জাপানে ভূমিকম্প-আমরা শোকাহত, বেদনাবিদ্ধ

 জাপানের রাজধানী টোকিও থেকে ২৩০ কিলোমিটার দূরে সমুদ্রের ১৭ মাইল গভীরে ৮.৯ মাত্রার ভূমিকম্প শুধু জাপান নয়_ আক্ষরিক অর্থেই প্রকম্পিত করল প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলোকে।
আর এই ভূকম্পনের ফলে সৃষ্ট জলকম্পন ৩০ থেকে ৩৩ ফুট উচ্চতার ঢেউ তৈরি করে আছড়ে পড়ল জাপানের উত্তর-পূর্ব উপকূলে। মুহূর্তের মধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল সমুদ্রতীরবর্তী ২১০০ কিলোমিটার এলাকার জনবসতি, বিমানবন্দর, ক্ষেত-খামার। জাপানের ইতিহাসে এ যাবৎ নথিভুক্ত সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প এবং ভূমিকম্পের প্রতিক্রিয়া হিসেবে সৃষ্ট জলকম্প বা সুনামিতে নিহতের সংখ্যা এক হাজার অতিক্রম করেছে। সময় যতই যাচ্ছে সংখ্যা ততই বাড়ছে। স্মরণকালের ভয়াবহতম এ ভূমিকম্পে জাপানের উত্তর-পূর্ব উপকূলের নিকটবর্তী শহরগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জাপান এমনিতেই ভূকম্পনপ্রবণ দেশ। জাপানিরা ছোটখাটো এমনকি বড় ভূমিকম্পও সামাল দেওয়ার মতো প্রস্তুতি সবসময় অবলম্বন করে। তাদের নগর-ব্যবস্থাপনা, ভবন কাঠামো এমনকি গৃহের সামগ্রীও ভূমিকম্প সামাল দেওয়ার মতো করে প্রস্তুত হয়। এমন একটি প্রস্তুত অবস্থায় টোকিওসহ শহরগুলোতে যে বিপুল ক্ষতি হয়েছে তা অকল্পনীয়। টোকিওসহ বহু শহরে নগরজীবন বিঘি্নত হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ যোগাযোগ-বিচ্ছিন্ন, আটকেপড়া অবস্থান থেকে বাড়ি ফিরতে পারছে না অনেকেই। ভূমিকম্পের ক্ষতিকে আরও বড় করে তুলেছে আফটার শক বা ভূমিকম্পের প্রতিক্রিয়া। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে যে জলকম্প বা সুনামি তৈরি হয়েছে তা কীভাবে জনপদগুলোকে ভাসিয়ে নিয়ে প্রলয়ঙ্করী তাণ্ডব চালিয়েছে শুক্রবার পুরো পৃথিবী তা প্রত্যক্ষ করে বেদনায় বিহ্বল হয়েছে। ২০০৪-এর সুনামির পর এই বৃহৎ সুনামিতে আবারও সমুদ্রের জলরাশি প্রচণ্ড বেগে বিপুল উচ্চতার ঘরবাড়ি, গাড়ি, জলযান, বিমানসহ শহরে ঢুকে পড়েছে আচানক। এই স্রোতের মুখে পড়া স্থাপনা ভেঙে চুরমার হয়েছে। লোকালয় ধ্বংস হয়ে গেছে। তাৎক্ষণিক এ ঘটনার পর দেখা গেছে আরও দুর্ভোগ। একটি তেল শোধনাগারে অগি্নকাণ্ড ঘটেছে। দাউদাউ করে জ্বলে ওঠা আরও অনেক অগি্নকাণ্ড মানুষকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলেছে। আফটার শক সবচেয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে জাপানের পারমাণবিক চুলি্লগুলোর ক্ষেত্রে। ইতিমধ্যে খবর মিলেছে, ফুকুশিমা পারমাণবিক চুলি্লতে বিস্ফোরণ ঘটেছে। পারমাণবিক চুলি্লটির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য পানি সরবরাহ ভূমিকম্পের কারণে ব্যাহত হওয়ায় সেটির তাপমাত্রা বেড়ে গেছে। তেজস্ক্রিয়তা চুলি্লর বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, চেরনোবিল বিস্ফোরণের মতো বিপর্যয় সেখানে ঘটতে পারে। ইতিমধ্যে আশপাশের ৬ কিলোমিটার ব্যাসে অবস্থানকারীদের সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ বিস্ফোরণ দীর্ঘমেয়াদে যে বিপুল ক্ষতিসাধন করবে তা ভেবে পুরো বিশ্ব সচকিত হয়ে আছে। যে বিপুল ক্ষতি, প্রাণহানি, অর্থ-সম্পদহানির শিকার হলো জাপান, সোজা কথায় একে মহাদুর্যোগ বলে অভিহিত করতে হবে। বিশ্বের বড় অর্থনীতি জাপানের এ দুর্যোগে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর বিশেষ প্রভাব পড়বে। আমাদের কাছের দেশ বলেই শুধু নয়, আমাদের অর্থনীতিতে জাপানের অংশীদারিত্বের কারণেও জাপান আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র। তাদের অর্থনৈতিক ক্ষতি স্বাভাবিকভাবে আমাদের জন্যও ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এখন জাপানকে অনেক কিছুই নতুন করে শুরু করতে হবে। ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম চলছে, টোকিওসহ শহরগুলোকে সচল করতে হবে_ সবচেয়ে বড় কথা সুনামি আক্রান্ত অঞ্চলগুলোকে ঠিক করতে অনেক সময় লাগবে। আর পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তা সামাল দিতে তাদের অনেক কষ্ট সইতে হবে। ইতিমধ্যে বিশ্বের নানা জাতির পক্ষ থেকে জাপানিদের প্রতি সমবেদনা ও শোক প্রকাশ করা হয়েছে। বিভিন্ন জাতির নেতারা তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। আমরাও জাপানের এ দুর্যোগে তাদের প্রতি শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করছি। জাপানিরা কষ্টসহিষ্ণু ও সংগ্রামী জাতি। শুধু প্রাকৃতিক ভূমিকম্পই নয়, হিরোশিমা-নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমার হামলা পর্যন্ত সয়ে তারা উঠে দাঁড়িয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা অতিক্রম করে তারা উন্নত একটি জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা আশা করি, এবারের ক্ষতি পুষিয়ে তারা শিগগিরই উঠে দাঁড়াক। সূর্যোদয়ের দেশে আবারও আশার সূর্য উঠুক।
 

No comments

Powered by Blogger.