চারদিক- নবান্ন তাঁকেই ফিরিয়ে দিতে হবে by রফিউর রাব্বি

আমাদের শিল্প-সাহিত্যে নবান্ন আছে। আমাদের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, গান, চিত্রকলা—সবখানে আমরা নবান্নকে পাই, কিন্তু বাস্তবে এখন আর নবান্ন নেই। নবান্ন কৃষকের ফসলি উৎসব। কৃষক তাঁর প্রধান ফসল গোলায় তুলে এই উৎসবে মেতে ওঠেন। বিভিন্ন সমাজে, গোত্রে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে এই উৎসব উদ্যাপনের প্রচলন রয়েছে।


উত্তর-পশ্চিম ভারত অথবা দক্ষিণ ভারতে বৈশাখ মাসে কৃষক তাঁর প্রধান ফসল গম ও রবিশস্য গোলায় তুলে নবান্নের আয়োজন করেন। আমাদের দেশে বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়, জুম চাষিরা শীতকালে এই উৎসব উদ্যাপন করে থাকেন। সাত দিনব্যাপী চলে তাঁদের উৎসব। আমাদের আবহমান গ্রামবাংলায় কৃষক অগ্রহায়ণ মাসে আমন ধান গোলায় তুলে নবান্ন উৎসবের আয়োজন করেছেন। এ নবান্ন উদ্যাপনে প্রধানত হিন্দুসম্প্রদায়ের মধ্যে আনুষ্ঠানিকতার প্রাধান্য ছিল বেশি। নতুন ধানে পায়েস, পিঠাপুলি তৈরি করে উঠানে চালের গুঁড়ি দিয়ে আলপনা এঁকে লক্ষ্মীর পূজা দিয়ে নবান্ন উৎসবের আয়োজন শুরু হতো। চলত বাড়ি বাড়ি পিঠাপুলির বিনিময়। দল বেঁধে কেউ কেউ সঙ সেজে মুখোশ পরে গাঁয়ের বিভিন্ন বাড়ি ঘুরে নেচে-গেয়ে সারা দিন নতুন ফসল সংগ্রহ করতেন। সন্ধ্যায় কীর্তন, পালাগান ও জারিগানের আসর বসত। মুসলমানদের মধ্যে বিভিন্ন মসজিদ ও পীরের দরগায় শিরনি দিয়ে নবান্নের আয়োজন হতো। কোথাও কোথাও লক্ষ্মীর শিরনি করার প্রচলন ছিল। হাটে নতুন ধান বিক্রি করে নতুন পোশাক কিনে তা পরে কৃষক এই উৎসবে মেতে উঠতেন। মুসলমানদের এই উৎসবকে বলা হতো ‘নয়াখাওন’। কোথাও কোথাও আবার এই নবান্নে বাড়ির উঠানের মাঝখানে গর্ত করে জ্যান্ত কই মাছ ছেড়ে কাঁচা দুধ ঢেলে তাতে বাঁশ পোঁতা হতো। এই বাঁশটিকে বলা হতো বীরবাঁশ। বাঁশের চারদিকে চালের গুঁড়ি দিয়ে আলপনা এঁকে বাঁশের প্রতিটি কঞ্চিতে নতুন ধানের ছড়া ঝুলিয়ে ধন ও সম্পদের দেবী লক্ষ্মীর পূজা দেওয়া হতো। জমির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি, অধিক ফসল উৎপাদন, বৃষ্টি, সন্তান-সন্ততির মঙ্গল কামনা আবার মৃত ব্যক্তিদের আত্মার শান্তি কামনায় এ পূজার আয়োজন করা হতো।
