জেলা কোটায় কর্মী যাবে মালয়েশিয়ায় by শরিফুল হাসান

জনসংখ্যার ভিত্তিতে সারা দেশ থেকে কর্মী পাঠানো হবে মালয়েশিয়ায়। এর জন্য সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য জেলা কোটা অনুসরণ করা হবে। এতে দেশের সব জেলার আগ্রহী ব্যক্তিরা সমভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার সুযোগ পাবেন। মালয়েশিয়ায় সরকারিভাবে কর্মী পাঠানোর বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন।


তবে যে পাঁচটি খাতে মালয়েশিয়া কর্মী নেবে, সেসব খাতে কর্মীর প্রাথমিক যোগ্যতাকে বিশেষভাবে বিবেচনা করা হবে।
বাংলাদেশের অন্যতম শ্রমবাজার মালয়েশিয়ায় চার বছর ধরে জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ আছে। দীর্ঘ কূটনৈতিক যোগাযোগের পর এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে যাচ্ছে মালয়েশিয়া। এ ব্যাপারে ২৬ নভেম্বর দুই দেশের মধ্যে তিনটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হবে। আগামী বছরের শুরুতে কর্মী যাওয়া শুরু হবে বলে আশা করছে সরকার। সে লক্ষ্যে কোন প্রক্রিয়ায় কর্মী যাবেন, কীভাবে নিবন্ধন হবে, কত খরচ পড়বে—এসব বিষয় মোটামুটি চূড়ান্ত করা হয়েছে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব জাফর আহমেদ খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ বাজারটি যেন ঠিকমতো ধরে রাখা যায়, সে জন্য সর্বোচ্চ সতর্ক আছে সরকার।’
পাঁচ খাতে কর্মী যাবেন: মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বৃক্ষায়ণ (প্লান্টেশন), কৃষি (এগ্রিকালচার), উৎপাদন (ম্যানুফ্যাকচারিং), নির্মাণ ও সেবা (সার্ভিস)—এই পাঁচটি খাতে বাংলাদেশ থেকে প্রাথমিকভাবে লোক নেবে মালয়েশিয়া। তবে শুরু হবে বৃক্ষায়ণ খাতের মাধ্যমে। পরবর্তী সময়ে মৎস্য আহরণ কিংবা অন্য কোনো খাতেও কর্মী নেওয়া হতে পারে।
জেলা কোটা: বিএমইটির মহাপরিচালক বেগম শামসুন্নাহার প্রথম আলোকে বলেন, আদমশুমারি অনুযায়ী যে জেলায় জনসংখ্যা যত বেশি, সেই জেলার কোটাও তত বেশি হবে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আদমশুমারি অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি লোক বাস করেন ঢাকা জেলায়। কাজেই ঢাকার লোকজন সবচেয়ে বেশি (৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ) সুযোগ পাবেন। এরপর চট্টগ্রাম (৫ দশমিক ২৮ শতাংশ), কুমিল্লা (৩ দশমিক ৭১ শতাংশ), ময়মনসিংহ (৩ দশমিক ৬০ শতাংশ), টাঙ্গাইল (২ দশমিক ৬৩ শতাংশ) ও বগুড়ার (২ দশমিক ৪৩ শতাংশ) লোকজন সুযোগ পাবেন। এই তালিকায় সবচেয়ে পিছিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, মালয়েশিয়া যদি একসঙ্গে ৫০ হাজার লোক নেয়, তাহলে ঢাকা জেলার তিন হাজার ৪৮০ জন, চট্টগ্রামের দুই হাজার ৬৪০, কুমিল্লার এক হাজার ৮৫৫, ময়মনসিংহের এক হাজার ৮০০, টাঙ্গাইলের এক হাজার ৩১৫ এবং বগুড়ার এক হাজার ২১৫ জন কর্মী যেতে পারবেন। একই হিসাবে বান্দরবানের ১২০ জন, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির ২১০, মেহেরপুরের ২৩৫, ঝালকাঠির ২৮০ এবং পঞ্চগড়ের ৩৪০ জন কর্মী যেতে পারবেন।
একইভাবে কিশোরগঞ্জের এক হাজার ৩১৫ জন, নারায়ণগঞ্জের ৮৭৫, গাজীপুরের ৮১৫, ফরিদপুরের ৭০৫, জামালপুরের ৮৫০, নেত্রকোনার ৮০০, নরসিংদীর ৭৭০, মানিকগঞ্জের ৫২৫, মুন্সিগঞ্জের ৫২০, শেরপুরের ৫১০, গোপালগঞ্জের ৪৬৫, মাদারীপুরের ৪৫৫, শরীয়তপুরের ৪৩৫ এবং রাজবাড়ীর ৩৮৫ জন কর্মী সুযোগ পাবেন মালয়েশিয়া যাওয়ার।
নোয়াখালীর এক হাজার ৪০ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ৯৬০, চাঁদপুরের ৯০৫, কক্সবাজারের ৭১০, লক্ষ্মীপুরের ৬০০, ফেনীর ৪৮৫, সিলেটের এক হাজার ৩০, সুনামগঞ্জের ৮০৫, হবিগঞ্জের ৭০৫ এবং মৌলভীবাজারের ৬৫০ জন সুযোগ পাবেন জেলা কোটায়। সিরাজগঞ্জের এক হাজার ৮০ জন, দিনাজপুরের এক হাজার ৬৫, রংপুরের এক হাজার ২০, নওগাঁর ৯৬৫, রাজশাহীর ৯২০, পাবনার ৮৭৫, গাইবান্ধার ৮৬০, কুড়িগ্রামের ৭১০, নীলফামারীর ৬৩০, নাটোরের ৬১০, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৫৭৫, লালমনিরহাটের ৪৪৫ এবং জয়পুরহাটের ৩৪৫ জন এ সুযোগ পাবেন।
