মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ- সরকারের প্রয়োজনের সময় তাঁরা কী করলেন? by আবদুল মান্নান

মহাজোট সরকারের শেষ বছরে এসে চতুর্থবারের মতো মন্ত্রিসভার কলেবর বৃদ্ধি করা হলো। এ দফায় সাতজন নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী অন্তর্ভুক্তির পর বর্তমানে মন্ত্রিসভার সদস্যসংখ্যা ৫৩-তে দাঁড়াল।


মন্ত্রিসভায় রদবদল, সংযোজন, বিয়োজন ও সম্প্রসারণ—যেকোনো সরকারের জন্য একটি নিয়মিত ঘটনা। সাধারণত এমনটি ঘটে থাকলে অন্য দেশে তা সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় না, বাংলাদেশে হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম ছিল না, যদিও ব্যতিক্রম ছিল সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে। কারা মন্ত্রী হলেন, তা বেশির ভাগ গণমাধ্যমে তেমন একটা গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশিত বা প্রচারিত হয়নি, যেমনটি হয়েছে আওয়ামী লীগের ঝানু পার্লামেন্টারিয়ান তোফায়েল আহমেদ ও মহাজোটের শরিক দল ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেননের মন্ত্রিসভায় যোগদানের আমন্ত্রণ পাওয়া সত্ত্বেও তাতে যোগ না দেওয়ার খবরটি। শেখ হাসিনা ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে মন্ত্রিসভা গঠন করলে তা রাজনৈতিক মহল তো বটেই, গণমাধ্যমকেও বেশ অবাক করেছিল। কারণ, তিনি যাঁদের নিয়ে প্রথম মন্ত্রিসভা গঠন করেছিলেন; তাতে অনেক নতুন অনভিজ্ঞ সদস্য যেমন স্থান পেয়েছিলেন, ঠিক একইভাবে অনেক পুরোনো, অভিজ্ঞ আর দক্ষ সাংসদ বাদ পড়েছিলেন। মন্ত্রিসভা নিয়ে তখন পত্রপত্রিকায় নানা সমালোচনা হয়েছিল। অনেকে নতুন মন্ত্রিসভাকে কচি-কাঁচার আসরের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন এবং সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন সেই মন্ত্রিসভার সাফল্য নিয়ে। তবে আমি প্রধানমন্ত্রীকে সাধুবাদ জানিয়েছিলাম মন্ত্রিসভায় কিছু নতুন মুখ অন্তর্ভুক্তির জন্য। নতুন মুখ নতুন চিন্তাধারা উপহার দিতে পারে এবং জনগণ, সরকার আর দলের প্রতি অঙ্গীকার, নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধ থাকলে নিজ দায়িত্ব পালনে সফলও হতে পারেন। নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ ১৪টি সমমনা দল ও জাতীয় পার্টিকে নিয়ে নির্বাচনী জোট গঠন করেছিল। প্রথমে মন্ত্রিসভায় জাতীয় পার্টির জি এম কাদের ছাড়া আর কারও অন্তর্ভুক্তি না হওয়ায়ও অবাক হয়েছিলেন অনেকেই। অনেকের ধারণা ছিল, আওয়ামী লীগের উল্লিখিত অভিজ্ঞ সাংসদদের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তি না হওয়ার পেছনে প্রধানত কাজ করেছে ওয়ান-ইলেভেনের পর শেখ হাসিনা কারাবন্দী হলে শীর্ষ পর্যায়ের এসব নেতার সঠিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা। এঁদের কেউ কেউ দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন এনে দলকে সংস্কারের কথাও বলেছিলেন। মন্ত্রিসভায় তাঁদের অন্তর্ভুক্ত না করে শেখ হাসিনা তাঁদের একটা শিক্ষা দিতে চেয়েছেন বলে বিশ্বাস অনেকের। প্রায় চার বছর অতিবাহিত হওয়ার পর সার্বিক মূল্যায়নে কচি-কাঁচাদের মন্ত্রিসভা পুরোপুরি সফল না হলেও একজন শিক্ষক হিসেবে তাঁদের অনেককে গড়ে ‘বি প্লাস’ গ্রেড দিতে রাজি আছি। কোনো সরকার বলতে পারে না, তাদের মেয়াদে তারা শতভাগ সফল হয়েছে আর সমালোচকদেরও বলা সমীচীন নয়, একটি সরকার তার মেয়াদকালে শতভাগ ব্যর্থ হয়েছে। তবে একটি সরকারকে যাঁরা সমর্থন করেন এবং যাঁরা সরকারের শুভাকাঙ্ক্ষী অথবা সাধারণ জনগণ—তাঁরা একান্তভাবে আশা করেন, সরকারের সফলতার পাল্লাটা ভারী হোক।