পঞ্চাশের মন্বন্তরের পর বিজন ভট্টাচার্য তাঁর বিখ্যাত নবান্ন নাটকটি লিখেছেন। বহুরূপী নাট্যদল সে সময় চারণের মতো বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে ঘুরে এ নাটক মঞ্চস্থ করেছে। এ এক নির্মম ট্র্যাজেডি। সেই দুর্ভিক্ষে উইহেড কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী ১৫ লাখ বাঙালির মৃত্যু হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধে মানবতার মৃত্যুর এ এক করুণ কাহিনি। বলা চলে, পঞ্চাশের দুর্ভিক্ষের পর থেকেই এই অঞ্চলে কৃষক তাঁর জমি ও গোলা হারাতে শুরু করেন। এর কিছুদিন পর সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন, ‘এই হেমন্তে, এই নবান্নে কাটা হবে ধান/ এবার আবার শূন্য গোলা ভরবে’। কিন্তু শূন্য গোলা আর ভরেনি। গোলা শূন্য রেখে তো আর নবান্ন হয় না। নবান্নকে নিয়ে জয়নুল আবেদিন ছবি এঁকেছেন। তাঁর বলিষ্ঠ রেখায়, ড্রয়িংয়ে কৃষকের নবান্ন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। এস এম সুলতান নবান্ন নিয়ে ছবি এঁকেছেন। সুলতানের যে কৃষকেরা ধান মাড়াই করেন তাঁরা হূষ্টপুষ্ট, পেশিবহুল। এঁরা বাস্তবের কৃষক নন, সুলতানের স্বপ্নের কৃষক। সুলতান জানেন, একদিন কৃষকের জমি ছিল, শক্তি ছিল এবং পেশি ছিল। যখন কৃষক সমাজের মূল উৎপাদিকা শক্তি হিসেবে ভূমিকা রেখেছে, অর্থনীতির চাকা সে নিজে নিয়ন্ত্রণ করেছে। জমিদারদের চক্রান্তে কৃষক তার জমি হারিয়েছে, গোলা হারিয়েছে, শক্তি হারিয়েছে, পেশিও হারিয়েছে। কৃষকের সেই হূত জমি, শক্তি ও পেশি ফিরিয়ে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকেই সুলতানের কৃষকেরা বর্তমান কৃষকের মতো কৃশ নয়; হূষ্টপুষ্ট, পেশিবহুল। গাঁয়ে এখন আর কৃষক নেই। জমি ছাড়া কৃষক হয় না। তাঁদের বলা হচ্ছে ভূমিহীন ক্ষেতমজুর। তাঁরা আজ জমি হারিয়ে, গোলা হারিয়ে মহাজন আর জোতদারের গোলায় ফসল তুলে চলেছেন। গোলা আজ সব মহাজন আর জোতদারের আড়তে জড়ো হয়েছে।
আজ শহুরে মধ্যবিত্তের বিভিন্ন মিলনায়তনে, বটতলা, লিচুতলা অথবা বিভিন্ন মাঠে নবান্ন উদ্যাপিত হচ্ছে। কৃষকের উৎসব কেড়ে নিয়ে মধ্যবিত্তের এই আনুষ্ঠানিকতায় নবান্নকে বাঁচানো যাবে না। অ্যাকুরিয়ামে মাছ পুষে গৃহের শোভাবর্ধন করা গেলেও তাতে দেশে মাছের চাহিদা মেটানো যায় না। সেই চাহিদা মেটাতে মাছকে নদী-খাল-বিলে ছেড়ে দিতে হয়। যাঁর নবান্ন তাঁকেই ফিরিয়ে দিতে হবে। কৃষকের উৎসবটি কৃষককে ফিরিয়ে দিলেই তা বাঁচবে। আর তা করতে হলে সবার আগে কৃষককে তাঁর জমি ফিরিয়ে দিতে হবে, গোলা ফিরিয়ে দিতে হবে। তাহলেই কৃষক তাঁর ধান ও ফসল ফিরে পাবেন, তাঁর নবান্ন ফিরে পাবেন। আর তা না হলে নবান্ন কেবল আমাদের শিল্প-সাহিত্যেই টিকে থাকবে, বাস্তবে একে আর পাওয়া যাবে না।
রফিউর রাব্বি
লেখক, সাংস্কৃতিক সংগঠক

No comments

Powered by Blogger.