একই হিসাবে যশোরের এক হাজার জন, খুলনার ৯৫০, সাতক্ষীরার ৭৪৫, কুষ্টিয়ার ৭০০, বাগেরহাটের ৬১০, ঝিনাইদহের ৬৩৫, চুয়াডাঙ্গার ৪০৫, নড়াইলের ২৮০, মেহেরপুরের ২৩৫, বরিশালের ৯৫০, ভোলার ৬৯০, পটুয়াখালীর ৫৯০, পিরোজপুরের ৪৪৫, বরগুনার ৩৪০ এবং ঝালকাঠির ২৮০ জন সুযোগ পাবেন।
প্রতিবার লোক পাঠানোর ক্ষেত্রে একই হারে জেলা কোটা মানা হবে।
নিবন্ধন অনলাইনে: মালয়েশিয়া কোন খাতে কত লোক নেবে, তা চূড়ান্ত হওয়ার পর বিএমইটি অনলাইনে আবেদন আহ্বানের তারিখ ও সময় ঘোষণা করবে। জেলা কোটা অনুযায়ী নাম নিবন্ধন করতে হবে। কোনো জেলার নির্ধারিত কোটা পূরণ হতে যে কয়দিন লাগবে, তত দিন নিবন্ধন চলবে। কোটা পূরণ হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওই জেলার নিবন্ধন বন্ধ হয়ে যাবে। নিবন্ধন শেষ হওয়ার পর নাম নিবন্ধনকারীদের ফিরতি বার্তায় সাক্ষাৎকারের সময় ও স্থান জানিয়ে দেওয়া হবে।
বিএমইটির মহাপরিচালক বলেন, নাম নিবন্ধনকারীকে পাঠানো ফিরতি বার্তাটিতে বলা থাকবে কোন কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (টিটিসি) তাঁর সাক্ষাৎকার হবে। সরকার ১৩টি টিটিসিতে এ সাক্ষাৎকার নেবে। সাক্ষাতের এই পর্বেই তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, দক্ষতার কাগজপত্র ও অন্যান্য তথ্য যাচাই-বাছাই এবং তাঁর আঙুলের ছাপ নেওয়া হবে। এরপর একটি ডেটাবেজ (তথ্যভান্ডার) করা হবে। এই ডেটাবেজে তাঁদের নাম থাকবে। নাম ওঠার পর তাঁদের এমআরপি (যন্ত্রে পাঠযোগ্য পাসপোর্ট) করতে বলা হবে। এই সময়ে তাঁরা এমআরপি করবেন।
বিএমইটির কর্মকর্তারা জানান, এবার প্রত্যেক কর্মীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবে আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা (আইওএম)।
চূড়ান্ত ডাক পাওয়ার পর প্রশিক্ষণ: প্রশিক্ষণ ছাড়া এবার কোনো কর্মীকে মালয়েশিয়া পাঠাবে না সরকার। তাই ডেটাবেজে থাকা নামের তালিকা ও যোগ্যতা দেখে মালয়েশিয়া কোনো কর্মীকে নেওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত করলেই তাঁকে ৩৭টি সরকারি টিটিসির কোনো একটিতে আসতে বলা হবে। সেখানে তাঁকে ১০ দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
বিএমইটির মহাপরিচালক বলেন, মালয়েশিয়ার ভাষা, খাবার, সংস্কৃতি, আইন সম্পর্কে কর্মীদের পুরোপুরি ধারণা দেওয়া হবে। এ-সংক্রান্ত বই-পুস্তকও দেওয়া হবে; যাতে মালয়েশিয়া গিয়ে তাঁরা সমস্যায় না পড়েন কিংবা কোনো আইন ভঙ্গ না করেন।
খরচ পড়বে ৪০ হাজার টাকা: এবার মালয়েশিয়া যেতে একজন কর্মীর সর্বোচ্চ খরচ পড়বে ৪০ হাজার টাকা। এর মধ্যে থাকবে যাওয়ার বিমান ভাড়া ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা, স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য তিন হাজার টাকা, প্রশিক্ষণ খরচ দেড় হাজার এবং বহির্গমন ছাড়পত্র ও স্মার্ট কার্ডের জন্য এক হাজার টাকা। টেড্র (যে কাজ করবেন) পরীক্ষার জন্য তাঁকে দিতে হবে ৫০০ টাকা। এর বাইরে প্রার্থীকে নিজ খরচে এমআরপি করতে হবে। দেশে ফেরার সময় নিয়োগকর্তা তাঁর বিমান ভাড়া দেবেন।
বেগম শামসুন্নাহার বলেন, ‘৪০ হাজার টাকা একবারে দিতে হবে না। যখন যে কাজ করতে হবে, সে কাজের জন্য কর্মীকে টাকা দিতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘বিদেশগামী কর্মীদের কাছে আমাদের অনুরোধ, মধ্যস্বত্বভোগী, দালাল কিংবা কারও কাছেই অযথা টাকা দিয়ে প্রতারিত হবেন না।’
প্রবাসীকল্যাণ সচিব জানান, ২৬ নভেম্বর প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রীর সঙ্গে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রীর একটি এমওইউ সই হবে। এ ছাড়া মানব পাচার প্রতিরোধ এবং আন্তরাষ্ট্রীয় অপরাধ দমনসংক্রান্ত দুটি এমওইউ সই করবে দুই দেশ। তিনি বলেন, ‘সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হওয়ার পর লোক যাওয়ার সার্বিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়াসহ গণমাধ্যমে প্রচার চালানো হবে।’

No comments

Powered by Blogger.