ফাটল ধরতে বাধ্য।
ইরানের নেতৃত্বের সংকট
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বয়স ৮৬। তিনি প্রায় ৩৫ ধরে ক্ষমতায় আছেন। সবশেষ ২০২৫ সালের জুনে ইরান ও ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধের সময় তাঁর অনুপস্থিতি ইরানকে রাজনৈতিক নেতৃত্বশূন্যতায় ভুগিয়েছে। এই যুদ্ধে খামেনির শীর্ষস্থানীয় অনেক কর্মকর্তার নিহত হওয়ার ঘটনা তাঁর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষগুলো এখন খামেনির মৃত্যুর মুহূর্তের অপেক্ষায় রয়েছে।
সাধারণ জনগণের কাছে এসব বিষয় অজানা নয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরান এখন পদ্ধতিগত এক পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করছে। তাঁদের ধারণা, এমন পরিস্থিতিতে উলামা–শাসিত ইসলামি শাসনব্যবস্থা থেকে কট্টর জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে দেশটি। এ ধরনের রাষ্ট্রে নিয়ন্ত্রণ থাকবে মূলত নিরাপত্তা কাঠামোর হাতে।
ইরান ধর্মীয় বাতাবরণ থেকে ক্রমেই জাতীয়তাবাদী সামরিক রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো আলি আলফনেহ ‘ইরান আনভেইলড: হাউ দ্য রেভোল্যুশনারি গার্ডস ইজ ট্রান্সফর্মিং ইরান ফ্রম থিওক্রেসি টু মিলিটারি ডিক্টেটরশিপ’ গ্রন্থে বিষয়টি ব্যাখা করেছেন। তাঁর মতে, আইআরজিসি বর্তমানে দেশের অর্ধেক অর্থনীতির অধিকর্তা। ফলে সংসদ ও প্রশাসনিক পদগুলোয় তাদের প্রভাব বাড়ছে। ক্ষমতার এমন বিশেষ কাঠামোকে বিশেষজ্ঞরা ‘সিকিরিউটারাইজড স্টেট’ বা সামরিকীকৃত রাষ্ট্র বলে অভিহিত করেন।
গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কার্নেগি এনডাউটমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের সিনিয়র ফেলো করিম সাজ্জাদপুরের ‘অটাম অব দ্য আয়াতুল্লাহ্জ’ শীর্ষক প্রবন্ধ অনুযায়ী, খামেনির পর ইরানে আর কোনো প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা নেই। এ শূন্যতার সুযোগে আইআরজিসি শক্তিশালী পক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। এমন অবস্থায় তারা সরাসরি ক্ষমতায় না বসে কোনো দুর্বল নেতাকে ক্ষমতায় বসিয়ে পেছন থেকে কলকাঠি নাড়তে পারে। খামেনিও ইরানের প্রিটোরিয়ান স্টেট বা সামরিক রাষ্ট্র হওয়ার সম্ভাবনার পক্ষে মত দিয়েছেন। খামেনির পরবর্তী শাসকেরা ধর্মীয় কড়াকড়ির চেয়ে পারস্য জাতীয়বাদকে বেশি গুরুত্ব দেবেন বলে মনে করেন তিনি।
নারী, জীবন ও স্বাধীনতা
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ইরানের নীতি পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর ২২ বছর বয়সী মাসা আমিনির মৃত্যু ঘটে। এ ঘটনায় ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর মাধ্যমে ইরানে ব্যাপক সামাজিক রূপান্তরেরও সূত্রপাত ঘটে।
প্রথম দিকে নারী অধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতার জন্য হলেও দ্রুত তা ইরানের সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জাতীয় ন্যায্যতার আন্দোলনে রূপ নেয়। সব বয়স ও শ্রেণির মানুষেরা নারীদের সঙ্গে যুক্ত হন। তেহরান থেকে ইরানের বিভিন্ন শহরে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাস্তায় রাস্তায় বিক্ষোভ হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা প্রকাশ্যে বিক্ষোভকারীদের সমর্থন দেয়। বাইডেন প্রশাসন ইন্টারনেট পরিষেবা প্রসারিত করার উদ্যোগ নেয়। কংগ্রেসে মাসা আমিনি হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাকাউন্টিবিলিটি অ্যাক্ট পাস করা হয়। ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব ও সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সরকারি দমন–পীড়নের জবাবদিহি স্থাপনের স্বার্থে এ আইন পাস করা হয়। এ আইনের মাধ্যমে পরবর্তীকালে ইরানের কিছু নেতার বিরুদ্ধে ভিসা ও সম্পত্তিসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
জাতিসংঘের তদন্ত অনুযায়ী ইরানের নিরাপত্তাবাহিনী দমন–পীড়নের সময় পাঁচ শতাধিক মানুষকে হত্যা করে এবং প্রায় ২০ হাজার মানুষকে আটক করা হয়। শেষ পর্যন্ত মাসব্যাপী চলা সহিংসতা, ভীতি ও ক্লান্তির মাধ্যমে এ বিক্ষোভকে দমন করা হয়।
