বাল্যবিয়ে-এখনও গেল না আঁধার!

চলতি বছরে ১০ লাখ ১১ হাজার ৫০৩ জন ছাত্রী জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা দিচ্ছে_ এ তথ্য উৎসাহব্যঞ্জক। পূর্ববর্তী দুই বছরে আরও প্রায় ১৪ লাখ কিশোরী এ পাবলিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের উল্লেখ করতে গিয়ে শিক্ষাঙ্গনে তাদের ক্রমবর্ধমান পদচারণার চিত্র তুলে ধরা এখন অনেকটা রেওয়াজ।


তারা আগের তুলনায় অধিক সংখ্যায় চাকরিতে আসছে। মা ও শিশু মৃত্যুর হার ক্রমেই কমছে। কিন্তু এখনও যে গেল না আঁধার! 'বাংলাদেশে শতকরা ৬৬ ভাগ মেয়েরই বিয়ে হয়ে যায় ১৮ বছর বয়সে পেঁৗছার আগে'_ বাংলাদেশে জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিষয়ক সংস্থা ইউএনএফপিএর প্রধান আর্থার আরকেনের এ তথ্য ওপরের আশা জাগানো চিত্রের সঙ্গে একেবারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং তা উদ্বেগ সৃষ্টি করে, আমাদের অর্জনকে ধূলিসাৎ করে দেবে বলে শঙ্কা জাগায়। ১৮ বছর বয়সের আগে মেয়েদের বিয়ে নয়_ এটা দেশের আইন। এ আইনের লঙ্ঘন ঘটে মূলত দরিদ্র ও শিক্ষার সুযোগবঞ্চিত পরিবারগুলোতে। কিন্তু তাদের সাধ্য কী যে প্রবল প্রতাপশালী রাষ্ট্রের আইন লঙ্ঘন করে? এটা ঘটে যেসব কারণে তার একটি হচ্ছে অনেকেই আইনটি সম্পর্কে ভালোভাবে অবহিত নয় কিংবা এর কুফল বুঝতে অক্ষম। আবার অনেকে বাধ্য হয় অল্প বয়সে মেয়ের বিয়ে দিতে। বিভিন্ন জরিপ ও অনুসন্ধানে এ বাধ্যবাধকতার প্রধান কারণ হিসেবে বলা হয়েছে নিরাপত্তার অভাবের কথা। মাস্তান-সন্ত্রাসী এবং প্রভাবশালী পরিবারের বখে যাওয়া সন্তানরা মেয়েদের স্কুলে যাওয়া-আসার পথে কিংবা অন্যত্র উত্ত্যক্ত করে। কিন্তু প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এবং সমাজপতিরা অনেক ক্ষেত্রেই দরিদ্রদের পাশে দাঁড়ায় না। তাদের বেলায় বিচারের বাণী যেন নীরবে-নিভৃতে কাঁদে। পরিবারের নারী সদস্যরা উপার্জন করে না এবং এ কারণে তাদের ঘরে না রেখে বিয়ে দেওয়াই উত্তম_ এমন ধারণা এখনও বদ্ধমূল। মেয়ের বয়স যত বাড়ে যৌতুকের পরিমাণ তত বাড়ে_ যৌতুকবিরোধী আইন থাকার পরও এ বাস্তবতা থেকে আমাদের মুক্তি মেলেনি। বাল্যবিয়ে রোধ করতে হলে তাই কেবল কঠোর আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, আর্থ-সামাজিক সমস্যাদি দূর করার প্রতিও মনোযোগী হতে হবে। এ জন্য বিভিন্ন প্রয়োজনে অর্থের বরাদ্দ চাই, প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসহ সর্বত্র নারীর প্রতি সংবেদনশীল মনোভাব চাই। স্কুলের পাঠ্যবইয়ে বাল্যবিয়ের কুফল বিস্তৃতভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের গণমাধ্যমেও এ নিয়ে ধারাবাহিক প্রচার অব্যাহত রাখা চাই। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে নারী শিক্ষার যেভাবে প্রসার ঘটছে, তাতে এখন অনেকটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, বাল্যবিয়ে রোধ করার জন্য কার্যকর বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে তাতে অবশ্যই ভালো সাড়া মিলবে। এটা বোঝানো এখন মোটেই কঠিন নয় যে, মেয়েদের দেরিতে বিয়ের অর্থ হচ্ছে তাদের আরও বেশি সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাটানো এবং কেবল এভাবেই তারা নিজেদের মেধা ও প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে নিজেকে উপযুক্তভাবে গড়ে তুলতে পারে। দেরিতে বিয়ে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বেশিদিন মেয়েদের ধরে রাখতে পারলে অতিরিক্ত সন্তান ধারণের কুফল সম্পর্কেও তাদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হবে। ফলে জনসংখ্যা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ এবং প্রসূতি ও শিশুদের অকাল মৃত্যু রোধ করার লক্ষ্য অর্জনও সহজ হয়ে যাবে।

No comments

Powered by Blogger.