নির্মল সেন সাংবাদিকতায় এক নক্ষত্রের পতন- শ্রদ্ধাঞ্জলি by ইজাজ আহমেদ মিলন

গত দুই সপ্তাহ ধরে বেশ উদ্বিগ্ন ছিলাম। কখন যেন কোন অবস্থায় দুঃসংবাদটি শুনতে হবে। কারণ কোটালীপাড়ার দীঘিরপাড় গ্রাম থেকে তিনি যে অসুখের বোঝা কাঁধে নিয়ে যে অবস্থায় ঢাকার ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, সে অবস্থা থেকে মানুষ ফিরে আসে না।
আমার বন্ধুবর রফিকুল ইসলাম রাসেল দুঃসংবাদটি দিল আমাকে। প্রবল এক অভিমান নিয়ে অবশেষে নির্মল সেন চলেই গেলেন। স্বাধীনচেতা, মুক্তচিন্তার আজীবন লড়াকু সৈনিক, বাম রাজনীতির অগ্রপথিক, বরেণ্য সাংবাদিক, কলামিস্ট নির্মল দার জন্য শোকে স্তব্ধ হয়ে যাই কিছুক্ষণের জন্য। জীবনের প্রায় পুরো অংশই তিনি বিনিয়োগ করেছেন মানুষের জন্য, এ দেশের জন্য। সাংবাদিকতার পথিকৃৎ নির্মলদা মানুষের ভালবাসা আর শ্রদ্ধা পেলেও এদেশ তাঁকে তাঁর যোগ্য সম্মানটুকু দিতে ব্যর্থ হয়েছে। দেশের সর্বোচ্চ সম্মানজনক একুশে পদক জোটেনি তার ভাগ্যে। জীবিত অবস্থায় এ সম্মান না পাওয়ার অপমানেই হয়ত তিনি বলে গেছেন (স্বজনদের কাছে) ‘মৃত্যুর পর তাকে কোন পদক প্রদান করা হলে পরিবারের পক্ষ থেকে তা যেন কেউ গ্রহণ না করে।’ কী অভিমান তাঁর বুকের ভেতর জিইয়ে রেখেছিলেন। গত ৩৭ বছরে এ দেশের প্রায় সাড়ে তিনশ’ কবি, সাহিত্যিক, চিত্রশিল্পী, গবেষক, চিকিৎসককে এ পদক দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ৪৯ সাংবাদিককেই দেয়া হয়েছে একুশে পদক। কিন্তু আমাদের নির্মলদার ভাগ্যে জোটেনি পদকটি। বাংলাদেশে সাংবাদিকতার এই প্রবাদ পুরুষ খুব ছোটবেলা থেকেই লেখালেখি শুরু করেন। তবে সাংবাদিক হওয়ার কোন শখ ছিল না তাঁর। তিনি নিজেই লিখেছেন, ‘সাংবাদিক হওয়ার কথা ছিল না। কি হবার কথা ছিল, তাও এখন আর মনে পড়ে না। তবে ছোটবেলা থেকে একটা কিছু হবার আকাক্সক্ষা ছিল। আকাক্সক্ষা পূরণের উদ্যোগ ছিল না কোনদিন।’ যদিও তার আকাক্সক্ষা পূরণের উদ্যোগ ছিল না, কিন্তু নিজের দক্ষতা, যোগ্যতা আর সততার গুণে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন নিজেকে। নির্মল সেন বাংলাদেশের একটি প্রতিষ্ঠানের নাম। তাঁর চলে যাওয়া মানে বাংলাদেশের আকাশ থেকে একটি উজ্জ্বল নক্ষের পতন হলো।
তাঁর কাছে এদেশের মানুষ বাঁচার ভরসা পেতেন। অনেকেই নির্ভর করতেন তাঁর ওপর। একটি আদর্শের নাম নির্মলদা। লেখালেখিতে ছেদ ঘটতে পারে কিংবা মানবসেবায় ঘটতে পারে বিঘœÑএই ভাবনা থেকেই হয়ত তিনি সংসার গড়েননি। চিরকুমার থেকেই চিরবিদায় নিলেন। ২০১২ সালের ৭ সেপ্টেম্বর দেশের বেশিরভাগ পত্রিকারই একটি খবর ছিল ‘সাংবাদিক নির্মল সেন মহিলা কলেজের জন্য দেড় একর জমি দান করলেন।’ নির্মল সেনের অন্তিম ইচ্ছা ছিল তিনি কোটালীপাড়ায় একটি মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করবেন। কলেজ হয়তো প্রতিষ্ঠিত হবে, কিন্তু নির্মলদা সেটা দেখে যেতে পারলেন না। নির্মল সেনকে বঙ্গবন্ধুও খুব পছন্দ করতেন, ভাল জানতেন। তাঁর স্পষ্টবাদিতা, স্বচ্ছতা আর সততা বঙ্গবন্ধু পছন্দ করতেন। স্পষ্টবাদী নির্মলদা ১৯৯৭ সালের মাঝামাঝি দৈনিক জনকণ্ঠে একটি কলাম লিখেছিলেন। শিরোনাম ছিল এ রকম ‘প্রধানমন্ত্রী, কোটালীপাড়ার ওসিকে থামান’। এ রকম স্পষ্ট করে ক’জন কথা বলতে পারেন। নির্মলদা পারতেন।
নির্মল সেন জন্মেছিলেন গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার দীঘিরপাড় গ্রামে। তবে তাঁর জন্ম তারিখ কবে সেটা তিনি নিজেই জানতেন না। অকপটে নির্মল সেন বলেছেনও সে কথা। তিনি লিখেছেন, ‘...আমার জন্ম তারিখ আমি নিজেই জানি না।...তবুও আমার একটা জন্ম তারিখ আছে। পাসপোর্টে লিখতে হয় বলে। সে জন্ম তারিখ ১৯৩০ সালের ৩ আগস্ট। জীবনে মিথ্যে না বলার চেষ্টা করি। আর একটা মিথ্যা জন্ম তারিখ প্রতিনিয়ত আমাকে ব্যঙ্গ করে।’ সে মোতাবেক তিনি পৃথিবীতে বেঁেচ ছিলেন ৮২ বছর। নির্মল সেনের প্রতি রইল আমাদের অশেষ শ্রদ্ধা।

kobiizazahmed@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.