বাল্যবিয়ে বন্ধ করতেই হবে by সাকিলা মতিন মৃদুলা

'মা কেঁদে কয়, মঞ্জুলী মোর ওই তো কচি মেয়ে
ওরই সঙ্গে বিয়ে দেবে, বয়সে ওর চেয়ে
পাঁচগুণ সে বড়ো_


তাকে দেখে বাছা আমার ভয়েই জড়সড়
এমন বিয়ে ঘটতে দেব নাকো ।'

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'নিষ্কৃতি' কবিতার মা পারেননি ছোট্ট মঞ্জুলীর বিয়ে বন্ধ করতে। কোনোভাবেই বন্ধ হচ্ছে না কিংবা বন্ধ করা যাচ্ছে না। অথচ বন্ধ করার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে প্রতিনিয়ত। সময়ের দাবিতে বিভিন্ন সময়ে পাল্টেছে সমাধানের কৌশল। কিন্তু কোনোভাবেই কৌশলে আসছে না স্থায়ী সমাধান। পাল্টাচ্ছে না পরিস্থিতি। বরং কখনও কখনও সমস্যা শেকড় গেড়ে বসতে চাইছে। অলিখিতভাবেই লিখিত স্বীকৃতি কেড়ে নিচ্ছে বাল্যবিয়ে নামের ঘুণপোকা। নিঃশব্দে কেটে যাচ্ছে। বিস্তার করে যাচ্ছে তার বিস্তৃতি। কেশবচন্দ্র সেন (১৮৩৮-১৮৮৪) ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের (১৮২০-১৮৯১) প্রচেষ্টায় ১৮৭২ সালে 'ব্রাহ্ম ম্যারেজ অ্যাক্ট' প্রণীত হয়। এই আইনে বিয়ের সর্বনিম্ন বয়স মেয়েদের ক্ষেত্রে ১৪ এবং ছেলেদের ক্ষেত্রে ১৮ করা হয়। এই আইন সেই সময়ে তেমনভাবে বাস্তবায়িত না হলেও ধীরে ধীরে বাল্যবিয়েবিরোধী আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক বাজেয়াাপ্ত ইসমাইল হোসেন শিরাজীর কাব্যগ্রন্থ অনলপ্রবাহের অন্যতম একটি দাবি ছিল 'বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে হবে'। কিন্তু বন্ধ হচ্ছে কই?
কেন বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে হবে?
১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ছোট্ট এই দেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনঘনত্ব এক হাজার দু'শর কাছাকাছি। লাগামহীন জনসংখ্যা বিস্ফোরণের অন্যতম কারণ 'বাল্যবিয়ে'। কেননা বাল্যবিয়েকালীন পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি এবং সন্তান গ্রহণ এমনকি বিয়ে সম্পর্কেই কোনো ধারণা থাকে না। আর তাই জনসংখ্যা বৃদ্ধির হাত থেকে বাংলাদেশকে বাঁচাতে হলে বাল্যবিয়ে বন্ধ করতেই হবে। বাল্যবিয়ের ফলে ছেলে এবং মেয়ে উভয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মেয়েদের ক্ষেত্রে এর ভয়াবহতা অনেক বেশি। কারণ, অপরিণত বয়সে সন্তান ধারণ করে মেয়েরাই মৃত্যুঝুঁকিতে পড়ে। নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হতে শেখার আগেই শিশুর দায়িত্ব নিতে হয় তাকে। অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ার কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় এবং পর্যায়ক্রমে অর্থনৈতিক, পারিবারিক এবং সামাজিকভাবে তারাই বৈষম্যের শিকার হয় বেশি। ইউনিসেফে ঞযব ঝঃধঃব ড়ভ ডড়ৎষফ্থং ঈযরষফৎবহ ২০১১-এর তথ্য অনুযায়ী, ১০ জনের মধ্যে ৩ জন মেয়ের ১৫ বছরের কম বয়সে বিয়ে হয় এবং ৩ জনের মধ্যে ২ জনেরই বিয়ে হয় ১৮ বছরের আগেই। মেয়েদের শরীর এই বয়সে গর্ভধারণ এবং সন্তান জন্মদানের জন্য প্রস্তুত থাকে না। ফলে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়; যেমন_ অবস্টেরিক ফিস্টুলা। 'প্রোগ্রেস ফর চিলড্রেন অ্যাচিভিং দি এমডিজিস উইথ ইকুইটি (ইউনিসেফ ২০১০)' অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৮ বছর বয়সের আগে ৬৬ শতাংশ মেয়ে এবং একই বয়সের পাঁচ শতাংশ ছেলের বিয়ে হচ্ছে। বাল্যবিবাহের কারণে স্বল্প ওজন ও মারাত্মক অপুষ্টি নিয়ে শিশুর জন্ম হয়, মায়েরও স্বাস্থ্যহানি ঘটে। কখনও কখনও মৃত্যুও হয়। যদিও ৯ বছরে দেশে মাতৃমৃত্যুর হার ৪০ শতাংশ কমেছে। মাতৃমৃত্যুর হার আগের চেয়ে কমলেও এখনও নিশ্চিত হয়নি নিরাপদ মাতৃত্ব। বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর হার এখনও বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি। জরায়ু ছিঁড়ে যাওয়া এবং জরায়ুতে ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা অল্প বয়সে বিয়ে এবং মা হওয়ার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। অন্যদিকে সন্তান লালনপালন-সংক্রান্ত বিষয়ে অপরিপকস্ফতায় সন্তান মায়ের সঠিক পরিচর্যা থেকে বঞ্চিত হয়। বাল্যবিয়ে শিক্ষার অধিকার থেকেও বঞ্চিত করে। বাল্যবিয়ের কবলে পড়া মেয়েকে পারিবারিক নির্যাতনের দুর্ভোগও পোহাতে হয় অনেক।