সম্প্রসারিত মন্ত্রিসভায় আমন্ত্রণ পাওয়া সত্ত্বেও যোগ না দিয়ে তোফায়েল আহমেদ ও রাশেদ খান মেনন যে নানামুখী সংবাদ, আলোচনা আর সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন, তা অপ্রত্যাশিত, অনভিপ্রেত ও অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল। তাঁদের জামায়াত-বিএনপি অভিনন্দন জানিয়েছে। তাঁরা মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন, এমন সংবাদ গণমাধ্যমে আসার আগেই সরকারের পক্ষে এটি নিশ্চিত হওয়ার প্রয়োজন ছিল, তাঁরা নতুন দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত কি না। প্রথম দিকে তাঁদের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হলে এটির তেমন একটা প্রয়োজন হতো না, কিন্তু সময় যতই গড়িয়েছে, ততই পরিস্থিতি একটু একটু করে জটিল ও অনিশ্চিত হয়েছে। নিশ্চিত না হয়ে নাম ঘোষণা এবং পরবর্তী সময়ে দুজনের অপারগতা প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে সরকারের কাজের ও কথার সমন্বয়হীনতা আবারও দুঃখজনকভাবে প্রকাশ পেল। কথা ও কাজের সমন্বয়হীনতা যেকোনো সরকারের একটি বড় দুর্বলতা বলে গণ্য করা হয়। তোফায়েল আহমেদ বলেছেন তিনি এ মুহূর্তে মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করার জন্য রাজনৈতিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে প্রস্তুত নন। তিনি আওয়ামী লীগের একজন কর্মী হিসেবে থাকতে চান। তিনি এর আগে একাধিকবার এ কথা বলেছেন এবং কিছুটা আক্ষেপের সঙ্গে বলেছেন, তাঁর একটা গৌরবোজ্জ্বল অতীত ছিল কিন্তু ভবিষ্যৎটা ঠিক তেমন হবে, তা তিনি মনে করেন না। তিনি বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য বলে সব সময় গর্ব করেন আর বলেন, তাঁর আর কিছু চাওয়া-পাওয়ার থাকতে পারে না। এবার মন্ত্রিসভায় যোগ না দেওয়ায় অনেকে মনে করেন, তিনি দলে সঠিকভাবে মূল্যায়িত না হওয়ায় শেষ মুহূর্তে এসে দলীয় প্রধানকে কিছুটা অপ্রস্তুত করে তাঁকে তিনি একটি সবক দিতে চেয়েছেন। অনেকের মতে, তাঁকে যখন সরকার ও আওয়ামী লীগের বেশি প্রয়োজন তখন তিনি পালিয়ে গেলেন।
রাশেদ খান মেননের মন্ত্রিসভায় যোগ না দেওয়ার ব্যাখ্যা আবার ভিন্ন। আমন্ত্রণ পাওয়ার পর তিনি তাঁর দল ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর সভা ডেকে তাদের মতামত নিয়েছেন এবং তারা মন্ত্রিসভায় মেননের যোগদানের বিরোধিতা করলে তিনি তা মেনে নিয়েছেন। অর্থাৎ পলিটব্যুরো যদি রাজি থাকত, তা হলে তিনি মন্ত্রিসভায় যোগ দিতেন। ভোটের রাজনীতিতে এই ধরনের বিপ্লবী সিদ্ধান্ত অনেক সময় বুমেরাং হতে পারে এবং কখনো কখনো এমন সিদ্ধান্তের জন্য পরবর্তীকালে আক্ষেপও করতে হয়। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর কাছে প্রস্তাব এসেছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার। জ্যোতি বসুর দল সিপিএমের পলিটব্যুরো বৈঠক করে সাফ জানিয়ে দিল জ্যোতি বসু ভারতের প্রধানমন্ত্রী হবেন না। তা শুনে জ্যোতি বসু মন্তব্য করেছিলেন, এটি একটি বিরাট ঐতিহাসিক ভুল। বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো অনেক সময় বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে থাকে এবং এর ফলে তাদের অনেক সময় চড়া মূল্য দিতে হয়।
নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে বিজয়ী হলেও মহাজোটের শরিকেরা প্রায়ই বলে থাকে, তারা সরকারের ব্যর্থতার দায় নিতে রাজি নয়। এটি কোনো দায়িত্বশীল মন্তব্য হতে পারে না। জোটের রাজনীতি করলে সরকারের সফলতার ভাগীদার যেমন হতে হবে ঠিক একইভাবে ব্যর্থতার দায়ভারও গ্রহণ করতে হবে; আর তা না হলে জোট ত্যাগ করে এমন মন্তব্য করাই যথার্থ। কারও কারও প্রশ্ন, আওয়ামী লীগের রাজনীতির জন্য ওয়ার্কার্স পার্টি বা জাসদের মতো ছোট দলগুলোর গুরুত্ব কতটুকু। গুরুত্ব অবশ্যই আছে। কারণ, এসব দল প্রগতিশীল রাজনীতিতে বিশ্বাস করে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে। যদিও রাজনৈতিক চিন্তাধারায় এসব দল অনেকাংশে তাত্ত্বিক; তার পরও এদের সঙ্গে রাখলে আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তির জন্য মঙ্গল এবং জনগণকে এটি বোঝানো সহজ হয় যে দল হিসেবে পথ চলতে আওয়ামী লীগ একলা না চলে সমমনাদের সঙ্গে নিয়েছে। এতে আওয়ামী লীগের পরোক্ষভাবে শক্তি বৃদ্ধি হয়। কিন্তু এটাও সত্য, নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ জোটের অন্য শরিকদের যতটুকু মূল্যায়ন করার প্রয়োজন ছিল, ঠিক ততটুকু করেনি। হাসানুল হক ইনু বা রাশেদ খান মেননকে অনেক আগেই মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন ছিল। বর্তমান মন্ত্রিসভায় অনেক অদক্ষ ও অযোগ্য সদস্য আছেন। তাঁদের স্থানে এঁদের জায়গা করে দিলে সরকার নিশ্চিতভাবে লাভবান হতো। ইনু বা মেননের যোগ্যতা নিয়ে কারও সন্দেহ থাকা উচিত নয়।
