ব্যবসায়ী নেতাদের মত-অপব্যবহার হবে, বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগের যে ধারা সরকার কম্পানি আইনে যুক্ত করতে চাচ্ছে, তার কঠোর সমালোচনা করেছেন দেশের ব্যবসায়ীরা। তাঁদের আশঙ্কা, আইন পাস হয়ে গেলে এই ধারাটির ভয়াবহ রাজনৈতিক অপব্যবহারের সুযোগ থাকবে। দেশজুড়ে তৈরি হবে অরাজকতা।


এমনকি এ আইনের শিকার হতে পারেন বর্তমান সরকারের সমর্থক ব্যবসায়ীরাও। সরকার বদল হলে নানা অজুহাতে তাঁদের প্রতিষ্ঠানেও বসিয়ে দেওয়া হতে পারে প্রশাসক। এর পাশাপাশি আরেকটি আশঙ্কার কথা বলেছেন ব্যবসায়ীরা। সেটি হলো, এ আইনের কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভাবতে পারেন, বাংলাদেশে সরকার চাইলে তাঁদের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারবে। এ ভয়ে তাঁরা এ দেশে বিনিয়োগ করতে চাইবেন না, যা অর্থনীতির জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেছেন, আইনে এ ধারা সংযোজন করা হলে দেশি ব্যবসায়ীরাও বিনিয়োগে উৎসাহ হারাবেন। ব্যবসায়ীদের আরো অভিযোগ, যেকোনো আইন করার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনার রীতি আছে। কিন্তু এ আইনের সংশোধন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই হচ্ছে। এমনকি ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই এ বিষয়ে কিছুই জানে না।
ব্যবসায়ীদের মত হলো, এ ধরনের আইন ব্যক্তির ব্যবসার ওপর কর্তৃত্বের চেষ্টা। মুক্তবাজার অর্থনীতির দেশে যেকোনো প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগের বিধান থাকে না। ডেসটিনিতে প্রশাসক নিয়োগের জন্য শুধু প্রস্তাবিত মাল্টিলেভেল মার্কেটিং আইনে এ ধারাটি যুক্ত করে দেওয়ার পরামর্শ দেন একজন ব্যবসায়ী নেতা।
এ বিষয়ে এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি এ কে আজাদের মত জানতে চাইলে কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, 'সরকার কম্পানি আইনে এ ধরনের ধারা যুক্ত করার উদ্যোগের বিষয়ে আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি। কাল (আজ) আমরা এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাব।'
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আনিসুল হক এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, এ ধরনের আইনের অপব্যবহারের সুযোগ বেশি থাকে। এমনকি এক সরকার এ আইন করলে পরের সরকার আগের সরকারের সুবিধাভোগীদের বিরুদ্ধে আইনটি প্রয়োগ করতে পারে। তাই আইনটি করতে হবে খুবই সতর্কভাবে।
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, কম্পানি আইনে এ ধারা যুক্ত করার মানে হলো ব্যক্তির ব্যবসায়ের ওপর কর্তৃত্ব গ্রহণ। আইনটি পাস হলে এ দেশে কেউ বিনিয়োগ করবে না। বিদেশি বিনিয়োগও আসবে না। অর্থনীতির ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। দেশজুড়ে অরাজকতা তৈরি হবে। এ ধরনের আইন সমাজতান্ত্রিক দেশে থাকতে পারে। বর্তমানে চীনেও এ ধরনের আইন নেই।
তিনি মনে করেন, সরকার মাল্টিলেভেল মার্কেটিংয়ের জন্য যে আইনটি করছে সেখানেই এ ধারাটি যুক্ত করে দেওয়া যায়। কারণ ওই ধরনের ব্যবসার সঙ্গে বহু মানুষ যুক্ত হয়ে যায়। তাদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য ওই আইনে এ ধারা যুক্ত করা হলে তা ঠিক আছে। নইলে এ আইন রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার হবে। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকবে তারা বিরোধী দলের ওপর এটা প্রয়োগ করবে।
এফবিসিসিআইয়ের প্রথম সহসভাপতি মো. জসিম উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, এ ধরনের সংশোধনী আনার আগে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সরকার তা করেনি। এমনকি ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই এ সংশোধনের বিষয়ে কিছুই জানে না।
