আমানত শাহ্ লুঙ্গি অলিম্পিক আপডেট-'মহাসাগরে' সাগরের একটুখানি পাওয়া by মাসুদ পারভেজ

মাত্রই তাঁর হিট শেষ করে মিঙ্ড জোনে এসে দাঁড়িয়েছেন সাংবাদিকদের সামনে। আরো কিছু হিট তখনো বাকি। কাজেই সবার মধ্যে নিজের অবস্থানটা জানতে আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষায় থাকতেই হতো মাহফিজুর রহমান সাগরকে। কিন্তু বাংলাদেশের এ সাঁতারু অপেক্ষায় থাকলেন না।


এইমাত্র দিয়ে আসা সাঁতারের ভিত্তিতেই নিশ্চয়তার সুরে বলে ফেললেন, 'আগে আমাদের সাঁতারুরা অলিম্পিকে এসে ৬৪ জনের মধ্যে ৬৩তম, ৫৮ জনের মধ্যে ৫৭তম কিংবা ৫০ জনের মধ্যে ৪৫তম হতেন। আমি অন্তত এতটা পেছনে থাকব না।'
একটু পরে ছেলেদের ৫০ মিটার হিটের চূড়ান্ত ফল ঘোষিত হলে দেখা গেল আসলেও তা-ই। শেষের দিক থেকে তিনি অনেক ওপরে। ৫৮ জনের মধ্যে ৩৯তম হওয়াটা অবশ্য এমন কোনো কৃতিত্বের বিষয় হওয়ার কথা নয়। কিন্তু অলিম্পিকে বাংলাদেশের সাঁতারুদের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করে এটাকে খারাপও বলা যাচ্ছে না। বিশেষ করে যখন অলিম্পিকে সাঁতার শুরুর আগেই ঝাঁপ দিয়ে ডিসকোয়ালিফায়েড হওয়ার ঘটনাও আছে বাংলাদেশিদের। সেই ১৯৯৬-র আটলান্টা অলিম্পিক দিয়ে সাঁতারু পাঠানোর রেওয়াজ শুরুর পর বাংলাদেশের আর কেউ তো এতটা ওপরেও যেতে পারেননি। বেইজিংয়ে গত অলিম্পিকেই ১০০ মিটার ব্যাকস্ট্রোকে অংশ নেওয়া রুবেল রানা শেষের দিক থেকে হয়েছিলেন প্রথম! আর এর আগে এথেন্স অলিম্পিকে সাগরের ইভেন্টেই জুয়েল আহমেদের টাইমিং ছিল ২৫.৪৭। আর কাল সাগর শেষ করলেন ২৪.৬৪ সেকেন্ড সময় নিয়ে। গত বছর সাংহাইয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের টাইমিংয়ের (২৪.৮২) চেয়েও কম সময় নিয়েছেন এবার অলিম্পিকে বাংলাদেশের পতাকাবাহক।
একটু এগোতে পারার এ আনন্দের প্রকাশই থাকল তাঁর কথায়, 'চেষ্টা করেছি সাধ্যমতো। এবার যে টাইমিংটা হলো তাতে আমি নিজে সন্তুষ্ট।' কিন্তু তাঁর নিজের সেরা টাইমিং না ২৪.৫৩ সেকেন্ডের, যেটা গত বছর এসএ গেমসে হয়েছিল। তবুও অলিম্পিকের টাইমিং তাঁর বিবেচনায় এগিয়ে থাকার কারণ, 'ব্যক্তিগত সেরা টাইমিং এসএ গেমসে হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেটা ছিল এক বছর চার মাস ক্যাম্পে থাকার ফল। কোরিয়ান কোচের কাছে ছিলাম ছয় মাস। চীনে ছিলাম আরো সাড়ে তিন মাস। সে তুলনায় অলিম্পিকের প্রস্তুতি বলতে কিছুই ছিল না। এসএ গেমসের ক্যাম্পেই ছিলাম। অলিম্পিকে অংশ নেব বলে আমাকে যেখানে শুধু বাড়তি কিছু টাকা ভাতা দেওয়া হতো।'