অনেকে বলেন শেষ মুহূর্তে এসে কেন হঠাৎ করে মন্ত্রিসভার এই সম্প্রসারণ? হয়তো সরকার দেরিতে হলেও এই সত্যটি উপলব্ধি করেছে নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী এখনো অনেক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে বাকি। সরকারের বাকি ১২ বা ১৩ মাসের মধ্যে এ অসমাপ্ত কাজগুলোকে সামনের দিকে নিয়ে যেতে হলে মন্ত্রিসভাকে গতিশীল করতে হবে এবং তা করতে হলে কিছু নতুন মুখের অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজন আছে। শুভাকাঙ্ক্ষীদের মতে, মন্ত্রিসভায় শুধু যোগ করলেই সরকারের কাজে গতি আসবে না; কিছু অকাজের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী আর উপদেষ্টাদের বিয়োগের কথাও চিন্তা করতে হবে। আশা করি, প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করবেন। যাঁরা বর্তমান সরকারের সমালোচনা করেন বা পরামর্শ দেন, তাঁরা সবাই সরকার বা আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ নন। তাঁরা সরকারের সফলতা কামনা করেন। তাঁরা এটি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, এই সরকার যুদ্ধাপরাধীদের যে বিচারকাজ শুরু করেছে তা যদি সরকারের বর্তমান মেয়াদে একটি যৌক্তিক পরিণতির দিকে না যায়, তা হলে আগামী নির্বাচনে যদি কোনো কারণে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না ফেরে; তবে পরবর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরমুহূর্তেই এ বিচারকাজ বন্ধ হয়ে যাবে। আর বহু প্রত্যাশিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজের সেখানেই পরিসমাপ্তি ঘটবে।
সরকার ইতিমধ্যে মন্ত্রিসভার নতুন মন্ত্রীদের দায়িত্ব বণ্টনসহ আরও কিছু মন্ত্রীর দায়িত্ব পুনর্বণ্টন করেছে। স্বরাষ্ট্র ও তথ্যে পরিবর্তনটি অপরিহার্য ছিল। নৌপরিবহন, বিমান ও পর্যটন এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়েও পরিবর্তন হবে বলে অনেকে আশা করেছিলেন। না হওয়াতে মানুষ হতাশ হয়েছে।
শেষ করি এই বলে, সরকার বর্তমানে একটি সংকটকাল অতিক্রম করছে। বিভিন্ন স্থানে নানামুখী ষড়যন্ত্র দানা বাঁধাও বিচিত্র নয়। ভবিষ্যতে শিক্ষাঙ্গন, শিল্পাঞ্চলসহ অন্যান্য সেক্টরে পরিস্থিতি ঘোলাটে হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকারকে নানাভাবে বিতর্কিত করতে দলের ভেতরে ও বাইরে অনেকেই তৎপর বলে মনে হয়। অতীতে আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় এসেছে, ঠিক একই কাজ হয়েছে। সরকারের এসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করে সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য হয়তো মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। প্রধানমন্ত্রী যাঁদের ওপর আস্থা রেখে মন্ত্রিসভায় যোগ দিতে আহ্বান জানিয়েছিলেন, তাতে দুজন সাড়া দেননি। এতে কার ক্ষতি আর কার লাভ হলো তা ভবিষ্যতে বোঝা যাবে। দুজনের মন্ত্রিসভায় যোগ না দেওয়ায় যাঁরা তাঁদের বাহবা দিচ্ছেন আর কথার ফুলঝুরি ছোটাচ্ছেন, তাঁরা কার স্বার্থে কাজ করছেন তা-ও হয়তো আর কিছুদিনের মধ্যেই প্রকাশ পাবে। তোফায়েল আহমেদ ও রাশেদ খান মেনন আমাদের ছাত্রজীবনের রাজপথ কাঁপানো ছাত্রনেতা। বলতে দ্বিধা নেই, তাঁদের সিদ্ধান্ত অনেকের মতো আমাকেও হতাশ করেছে। তার পরও তাঁদের মঙ্গল কামনা করি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁদের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়নি।
বর্তমান সরকারের হাতে বাকি যে সময়টা আছে তাকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হলে পুরো মন্ত্রিসভাকেই একটি টিম হিসেবে কাজ করতে হবে, যার নেতৃত্বে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী। নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করলে বিগত দিনের অনেক ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব। পারবেন কি বঙ্গবন্ধুকন্যা জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে?
আবদুল মান্নান: সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

No comments

Powered by Blogger.