ট্রাম্পের হুমকি ও ‘ভেনেজুয়েলা মডেল’
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে আন্দোলনকারীদের ওপর সহিংস দমন-পীড়ন চালানো হলে ওয়াশিংটন দেশটিতে সামরিক হস্তক্ষেপ করতে পারে বলে বারবার হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিভিন্ন সূত্রের খবর, কাতারে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটির কিছু কর্মীকে সন্ধ্যার মধ্যে ঘাঁটি ছাড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলা এবং এর জবাবে দেশটির পাল্টা আঘাতের আশঙ্কা আরও তীব্র হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার ডেকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার রাজনীতি বিষয়ের অধ্যাপক শাহরাম আকবরজাদেহের মতে, ট্রাম্প এমন সংক্ষিপ্ত ও ক্ষিপ্র অভিযান পছন্দ করেন, যেখানে মার্কিন সেনাদের ঝুঁকি ন্যূনতম পর্যায়ে থাকে।
গত বছরের জুন মাসে ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের ১২ দিনের যুদ্ধ চলাকালে ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে ইঙ্গিত করে ট্রাম্প লিখেছিলেন, ‘তথাকথিত “সর্বোচ্চ নেতা” কোথায় লুকিয়ে আছেন, তা আমরা ঠিকঠাক জানি।’
৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে বন্দী করার ঘটনার পর তেহরানের নীতিনির্ধারকেরাও এই আশঙ্কায় ভুগছেন যে ইরানেরও এমন অভিযান চালানো হতে পারে। তবে অধ্যাপক আকবরজাদেহ মনে করেন, ভেনেজুয়েলার মতো ইরানে অভিযান চালানোর বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বেশ কঠিন হবে। কেননা এমন অভিযান চালাতে হলে মার্কিন হেলিকপ্টারগুলোকে অনেক বেশি দূরত্ব পাড়ি দিতে হবে।
এ ছাড়া ইরানে স্থল অভিযানের সম্ভাবনাও নাকচ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এটি ব্যয়বহুলও বটে। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভালি নাসের আল-জাজিরাকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে শিক্ষা নিয়ে ট্রাম্প নেশন বিল্ডিং বা দেশ গঠনের মতো প্রকল্প থেকে সরে এসেছেন। তিনি এখন ইরানি শাসনব্যবস্থার শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের সরিয়ে দিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর লক্ষ্য হবে, নতুন একটি পক্ষকে ইরানের ক্ষমতায় বসানো যারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে বাধ্য হবে।
ভালি নাসের মনে করেন, ট্রাম্প এমনভাবে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চান যেন পারমাণবিক অস্ত্রের ইস্যুতে ওয়াশিংটনের দেওয়া কঠোর বার্তা বা শর্ত ইরান মেনে নেয়।
অর্থনৈতিক চাপ ও অবরোধ
সামরিক এসব বিকল্পের পাশাপাশি ট্রাম্পের হাতে অর্থনৈতিক অস্ত্রেরও মজুত রয়েছে। বর্তমানে ইরান দৈনিক ২০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করলেও ট্রাম্প প্রশাসন একে শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে মনোযোগী হয়েছে। ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকা যেকোনো দেশের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক বসানোর ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
অর্থনৈতিক তথ্যভান্ডার ট্রেডিং ইকোনমিকস জানিয়েছে, ইরানের প্রধান বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকা দেশগুলো হলো চীন, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরাক।
এ ছাড়া মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শক্তিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে ইরানের যোগাযোগবিচ্ছিন্নতা কাটাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। এতে ইরানের চলমান আন্দোলনের পালে হাওয়া লাগবে।
আর্তেশ বনাম আইআরজিসি
ইরানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মূলত দুটি অংশে বিভক্ত। একটি হলো আর্তেশ বা নিয়মিত সেনাবাহিনী এবং অন্যটি হলো আইআরজিসি বা রেভোল্যুশোরি গার্ড। সেনাবাহিনী দেশের সীমান্ত রক্ষা এবং আইআরজিসি ইসলামি শাসন ও আদর্শ রক্ষায় কাজ করে।
