পরিচালনা পর্ষদের ক্ষমতা খর্ব করা ঠিক হবে না-গ্রামীণ ব্যাংক আইন সংশোধন

গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যানের ক্ষমতা বাড়িয়ে ‘গ্রামীণ ব্যাংক (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০১২’ নামে যে খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, তা ব্যাংকটির উদ্দেশ্য ও আদর্শের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।


খসড়া আইনে একদিকে চেয়ারম্যানের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে, অন্যদিকে পরিচালনা পর্ষদের ক্ষমতা কমানো হয়েছে। আগের আইনে অনুসন্ধান কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে পরিচালনা পর্ষদের হাতে ন্যস্ত ছিল ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের ক্ষমতা। কিন্তু পরিবর্তিত আইনে সেই বিধান রহিত করে বলা হয়েছে, চেয়ারম্যান পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে ‘পরামর্শ’ করে তিনজনের নাম সরকারের কাছে পাঠাবেন। এতে করে ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের ক্ষমতা কার্যত চেয়ারম্যানের ওপরই ন্যস্ত হলো।
যেকোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক নীতিমালা অনুসরণের পাশাপাশি দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন। সরকার গ্রামীণ ব্যাংককে একটি বিশেষায়িত সরকারি ব্যাংক দাবি করলেও অন্যান্য বিশেষায়িত ব্যাংকের নীতিমালা মানছে না। মনে রাখা প্রয়োজন, ব্যাংকটিতে সরকারের হিস্যা মাত্র ৩ শতাংশ, বাকি ৯৭ শতাংশ মালিকানা এর খুদে ও দরিদ্র গ্রাহকেরা। ব্যাংক পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁদের ভূমিকা খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। আগের আইনে কোনো ত্রুটি থাকলে তা সংশোধন করে আরও উন্নত করা যেত কিংবা পরিচালনা পর্ষদে খুদে বিনিয়োগকারীদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারত। কিন্তু সেসব না করে মন্ত্রিসভা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাতে ব্যাংকটিতে চেয়ারম্যানের একক কর্তৃত্বই প্রতিষ্ঠিত হবে।
গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আইন সংশোধনকে ভুল কাজ বলে অভিহিত করে এ থেকে সরকারকে বিরত রাখার জন্য অনুরোধ জানাতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। মন্ত্রিসভায় গৃহীত আইনটি কার্যকর হলে ব্যাংকটি ধ্বংস হয়ে যাবে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। তাঁর এই আশঙ্কার বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে। গত বছর যখন মুহাম্মদ ইউনূসকে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় তখন বলা হয়েছিল, ব্যক্তিবিশেষের জন্য আইন পরিবর্তন করা যায় না। অথচ সরকার স্বেচ্ছাচারীভাবে গ্রামীণ ব্যাংকের আইন পরিবর্তন করল।
এ ছাড়া মন্ত্রিসভার বৈঠকে সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বেতন-ভাতা নেওয়ার বৈধতা এবং তাঁর অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার আয়কর খতিয়ে দেখতে মন্ত্রিসভা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যে নির্দেশ দিয়েছে, তাতেও ব্যক্তিবিশেষের প্রতি আক্রোশ প্রকাশিত হয়েছে। সরকার দীর্ঘ সময় ধরে দেশে-বিদেশে গ্রামীণ ব্যাংক ও তার প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে যে বৈরিতাপূর্ণ ও বিদ্বেষমূলক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে, মন্ত্রিসভার এ সিদ্ধান্ত তারই ধারাবাহিকতা। এটি দেশ ও জনগণের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনবে না।
সিদ্ধান্তটি মন্ত্রিসভায় গৃহীত হলেও এখনো আইনে পরিণত হয়নি। এ জন্য সংসদ অধিবেশনের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির প্রয়োজন হবে। আশা করি, সরকার সেই পথে পা বাড়াবে না। সরকারের এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত হবে না, যাতে বিশ্বজোড়া সুনাম অর্জনকারী প্রতিষ্ঠানটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

No comments

Powered by Blogger.