জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়-সহিংসতার দুর্গটি অটুট আছে by রায়হান রাইন

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আবারও সন্ত্রাস-সহিংসতার দুর্বিপাকে পড়ল। ইতিমধ্যে আবাসিক হলগুলো খালি করে দেওয়া হয়েছে, ঈদের ছুটি এগিয়ে এনে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। স্থগিত হয়ে গেছে বিভিন্ন অনুষদের ডিন নির্বাচন। ঘটনাগুলো ঘটল খুব দ্রুত।


সন্ধ্যায় একজন শিক্ষার্থীকে কুপিয়ে জখম করা হলো, রাতে অপরাধী ধরতে গেলে ছাত্রদের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধল পুলিশের এবং তারপর ঘটনা গড়াল ঢাকা-আরিচা সড়ক অবরোধ ও অন্যান্য তিক্ত ফলাফলের দিকে।
দৃশ্যমান ঘটনা যেমনই হোক, এমন পরিস্থিতির পেছনের ‘সত্য’ কেবলই জখম আর সংঘর্ষের ভেতরে নেই, এমন ধারণা করা যায়। কয়েকটি বিষয়ের দিকে নজর দেওয়া দরকার, সাবেক উপাচার্যের সময়ে তাঁর সন্ত্রাসী বাহিনীর দ্বারা বিতাড়িত শিক্ষার্থীদের অনেকেই উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনের পর নতুন পরিস্থিতিতে ক্যাম্পাসে ফিরতে শুরু করেছেন। ছুরিকাহত তাহমিদুল ইসলাম লিখন এই ‘ফিরে আসা’ শিক্ষার্থীদের একজন। তাঁদেরই একজন ছিলেন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী জুবায়ের আহমেদ। পরীক্ষা দিতে ক্যাম্পাসে এসে সাবেক উপাচার্যের অনুগত সন্ত্রাসীদের হাতে তিনি নিহত হয়েছিলেন। জুবায়ের নিহত হওয়ার পর সন্ত্রাস-নিপীড়নের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন হলো, এর ফলই হয়তো লিখনের ওপর নির্যাতনের মাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, প্রাণে বেঁচে গেছেন তিনি। কিন্তু শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সন্ত্রাসবিরোধী আন্দোলন বিগত উপাচার্যের গড়ে তোলা সন্ত্রাসের অচলায়তন ভাঙতে পারেনি। আগের মতোই তার শিকড় শক্ত জমিতে প্রোথিত আছে।
আমরা দেখতে পাচ্ছি, ইতোপূর্বে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত ‘ছাত্রলীগ’, বিতাড়নকারী ‘ছাত্রলীগ’, ছাত্রদল ও অন্যান্য ছাত্রসংগঠনের সহাবস্থান ও স্বাধীন অভিব্যক্তির কার্যকর পরিবেশ ক্যাম্পাসে সৃষ্টি হয়নি। একইভাবে উপাচার্য বদলের পর বিভিন্ন দল-উপদলের মধ্যে প্রশাসনিক ক্ষমতার ভারসাম্যও প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। নতুন উপাচার্য সাবেক প্রশাসনের ক্ষমতাকাঠামোকে বহাল রাখলেও উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনের পর অবস্থাটা তাঁর জন্য একই রকমের ‘নির্ভরযোগ্য’ আছে, তা বলা যায় না। ক্ষমতার বিন্যাসের এমন নাজুক পরিস্থিতিতে যেকোনো সময়ে কোথাও থেকে ধস নামা সম্ভব। পরের দিনের ডিন নির্বাচন ছাড়াও সহিংসতার এই ঘটনা আরও একটি পরিস্থিতির ভেতর ঘটছে, সেটি হলো, ইতিমধ্যে সাংস্কৃতিক জোটের ওপর হামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল হয়ে গেছে এবং ১১ আগস্টের সিন্ডিকেট সভায় দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত হওয়ার কথা। এই পরিস্থিতিগুলোই যে সরাসরি সন্ত্রাসের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত, এমন দাবি করা যায় না। কিন্তু সহিংসতার শস্য ফলার জমিটি ছিল এ রকম।
সহিংসতা সংঘটিত হওয়ার পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত কিছু প্রশ্ন অনেকেই তুলছেন, যা বিবেচনার দাবি রাখে। আমরা জানি, বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো আছে। অধ্যাদেশের আওতায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অপরাধী চিহ্নিত করতে পারে এবং তাকে শাস্তি দেওয়ার এখতিয়ারও তার আছে। প্রশ্ন হলো, অপরাধ চিহ্নিত করার নিজস্ব এখতিয়ার থাকা সত্ত্বেও ঘটনার পরপরই কেন পুলিশকে ডাকতে হলো? অনুমতি ছাড়াই যদি ক্যাম্পাসে পুলিশ ঢুকে থাকে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন থাকল কোথায়?