কেন বন্ধ হচ্ছে না বাল্যবিবাহ?
দরিদ্রতা বাল্যবিয়ের অন্যতম প্রধান কারণ। কন্যাসন্তানের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতাও কারণ হিসেবে সমানভাবে প্রযোজ্য। ধর্ষণ, খুন, এসিড নিক্ষেপের মতো বর্বর কায়দায় নারী নির্যাতনের কারণে অভিভাবকরা মেয়েদের বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। অন্যদিকে দরিদ্র পরিবারে মেয়ের বিয়ে না হওয়া মানেই তার জন্য খরচের চিন্তা। আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে না তোলার কারণে মেয়েদের সংসারে বোঝা মনে করা হয়। যৌতুক সংস্কৃতিতে মেয়েদের বয়স বেড়ে গেলে যৌতুকের অঙ্কের পরিমাণও বেড়ে যায়। আর তাই কম বয়সে বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা থেকেই যাচ্ছে। এভাবেই বাড়ছে বাল্যবিয়ে। বাল্যবিয়ে নিরোধে আইনগত নানা জটিলতার কারণেও বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। বয়স নিশ্চিত হওয়ার অনিশ্চয়তার কারণেও বন্ধ হচ্ছে না বাল্যবিয়ে।
আজ না হয় কাল, কাল না হয় পরশু
প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন এবং এর বাস্তবায়ন। এ ক্ষেত্রে নিশ্চিত জন্মসনদেরও কোনো বিকল্প নেই। যে জন্মসনদ অধিকারীর সঠিক এবং সত্য বয়স নিশ্চিত করবে, সেটাই নিশ্চিত জন্মসনদ। শুরু থেকেই স্টেপস টুওয়ার্ডস ডেভেলপমেন্টসহ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা বাল্যবিয়ে বন্ধে সঠিক জন্মসনদের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে। বেসরকারি সংস্থা, সচেতন নাগরিক এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তার উদ্যোগে কখনও কখনও অন্ধকারে জোনাক জ্বললেও সংখ্যায় তা অতি নগণ্য। শাস্তির বিধান সত্ত্বেও মিথ্যা তথ্যে জন্মনিবন্ধন হচ্ছেই। এ ক্ষেত্রে ২০১৩ সালের ভেতরে সবার জন্মনিবন্ধন অনলাইন হলে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার সুযোগ কমে যাবে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফ জন্মনিবন্ধনের নিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে জন্মসনদের সত্যতার লক্ষ্যে সরকারের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। স্টেপস টুওয়ার্ডস ডেভেলপমেন্ট এবং স্থানীয় পর্যায়ের ১২২টি সংগঠন নিয়ে গঠিত গ্যাড অ্যালায়েন্স তাদের কর্ম এলাকার বিয়ে রেজিস্ট্রারদের উত্থাপিত দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিয়ে রেজিস্ট্রেশন ফরমে জন্মসনদ কিংবা জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর যুক্ত করার জন্য নীতিনির্ধারক পর্যায়ে এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছে। এতে একদিকে জাল সনদ দেখিয়ে বিয়ে করার সুযোগ কমে যাবে, অন্যদিকে আইনগতভাবে বাল্যবিয়ে নিশ্চিত হওয়ার প্রচেষ্টা সফল হবে। প্ল্যান বাংলাদেশ 'বিকজ আই অ্যাম এ গার্ল' স্লোগানে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে। একইভাবে সাধ্য এবং সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করে যাচ্ছে প্রতিটি সচেতন নাগরিক। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাল্যবিয়ে পুরোপুরি বন্ধ না হলেও কমে যাবে সংখ্যায়_ আজ না হয় কাল, কাল না হয় পরশু। হ
 

No comments

Powered by Blogger.