অভিমত- অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা নয়

সরকার অনলাইনভিত্তিক সংবাদপত্র, রেডিও ও টেলিভিশনের জন্য ‘অনলাইন গণমাধ্যম পরিচালনা নীতিমালা, ২০১২’ প্রবর্তন করতে যাচ্ছে, যার খসড়া অক্টোবর মাসের মধ্যে চূড়ান্ত হবে। ইতিমধ্যে নানা অসংগতি এবং অস্পষ্টতা-সংবলিত এই খসড়া নীতিমালা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের বাদ-প্রতিবাদ চলছে।


কিন্তু তথ্য মন্ত্রণালয়ের খসড়া নীতিমালা প্রণয়ন-প্রক্রিয়া অংশগ্রহণমূলক নয়। ১২ সেপ্টেম্বর তথ্যসচিব কয়েকজন অনলাইন গণমাধ্যম প্রতিনিধিকে ডেকে প্রস্তাবিত নীতিমালা সরবরাহ করেন এবং এ বিষয়ে ১০ দিনের মধ্যে তাঁদের মতামত জানাতে বলেন। একটি গণতান্ত্রিক দেশে, এ রকম গুরুত্বপূর্ণ ও বিকাশমান তথ্যক্ষেত্রে, যুক্তিযুক্ত আলোচনার সময় না দিয়ে, এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত না নিয়ে নীতিমালা প্রণয়নকে গণতান্ত্রিক বা যুক্তিসংগত কোনোটাই বলা যায় না।
খসড়া নীতিমালাটি পড়লে এটিকে একটি নিয়ন্ত্রণমূলক আইনমালা মনে হয়। নীতিমালা সাধারণত দিকনির্দেশনার জন্য প্রণীত হওয়া দরকার, যার ভিত্তিতে প্রয়োজনে ভবিষ্যতে আইন তৈরি হতে পারে। কিন্তু প্রস্তাবিত নীতিমালায় লাইন্সেস ফি, নবায়ন ফি, অনুমোদন গ্রহণ, জরিমানা, শাস্তি ইত্যাদি সুস্পষ্ট আইনি পদক্ষেপের কথা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া কমিউনিটি রেডিও নীতিমালার সম্পূর্ণ অনুকরণে রচিত এই নীতিমালায় অসংগতি ও অস্পষ্টতা রয়ে গেছে।
যেকোনো নীতিমালা কিংবা আইনে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সংজ্ঞা দেওয়াটা কাঠামোগত দিক থেকে বাধ্যতামূলক। কিন্তু প্রস্তাবিত অনলাইন গণমাধ্যম পরিচালনা নীতিমালায় ‘অনলাইন গণমাধ্যম’ বলতে কী বোঝায়, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ধারণা দেওয়া হয়নি। অনলাইন গণমাধ্যমের সীমানা এখনো সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত নয়। শুধু যে সংবাদভিত্তিক সাইটগুলো কিংবা রেডিও-টিভি-সংবাদপত্রের অনলাইন সাইটগুলো বলতেই অনলাইন গণমাধ্যম বোঝায়, তা নয়; নানা ধরনের ব্লগ, ফোরাম ও মতামতের সাইটগুলোও অনলাইন গণমাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রস্তাবিত খসড়ায় সে বিষয়টি স্পষ্ট না হওয়ায় ইতিমধ্যেই ব্লগারসহ অনলাইনে সক্রিয় বহু মানুষ এর সমালোচনা করেছেন এবং অনেকেই আতঙ্কিত যে কর্তৃপক্ষ এ নীতিমালার দোহাই দিয়ে স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশের জন্য ব্লগ ও সামাজিক মাধ্যমগুলোর কণ্ঠ চেপে ধরবে। যদিও তথ্যসচিব ইতিমধ্যে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর.কমকে জানিয়েছেন যে নীতিমালার আওতায় সোশ্যাল মিডিয়া বা ব্লগ নিয়ন্ত্রণের কোনো ইচ্ছা সরকারের নেই। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমগুলোতে সংবাদ বা সংবাদধর্মী কোনো কিছুর প্রকাশ হলে তা এ-সংক্রান্ত আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে কি না, ব্যবহারকারীদের মনে সে সংশয় রয়েছে।
