পরাগ অপহরণের পরিকল্পনা হয় মামুনের বাড়িতে

মা, বোন ও গাড়িচালককে গুলি করে শিশু পরাগ মণ্ডলকে অপহরণের ঘটনায় রিমান্ডে থাকা চার আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য পায়নি পুলিশ। র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে আবুল কাশেম, রিজভি আহমেদ অনিক ও আলফাজ হোসেন বলেছে, অপহরণের পরিকল্পনা এবং তা ঘটানো সম্পর্কে তারা কিছুই জানত না। ঘটনার পর তারা শুনেছে।


পুলিশ বলছে, অপহরণ মিশনের প্রধান আমিরের স্ত্রীর ভাই মামুন তাদের জানিয়েছে, এক মাস আগে তার বাসাতেই পরাগকে অপহরণ এবং পরাগের বাবা বিমল মণ্ডলকে হুমকি দিয়ে স্বার্থ হাসিলের পরিকল্পনা করা হয়। তবে এর পেছনে মূল উদ্দেশ্য কী এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত সে ব্যাপারে মামুন মুখ খোলেনি বলে দাবি তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের। গতকাল পর্যন্ত পরাগের পরিবারের ওপর আক্রমণকারী দলের প্রধান আমিরকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ ও র‌্যাব। আসামিদের মধ্যে আবুল কাশেম, রিজভি আহমেদ অনিক ও আলফাজ ১০ দিনের এবং মামুন সাত দিনের পুলিশ রিমান্ডে আছে।
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম বলেন, 'ঘটনার পরিকল্পনা সম্পর্কে মামুন জানত বলে জানা গেছে। অপর আসামিরাও এ কাজের সহযোগী। অপহরণের ঘটনার ব্যাপারে তাদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।'
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকার অভিযোগে র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার অন্য তিনজন হলো জাহিদুল হাসান, কালাচান, মোহাম্মদ আলী রিফাত। তারা গত শুক্রবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। দনিয়া কলেজের ছাত্র জাহিদ ও একটি ইনস্টিটিউটের অ্যারোনটিক্যাল প্রকৌশল বিভাগের ছাত্র রিফাতের দাবি, তারা ঘটনাস্থলে ছিল, তবে অপহরণের কোনো পরিকল্পনা জানত না। কাশেম জানায়, তার বাসায় তারা তিনজন রাত কাটিয়েছে, তবে তারা অপহরণকারী কি না- তা জানত না সে।
অনিক ও আলফাজ জানায়, তারা দুজন রিফাত ও জাহিদের বন্ধু। ঘটনার পর ওই দুই বন্ধু বিপদের কথা জানায় তাদের। আগে তারা এ অপহরণের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানত না। ঘটনার পর জাহিদ ও রিফাতকে আশ্রয় দেয় তারা।
গত বুধবার রাতে রাজধানীর জুরাইনের মেডিক্যাল রোডের ১/২ নম্বর চার তলা বাড়ির ছাদ থেকে আটক করা হয় রিফাত, জাহিদ, অনিক ও আলফাজকে। কাশেমকে সাভারের ভায়ারচর শ্যামলশী গ্রামের বাড়ি থেকে আটক করেন র‌্যাব সদস্যরা। জুরাইনের ওই বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার হওয়া পাঁচজনের বন্ধু খালিদ সাইফুল্লাকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে র‌্যাব। সূত্রে জানা যায়, গত মঙ্গলবার রাতে আমিরের সঙ্গে রিফাত ও জাহিদের যোগাযোগ হয়। পরের দিন সকালে গাজীপুর হয়ে তাদের ঢাকার বাইরে পালিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। জাহিদ ও রিফাত তদন্তকারীদের জানিয়েছে, কার পরিকল্পনায় ঘটনা ঘটেছে- তা তারা জানত না। তবে পেছনে আমিরের 'বড় ভাই' আছে বলে তারা শুনেছে। জাহিদ ও রিফাত জানায়, তাদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য মোবাইল ফোন সেট দেয় আমির। সম্প্রতি তাদের পেছনে কিছু টাকাও খরচ করে সে। জাহিদের মোটরসাইকেলটিও সারাই করে দেয় আমির। জাহিদ জানায়, সে আমিরকে ভয় পেত। তাই কখন কী কাজে যাচ্ছে, তা জানতে চাইত না সে। ঘটনার আগে তাদের একটি জমিতে 'ঝামেলা' আছে বলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অস্ত্র ব্যবহার বা গুলি করা হবে- এটা তারা জানত না বলে দাবি জাহিদের। রিফাত জানায়, তার কলেজের খরচ ও টিউশন ফি দেওয়ার লোভ দেখায় আমির। এ জন্য শুধু আমিরের সঙ্গে তাদের থাকতে হবে।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আমিরের ভগ্নিপতি আবুল কাশেম জানান, আমির মাঝেমধ্যে তাঁর বাসায় আসত। বোন (কাশেমের স্ত্রী) জেনেভার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল আমিরের। তবে আমির কখন কী করত, তা কাশেমের জানা নেই। অপহৃত পরাগকে সাভারের ভায়ারচর শ্যামলশী গ্রামে তাঁর বাড়িতে নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
গত বুধবার বিকেলে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান থেকে গোয়েন্দা পুলিশের সহায়তায় গ্রেপ্তার হয় আমিরের স্ত্রী ইতির ভাই মামুন। থানা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মামুন জানায়, এক মাস আগে তার বাসায়ই পরাগের বাবা বিমল বা তাঁর পরিবারকে আক্রমণের পরিকল্পনা করা হয়। টাকা আদায় এবং ভয় দেখানোই ছিল এ আক্রমণের উদ্দেশ্য। তবে কে বা কারা এ আক্রমণের পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত, তা সে পুলিশকে জানায়নি। মামুনের দাবি, সে এ ব্যাপারে জানে না। সূত্রে জানা যায়, আমির ঘনিষ্ঠ মামুন পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করে। পরাগ অপহরণ ঘটনার পরও তাকে পুলিশের কাজে সহায়তা করতে দেখা গেছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে তিনজন জবানবন্দিতে বলেছে, আমির ও আল আমিন ঘটনাস্থলে গুলি করে। ঘটনার সময় আকাশ নামের একজন ওই এলাকায় ছিল।
উল্লেখ্য, গত রবিবার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা পশ্চিমপাড়ায় ব্যবসায়ী বিমলের বাড়ির কাছে তাঁর স্ত্রী লিপি রানী মণ্ডল, মেয়ে পিনাকী মণ্ডল, গাড়িচালক নজরুলকে গুলি করে একমাত্র ছেলে পরাগকে অপহরণ করে সন্ত্রাসীরা। মঙ্গলবার কেরানীগঞ্জের আটিপাড়া এলাকায় পরাগকে ফেলে রেখে যায় অপহরণকারীরা। প্রকাশ পায় ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে পরাগকে ফিরে পেয়েছেন তার বাবা।

No comments

Powered by Blogger.