তিনি বলেন, বর্তমান আইনেই আদালতের রায়ে প্রশাসক নিয়োগের বিধান আছে। নতুন করে সব প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগের ধারা যুক্ত করা হলে উদ্যোক্তারা ভয় পাবেন। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে ভুল বার্তা যাবে।
প্রশাসকের 'সরল বিশ্বাসের' সংজ্ঞা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ব্যবসায়ী নেতারা। তাঁরা মনে করেন, সরল বিশ্বাস কী হবে, তা সরকারই ঠিক করবে। এর ফলে সরল বিশ্বাসের কথা বলে অনেক অন্যায় হতে পারে। আবার ব্যবসায়ীদের ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিও হতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত হলে আদালতে না যেতে পারাটা ব্যক্তির মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।
সাধারণ ব্যবসায়ীদের মৌলিক সুরক্ষা দিয়ে আইনটি করার পরামর্শ দিয়ে আনিসুল হক বলেন, প্রশাসকদের সরল বিশ্বাসের সিদ্ধান্তে ক্ষতিগ্রস্ত হলে আদালতে যাওয়ার সুযোগ না থাকা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। মানুষকে বিচার পেতে আদালতে যাওয়ার সুযোগ রাখতে হবে।
প্রশাসকদের দায়মুক্তির ধারার কঠোর সমালোচনা করে আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, সরল বিশ্বাস কী, সেটা তো তারাই ঠিক করবে। চুরি ও দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য সরকার এমন আইন করার চিন্তা করছে।
প্রশাসকের দায়মুক্তি সম্পর্কে জসিম উদ্দিন বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কোনো ব্যক্তি আদালতে যেতে পারবে না- এটা মানুষের মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন। প্রশাসক যে অন্যায় করবেন না, তার নিশ্চয়তা নেই। আইনের ঊর্ধ্বে ও কেউ নয়।
সব প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগের ধারা যুক্ত করে আইন পাস হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে নেতিবাচক বার্তা যাবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, দু-চারটি প্রতিষ্ঠানের জন্য এমন কোনো আইন করা উচিত নয় যাতে বিনিয়োগকারীরা উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে নেতিবাচক বার্তা পৌঁছায়। ঢালাওভাবে এমন আইন থাকা উচিত নয়।
বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহসভাপতি ও বর্তমানে এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক নিজাম উদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে এ ধরনের আইন ঠিক নয়। এর রাজনৈতিক অপব্যবহার হতে পারে। সরকারি দল যদি মনে করে কোনো ব্যবসায়ী বিরোধী দলের সমর্থক তাহলে তার প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক বসিয়ে দিতে পারে। তবে জনগণের আমানত রক্ষা করাও সরকারের দায়িত্ব।
প্রশাসক নিয়োগের সুযোগ রাখার পক্ষপাতী হলেও এ আইনের অপব্যবহার রোধে ব্যবস্থা রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম। তিনি বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান প্রতারণামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত, তাদের বিরুদ্ধে সরকারের এটি একটি উপায়। তবে অপব্যবহার রোধের কৌশল থাকতে হবে। পাশাপাশি প্রশাসকদের দায়মুক্তির পক্ষেও তিনি। নইলে প্রশাসক পাওয়া যাবে না বলে মনে করেন তিনি। তবে প্রশাসক নিয়োগে তিনি প্যানেল করে সেখানে সাবেক ব্যবসায়ী নেতাদের রাখার পরামর্শ দেন।
তাঁর মতে, সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের মিলিয়ে একটি প্যানেল করা যেতে পারে। ব্যবসায়ীদের কেউ প্রশাসক হতে চাইলে তাঁদেরও সুযোগ দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে তিনি গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে একবার এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক হিসেবে সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীকে নিয়োগ দেওয়ার উদাহরণটি উল্লেখ করেন।

No comments

Powered by Blogger.