খেয়াল রাখা দরকার, পৃথিবীব্যাপী অনলাইন সাংবাদিকতার পরিধি যেমন দ্রুত বাড়ছে, এর প্রকৃতিও তেমনি নিয়ত পাল্টাচ্ছে। বাংলাদেশেও এখন প্রতিষ্ঠিত সব সংবাদপত্রের অনলাইন সংস্করণ আছে, অনলাইনভিত্তিক সাংবাদিকতা করে কয়েকটি পোর্টাল বেশ নাম ও নজর কেড়েছে। প্রতিদিন যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন সাইট। এদের কোনোটি পেশাদার নিউজ সাইট, অনেক অর্থকড়ি বিনিয়োগ আছে তাতে; কিন্তু আছে তরুণ উদ্যোক্তার স্বল্প পুঁজির সাইট, যাদের সম্ভাবনা বিপুল। বড় পত্রিকার পাশাপাশি ক্ষুদ্র তহবিলের স্থানীয় পত্রিকারও আছে অনলাইন সংস্করণ। সিটিজেন সাংবাদিকতা যে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার পূর্বশর্ত, তার বেশ কিছুটা পূরণ করছে এই নিউজ সাইটগুলো। কিন্তু খসড়া নীতিমালাতে বিকাশমান অনলাইন সাংবাদিকতাকে প্রণোদনা দেওয়ার পরিবর্তে উচ্চ অঙ্কের লাইসেন্স ফি, নবায়ন ফি এবং জামানত ধার্য করে এর বিকাশের পথকে রুদ্ধ করার আয়োজন করা হয়েছে।
শিক্ষার বিকাশের জন্যও এই নীতিমালা একটি বাধা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় হাতে-কলমে সাংবাদিকতা শিক্ষায় স্বল্প খরচের অনলাইন, রেডিও ও টিভি স্টেশন স্থাপনের চিন্তাভাবনা চলছে। এই নীতিমালা প্রযোজ্য হলে শিক্ষার প্রসারে তা হবে আত্মঘাতী। জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিতে গণমাধ্যমে নারীর প্রবেশাধিকার বা অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং গণমাধ্যম নীতিমালায় জেন্ডার পরিপ্রেক্ষিত অন্তর্ভুক্ত করতে বলা হয়েছে। বড় ধরনের অর্থলগ্নী সম্ভব হবে না বলে প্রস্তাবিত নীতিমালার এই নিয়ন্ত্রণ মূলত অনলাইন গণমাধ্যমে নারী উদ্যোক্তার প্রবেশাধিকার বাধাগ্রস্ত করবে। অধিকন্তু, নীতিমালায় জেন্ডার পরিপ্রেক্ষিত অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
আমরা মনে করি, নীতিমালায় কীভাবে গণমাধ্যমের জন্য দক্ষ কর্মী গড়ে তোলা দরকার, সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা দরকার; গণমাধ্যমে গণমানুষের কণ্ঠ যাতে নিশ্চিত হয়, তার জন্য ছোট ও কমিউনিটি মিডিয়াগুলোকে সুরক্ষার পথ বাতলানো। এর বিপরীতে নিয়ন্ত্রণের কঠোরতা ফুটে ওঠে এ নীতিমালার ৯(ঘ) ধারায়; যেখানে বলা হয়েছে, ‘সরকারের অন্য কোনো নির্দেশ প্রতিপালনে ব্যর্থ হলে সরকার লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করতে পারবে।’ তা ছাড়া ১৪(ঘ) ও (ঙ) ধারায় বর্ণিত হিংসাত্মক, সন্ত্রাসী ও অশ্লীল কর্মকাণ্ডের কোনো ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি। এ অস্পষ্টতার বলে আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ যেকোনো প্রচারিত বা প্রকাশিত বিষয়কে নিজের স্বার্থে সংজ্ঞায়িত করে সেন্সর আরোপ করতে পারবে।
অনলাইন তথ্যের শ্রোতা-দর্শক-পাঠকের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সংশ্লিষ্ট বিষয়ের আরও দেশি-বিদেশি লিংক। নীতিমালা মেনে নিউজ সাইটে দেশি বা বিদেশি আধেয়র লিংক দেওয়া না হলে অনলাইন গণমাধ্যম এর গুরুত্ব খোয়াবে। অনলাইন গণমাধ্যম যেখানে অন্য কোনো দেশ থেকে প্রকাশ বা প্রচার করা সম্ভব; সেখানে ভৌগোলিকভাবে সীমাবদ্ধ এই নীতিমালার অনেক অংশ কার্যকর করাই সম্ভব নয়।
বাজার-পরিস্থিতি অনুযায়ী, আমাদের অনলাইন গণমাধ্যম এখনো কুটির শিল্পই বটে। এমন প্রসারমাণ কুটির শিল্পের জন্য এ ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক আরোপিত নীতিমালা খুবই আগাম হয়ে গিয়েছে। যেসব দেশে অনলাইন সাংবাদিকতা আরও জমজমাট, সেসব দেশেও অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা গ্রহণ করা হয়নি।
তাই প্রস্তাবিত অনলাইন গণমাধ্যম পরিচালনা নীতিমালা বাতিলের পাশাপাশি গণমাধ্যম পরিচালনার জন্য এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব অংশীদারের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে একটি গণমুখী ও বাস্তবধর্মী সমন্বিত গণমাধ্যম নীতিমালা প্রণীত হোক।
লেখকেরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক।

No comments

Powered by Blogger.