আবারও চিকিৎসকদের হামলা ১৮ সাংবাদিক আহত

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আবারও কর্তব্যরত সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালিয়েছে শিক্ষানবিশ চিকিৎসকেরা। গতকাল বুধবার দুই দফায় এই হামলায় অন্তত ১৮ জন সাংবাদিক আহত হয়েছেন।


এ সময় শিক্ষানবিশ চিকিৎসকেরা দুটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের গাড়ি ও কয়েকটি ক্যামেরা ভাঙচুর করেন। সকালে প্রথম দফা হামলার পর জরুরি বিভাগের চত্বরে ঢোকার ফটক বন্ধ করে দিলে প্রায় আড়াই ঘণ্টা জরুরি চিকিৎসা বন্ধ থাকে।
সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আরিফুল হক নামের এক রোগীকে চিকিৎসকের চড় মারার বিষয়ে ১৯ জুলাই গণমাধ্যমে প্রচারিত খবরকে কেন্দ্র করে শিক্ষানবিশ চিকিৎসকেরা সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালান। ওই খবর প্রকাশের পর ২০ জুলাই প্রথম হামলায় পাঁচ সাংবাদিক আহত হন। শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের দাবির মুখে কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের হাসপাতালে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এরপর গত পাঁচ দিন সাংবাদিকদের আর ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়নি। তবে প্রতিবার ঢোকার সময় তাঁর অনুমতি নিতে হবে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও হাসপাতাল সূত্র জানায়, গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শল্য বিভাগে চিকিৎসাধীন চড় খাওয়া ওই রোগী হাসপাতালের জরুরি বিভাগের বাইরে কর্তব্যরত সাংবাদিকদের বসার ঘরে আসেন। ওই রোগী জানান, তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। এ কথা শুনে তিনজন সাংবাদিক খোঁজ নিতে বের হন। এর পরপরই কয়েকজন শিক্ষানবিশ চিকিৎসক ওই ঘরে গিয়ে সাংবাদিকদের খুঁজতে থাকেন। কিন্তু তখন ওই রোগী (আরিফুল হক) ছাড়া আর কাউকে পাননি। তখন শিক্ষানবিশ চিকিৎসকেরা আরিফুল হককে ওই ঘরে আটকে বাইরে থেকে দরজায় তালা দিয়ে দেন। কিছুক্ষণ পর আবার আরিফুলকে ধরে হাসপাতালের পরিচালকের দপ্তরে নেওয়া হয়।
এ খবর পেয়ে বেলা সোয়া একটার দিকে সাংবাদিকেরা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান। তাঁরা দেখেন, জরুরি বিভাগসহ প্রতিটি বিভাগের ফটকে ‘পরিচালকের অনুমতিসহ শর্ত সাপেক্ষে সাংবাদিকদের হাসপাতালে প্রবেশ করতে হবে’ লেখা কাগজ সেঁটে দেওয়া রয়েছে। এটা দেখে সাংবাদিকেরা দ্রুত হাসপাতাল থেকে বের হয়ে জরুরি বিভাগের বাইরে অবস্থান নেন। সাংবাদিকদের আসার খবর পেয়ে চিকিৎসকেরা লাঠিসোঁটা নিয়ে সেখানে আক্রমণ করেন। সাংবাদিকেরা কোনো রকম ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে রক্ষা পান। এ সময় আক্রমণকারী চিকিৎসকেরা সাংবাদিকদের দুটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করেন। এরপর মহড়া দিতে থাকেন। একপর্যায়ে তাঁরা জরুরি বিভাগে সমকাল-এর ফটোসাংবাদিক সাজ্জাদ নয়ন ও কাজল হাজরাকে পেয়ে ব্যাপক মারধর করেন এবং তাঁদের ক্যামেরা ছিনিয়ে নিয়ে ভেঙে ফেলেন। একই সময় দেশ টিভি ও গাজী টিভির দুটি গাড়ি ভাঙচুর ও উভয় চ্যানেলের সাংবাদিক মাহমুদুল হাসান ও ইয়াকুব হাসানকে বেধড়ক পেটান। একই সময় বাংলাদেশ প্রতিদিন-এর সাংবাদিক আলমগীর হোসেনকে লাঞ্ছিত করা হয়। এরপর শিক্ষানবিশ চিকিৎসকেরা হাসপাতাল চত্বরে মহড়া দিতে থাকেন। বেলা আড়াইটার দিকে তাঁরা জরুরি বিভাগের প্রধান ফটক বন্ধ করে দেন।
এই হামলার খবর পেয়ে বেলা তিনটার দিকে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ), বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) নেতারা সেখানে যান। তাঁরা হাসপাতালের ফটকে পৌঁছানো মাত্রই শিক্ষানবিশ চিকিৎসকেরা ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন। এ সময় আরও ১৪ জন সাংবাদিক আহত হন। তখন চিকিৎসকেরা পুলিশ ক্যাম্পের পাশের সাংবাদিকদের বসার কক্ষটি ব্যাপক ভাঙচুর করেন। বিকেল চারটা পর্যন্ত জরুরি বিভাগে ঢোকার লোহার ফটকটি বন্ধ থাকায় কোনো রোগী হাসপাতালে ঢুকতে পারেননি।
ক্র্যাবের সভাপতি আখতারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, সাংবাদিকদের তিনটি সংগঠনের নেতারা উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে হাসপাতালের পরিচালকের সঙ্গে আলোচনা করতে গেলে শিক্ষানবিশ চিকিৎসক ও তাঁদের ভাড়াটে কিছু সন্ত্রাসীরা অতর্কিতে হামলা করে। এতে ছাত্রলীগের একাংশও যোগ দেয়। এ সময় পুলিশ নীরব ভূমিকায় ছিলেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।
এদিকে দ্বিতীয় দফা হামলার আগে চড় খাওয়া রোগী আরিফুল হককে ছাড়পত্র দিয়ে কর্তৃপক্ষ পুলিশ প্রহরায় অ্যাম্বুলেন্সে করে বের করে দেয়।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বিবৃতিতে সাংবাদিকদের ওপর এ হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

No comments

Powered by Blogger.