এর আগে ইরানের সেনাবাহিনী মূলত দেশের সীমান্ত রক্ষা নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে খুব একটা জড়াত না। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তারাও সরকারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। বিবৃতিতে তারা স্পষ্ট করেছে যে কৌশলগত অবকাঠামো রক্ষায় তারা বদ্ধপরিকর। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলাকে তারা অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে দেখছে এবং এ কারণেই মাঠে নেমেছে।
ইরানে অভ্যন্তরীণ দমনের প্রধান হাতিয়ার হলো আইআরজিসির অধীনস্থ বাসিজ মিলিশিয়া। গত জুনের ইসরায়েলি হামলায় বাসিজের বেশ কিছু সদর দপ্তর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা মারাত্মভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে বিক্ষোভ দমনে মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে গণ্য হওয়া বাসিজ এখন বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি দিলেও মুদ্রাস্ফীতির কারণে নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যদের বেতনও এখন আর সংসার চালানোর জন্য পর্যাপ্ত নয়। এ পরিস্থিতিতে আর্তেশ শুধু সীমান্ত রক্ষা করবে নাকি আইআরজিসির মতো বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালাবে? এই অমীমাংসিত প্রশ্ন এখন ইরানের ক্ষমতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
ইরানের সামনে কোন পথ খোলা
ইরানে বিক্ষোভের সময় সহিংসতায় নিহত মানুষের সংখ্যা বেড়ে আড়াই হাজার ছাড়িয়েছে। বিক্ষোভের মাত্রা কিছুটা কমে এসেছে। গত মঙ্গলবার এরফান সোলতানি নামের এক তরুণ বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কথা ছিল বলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আরব স্টেটস ইনস্টিটিউটের ফেলো আলি আলফনেহ আল-জাজিরাকে বলেছেন, এমন অবস্থায় তেহরানের সামনে দুটি পথ খোলা আছে। প্রথমত, ভেনেজুয়েলার মতো সমঝোতা করা। অর্থাৎ ট্রাম্পের সঙ্গে এমন এক দফারফায় আসা যেন মূল নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটে কিন্তু শাসনের মূল কাঠামোগুলো ঠিক থাকে। দ্বিতীয়ত, চূড়ান্ত পতন। অর্থাৎ সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে অর্থনৈতিক ধস, গণবিক্ষোভ ও নিরাপত্তাবাহিনীর মধ্যে ভাঙনের ফলে পুরো শাসনব্যবস্থার পতন।
ইরানের এবারের বিক্ষোভের ফল হিসেবে অতি দ্রুত শাসনব্যবস্থার পতন না–ও ঘটতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি দেখে এটুকু বলা যায়, শীর্ষ নেতৃত্বের বার্ধক্য, অভিজাত শ্রেণির মতবিরোধ, দীর্ঘস্থায়ী শাসন ও দমননীতি থেকে উদ্ভূত সামাজিক ক্লান্তি, তরুণ প্রজন্মের কাছে ইসলামের রাজনীতিকরণসংক্রান্ত মতাদর্শের বৈধতা খোয়া যাওয়া এবং অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব ইরানকে আজ এ জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, আল-জাজিরা, সিএনএন, লে মোঁদ, টাইম, নিউইয়র্ক টাইমস
* এস এম জারিফ, প্রথম আলোর সহসম্পাদক
![]() |
| এবারের আন্দোলনে ইরানের শাসনব্যবস্থার গভীরে কিছু একটা নড়ে উঠেছে। ছবি: রয়টার্স |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
-
▼
2026
(1280)
-
▼
January
(307)
-
▼
Jan 19
(9)
- দুবাইয়ের ব্লু ভিসা বনাম গোল্ডেন ভিসা: ১০ বছরের ভবি...
- ইরান আন্দোলন ২০২৬: কেন আলাদা ও ব্যাপক? by এস এম জারিফ
- হাততালির রাজনীতিতে ভালো কথার জায়গা নেই by মহিউদ্দি...
- ইরানে আন্দোলন নিয়ে বামপন্থীরা নীরব কেন by ইয়াশা মা...
- খাদের কিনারায় ইরান, ঘুরবে নাকি পতন: বিক্ষোভে নিহত ...
- পোস্টাল ব্যালট নিয়ে বিতর্ক যেসব ঝুঁকি তৈরি করছে by...
- প্রতীকী সাফল্যের গল্প দিয়ে নয়, বরং টেকসই জাতীয় উন্...
- যে কারণে নতুন বন্ধু খুঁজছেন জার্মান চ্যান্সেলর by ...
- সুন্দরবনে ১০০ কেজি হরিণের মাংস ও ৪ হাজার মিটার ফাঁ...
-
▼
Jan 19
(9)
-
▼
January
(307)
- ► 2025 (3280)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...

No comments:
Post a Comment