২০০৭ সালের পর থেকে বাংলাদেশের ফ্রিস্টাইল সাঁতারের অবিসংবাদিত সেরা সাগর এ অলিম্পিকে আসার আগেও একদিন দুঃখ করে বলছিলেন, 'আমরা যে পদকটা পাই, সেটার দাম ৫০ টাকার বেশি নয়। এ অবস্থায় নিজেকে মোটিভেট করা কঠিন। তবুও সাঁতার ভালোবাসি বলে সাঁতরাতে নামি।' সীমিত সুযোগ-সুবিধার দেশ থেকে এসে এবার তাঁর খুলে যাওয়া চোখে আরো বেশি করে ধরা পড়েছে, 'অন্য দেশের সাঁতারুদের সঙ্গে আমাদের অনেক পার্থক্য। ওরা যে সুযোগ-সুবিধা পায়, আমরা এর কিছুই পাই না। ওদের একেক জনের পেছনে ফিজিও-কোচ থেকে শুরু তিন-চারজন লেগে থাকে। আমার শুধু কোচ। ওদের ল্যাকটিক এসিড (যে এসিডের উপস্থিতি শরীরে যত কম, সেই সাঁতারু তত ফিট) টেস্ট হয়। ওদের ইকুইপমেন্টস, খাওয়া ও থাকার পরিবেশ, চলাফেরা থেকে শুরু করে সব কিছু আমাদের চেয়ে উন্নত।'
সাগর অবশ্য শুধুই এসব দেখার হাহাকার নিয়ে আজ দেশে ফিরছেন না, 'এখানে অনেক গ্রেট গ্রেট সাঁতারুকে দেখলাম। তাঁদের টেকনিক ও স্টাইল দেখলাম। গেমস ভিলেজে ও এখানে মাইকেল ফেলপসের দেখাও পেয়েছি। ছবি তোলার খুব ইচ্ছে ছিল। কিন্তু সুযোগ হয়নি।' তবে ওয়াইল্ড কার্ডের মাধ্যমে অলিম্পিকে সাঁতরানোর সুযোগ পাওয়াটা তাঁর জন্য স্বপ্নপূরণের মতো এক ব্যাপারই, 'আমার বাবা (আজিজুর রহমান) সব সময় বলতেন যে তাঁর ছেলে নাকি একদিন বড় বড় আসরে সাঁতরাবে। আমিও অলিম্পিকে আসার স্বপ্ন প্রথম দেখতে শুরু করি, যখন কারার ছামেদুল সিডনি অলিম্পিকে যান। তখন তিনি খুব হাইলাইটেড হয়েছিলেন।' বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) থেকে বের হয়ে এখন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জুনিয়র কমান্ডিং অফিসার অবশ্য এটা স্বীকার করতেও ভোলেন না, 'আটলান্টা থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত অলিম্পিকে আসা বাংলাদেশের সব সাঁতারুই কিন্তু নেভির। সাঁতারে তাঁদের অনেক অবদান।'
কিন্তু তাঁদের সে পৃষ্ঠপোষকতা বিশ্ব আসরে পারফর্ম করার জন্য যথেষ্ট নয়। তবুও সাগর মনে করেন অলিম্পিক সাঁতারে পদক জেতা সম্ভব, যদি 'কত বড় বড় সাঁতারু আছেন যাঁরা নিজের দেশেই থাকেন না। বিদেশে ট্রেনিং করেন। আমরা যদি ছোটবেলায় প্রতিভাবান কয়েকজন সাঁতারু বাছাই করে ওরকম ট্রেনিংয়ে পাঠাই, তাহলে অবশ্যই সম্ভব।' এখন পর্যন্ত যেটা অলীক কল্পনা। সীমিত সুযোগ-সুবিধা নিয়েই তাই সাগরদের অলিম্পিক নামের মহাসাগরে এসে পড়তে হয়। যে মহাসাগরে শেষের দিক থেকে অনেক ওপরে থাকতে পারা 'একটুখানি পাওয়া' অবশ্যই।

No comments

Powered by Blogger.