জুবায়ের হত্যাকাণ্ডের পর সন্ত্রাসবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ‘ছাত্রলীগ’র সন্ত্রাসীরা সাংস্কৃতিক কর্মীদের ওপর আক্রমণ করেছিল। সেই ঘটনায় মামলা হওয়ার পরও পুলিশ আজ অবধি কাউকে গ্রেপ্তার করেনি। কিন্তু ডিন নির্বাচনের আগের দিন সহিংসতা ঘটার পরপরই পুলিশ এসেছে এবং আসার পর আত্মরক্ষার্থে তাদের গুলিও ছুড়তে হয়েছে। এই গুলি ছোড়া এবং সাধারণ ছাত্রদের আহত হওয়ার ঘটনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। পুলিশের বেপরোয়া মূর্তি, এমনকি হল খালি করার ঘোষণার পরেও দেখা গেছে, বাড়ি ফেরার উদ্দেশে শিক্ষার্থীরা যখন হল ছেড়ে ক্যাম্পাস থেকে বেরোচ্ছেন, তখনো তাঁরা পুলিশের তোপের মুখে পড়েছেন এবং কেউ কেউ আহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের তানভীর আহমেদের মার খাওয়া পুলিশের প্রতিহিংসাপরায়ণতার নজির।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতির উদ্ভবের পেছনে পুলিশের এই অতি-তৎপরতা অনেকখানি দায়ী। বাস্তবতা এই যে পুলিশকে নিরপেক্ষ ভাবা যাচ্ছে না। সাংস্কৃতিক কর্মীদের ওপর হামলায় তাদের নিষ্ক্রিয়তা এবং বর্তমান ঘটনায় তাদের অতি-তৎপরতা—দুই-ই সন্দেহাত্মক। সাবেক উপাচার্য শরীফ এনামুল কবিরের সময়ে রাশেদ রেজা ডিকেন হত্যাচেষ্টা, জুবায়ের হত্যাসহ অনেক সহিংসতার ঘটনা গুটিকতক সন্ত্রাসীর মাধ্যমে সংঘটিত হলেও তাদের বিরুদ্ধে শাস্তির কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। জুবায়ের নিহত হওয়ার পরেও অভিযুক্তদের অত্যন্ত লঘু শাস্তির স্নেহ প্রদর্শন করা হয়েছিল, পরে আন্দোলনের মুখে হত্যাকারী ও তাদের সহযোগীদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। দীর্ঘকাল ধরে আশকারা পেয়ে আসা এই সন্ত্রাসীরা সহজে তাদের মাঠ ছাড়বে, এমন আশা করা যায় না। এই ভয়ংকর সন্ত্রাসীরা তাদের দলীয় পরিচয়ের কারণেই নিজেদের সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সুরক্ষিত ভাবতে থাকে। তারা আগে থেকেই জানে যে তাদের কিছুই হবে না। নিরাপত্তার এই বোধ নিশ্চয়ই কাউকে বেপরোয়া হওয়ার প্ররোচণা জোগায়।
সাবেক উপাচার্য শরীফ এনামুল কবির ক্ষমতার যে কাঠামো এবং সন্ত্রাস-বৈষম্য-নিপীড়নের যে পরিস্থিতি গড়ে তুলেছিলেন, যার ভেতর দিয়ে জুবায়েরের নিহত হওয়ার শর্তগুলো তৈরি হয়ে গিয়েছিল, সেসব বাস্তবতাকে বর্তমান উপাচার্য সঠিকভাবে ধরতে পেরেছেন, এমন মনে হয় না। তিনি সেটা উপলব্ধি করলে সাবেক উপাচার্যের গড়ে তোলা সন্ত্রাসী সিন্ডিকেটকে ভেঙে দেওয়ার কার্যকর উপায় খুঁজতেন, সেই সঙ্গে আগের উপাচার্যের প্রশাসনিক কাঠামোকে রদবদল করার কথা ভাবতেন। সন্ত্রাসের বাস্তবতার শর্তগুলোকে দূর না করেই অভূতপূর্ব কোনো পরিবর্তন ঘটে যাবে, এমন আশা করা যায় না। শিক্ষকসমাজ জুবায়ের হত্যার পর প্রশাসনিক দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল, তাদের উদ্দেশ্য ছিল, সন্ত্রাস-নিপীড়নের বীজ শিক্ষাঙ্গন থেকে উৎপাটন করা। বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি করা, যা উচ্চশিক্ষার অনুকূল। সাবেক উপাচার্যকে সরে যেতে হয়েছিল—কারণ, তিনি নিজেই ছিলেন শিক্ষকসমাজের দাবিগুলো বাস্তবায়নের প্রধান বাধা। নতুন উপাচার্য শিক্ষকসমাজের দাবিগুলো বাস্তবায়নের উপায় খুঁজতে পারতেন। ক্যাম্পাসকে কাঙ্ক্ষিত একটা রূপে গড়ে তোলার জন্য অনিষ্টকারী শক্তির সঙ্গে লড়াই চলতে পারে, কিন্তু ভিন্ন মতাবলম্বীদের প্রতিপক্ষ চেতনা থেকে দেখলে সমস্যা নিরসন হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় কোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠান নয়, এ ভাবনাটিকে আমরা কার্যকরভাবে ভাবতে চাই। শিক্ষক বা শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিষ্টকারী শক্তি যতই থাকুক, মিলিত চেষ্টায় তদের প্রতিহত করা দুরূহ কিছু নয়।
 রায়হান রাইন: শিক্ষক, দর্শন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

No comments

Powered by Blogger.