দু'জনে দেখা হলো

এ দেশের টিভি নাটকের সফল জুটি আফজাল হোসেন-সুবর্ণা মুস্তাফা। আফজাল হোসেনের লেখা প্রথম নাটক 'জীবনে জীবনে'তে তাদের একসঙ্গে দেখা গেছে। এরপর আফজালের লেখা 'সে', 'নীল চিঠি', 'পারলে না রুমকী' নাটকেও দেখা গেছে তাদের। টিভি ইতিহাসের তুমুল জনপ্রিয় এই জুটি এক যুগ পর আবারও ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেন।


তাদের আড্ডা নিয়ে প্রচ্ছদ লিখেছেন মীর সামী

১৯৭৬ সালে ঢাকা থিয়েটারে যোগ দেন একদল তরুণ অভিনেতা_ আফজাল হোসেন, হুমায়ুন ফরীদি, রাইসুল ইসলাম আসাদ প্রমুখ। হাসি-আনন্দ আর হৈচৈ করেই কেটে যাচ্ছিল তাদের দিনগুলো। একদিন দলের প্রধান নাসির উদ্দীন ইউসুফের মাধ্যমে জানলেন, নতুন একটি মেয়ে অভিনয় করবে। তিনি বিখ্যাত বাবার মেয়ে। মহড়াকক্ষের এক কোণে তরুণরা মিলে মেয়েটিকে নিয়ে আলোচনা করছিলেন। কেমন হবে মেয়েটি? তার সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলা যাবে? ইত্যাদি বিষয়। সবাই ভেবেছিলেন, মেয়েটি টমবয় টাইপের। হয়তো প্যান্ট-শার্ট পরে সাইকেল চালিয়ে আসবে। কিন্তু সবার ধারণা মিথ্যা প্রমাণ করে স্কুল পোশাক পরে পিঠে ব্যাগ চাপিয়ে হাজির মেয়েটি। তিনি বিখ্যাত অভিনেতা গোলাম মুস্তাফার মেয়ে সুবর্ণা মুস্তাফা। ওই বছরেই আনিস চৌধুরীর রচনা ও আতিকুল হক চৌধুরীর প্রযোজনায় 'চেহারা' নাটকের মাধ্যমে টিভিতে প্রথমবার একসঙ্গে অভিনয় করেন ঢাকা থিয়েটারের দুই সহকর্মী আফজাল হোসেন ও সুবর্ণা মুস্তাফা। বিটিভির নাটকটিতে তাদের অভিনয় প্রশংসিত হয়। ফলে পরবর্তী সময়ে তাদের জুটি নিয়ে তৈরি হতে থাকে একের পর এক নাটক। সর্বশেষ এক যুগ আগে অভিনেতা-নির্মাতা তৌকীর আহমেদের পরিচালনায় 'অরণ্যের সুখ-দুঃখ' নাটকে কাজ করেছিলেন তারা। এবার তারা 'প্রেম বাঁচিতে জানে' নামের টেলিছবিতে কাজ করলেন। রাজধানীর ইউটিসি ভবনের রূপসজ্জা কক্ষের এক চেয়ারে বসে আছেন আফজাল হোসেন। সকাল থেকেই কোমরে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করছেন। তাই নড়াচড়া না করে ঠায় বসে আছেন তিনি। কিছু সময় পর এসে হাজির সুবর্ণা মুস্তাফা। তার চোখের প্রশংসা করে আফজাল হোসেন বললেন, 'সুর্বণা, একটু দাঁড়া তো, ভালো করে দেখি। তোর চোখ দুটো দেখতে একেবারেই তোর মায়ের মতো।'
সুবর্ণা : হ্যাঁ। অনেকটা সে রকমই। বুবার [গোলাম মুস্তাফা] সঙ্গে আম্মার আগের কিছু ছবি দেখছিলাম। সেগুলো বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তোলা। আফজাল, তুই বিশ্বাস করবি না, দেখলে মনে হবে যেন আমিই দাঁড়িয়ে আছি!
নন্দন : এতদিন পর আবারও দু'জন অভিনয় করছেন। কেমন লাগছে?
আফজাল : এখন আর কাজ করে বেশি আনন্দ পাই না। এতে কাজ করার অন্তরালের বিষয় হলো, পরিচালক আরিফ খান অনেকদিন ধরেই পেছনে লেগে ছিলেন। এ ছাড়া আমার আর সুবর্ণার অনেকদিন ধরে কোনো কাজ করা হয় না। তাই ভাবলাম, করি একটা। অনেকদিন পর বন্ধুর সঙ্গে অনেকটা সময় কাটানো যাবে। এই ভেবে কাজটি করা।
সুবর্ণা : এই নাটকের কাজ হওয়ার কথা ছিল তিন বছর আগে। আফজালের সময় ফাঁকা না থাকায় এতদিন ধরে এর কাজ করা হয়নি। এছাড়া চলতি মাসের শেষ দিকে আমরা বদরুল আনাম সৌদের রচনা ও পরিচালনায় একটি নাটকের কাজ করব।
আফজাল : সুবর্ণা, মনে আছে তোর, আমি আর তুই আনিস চৌধুরীর রচনা ও আতিকুল হক চৌধুরীর প্রযোজনায় 'চেহারা' নাটকে অভিনয় করি_ সেই সময়ের কথা? তখন সাত দিন ধরে মহড়া করতে হতো একটি নাটকের জন্য। এতদিন মহড়া করার পরও সর্বোচ্চ সম্মানী পেতাম ১৯০০ টাকা।
সুবর্ণা : আসলে তখন কেউ টাকার জন্য অভিনয় করত না। অভিনয়টাকে সবাই ভালোবাসত।
আফজাল : সত্যিই তখন ভালোবাসা থেকেই কাজগুলো হতো। এখনকার মতো নয়। এখন তো সবকিছুতেই বাণিজ্যিক বিষয়টি ঢুকে পড়েছে। মজার ব্যাপার কী_ তুই জানিস, এখন যে কাউকে যদি তুই অভিনয় করতে বলিস, তো সে আগে টা কা-পয়সার হিসাব কষে তারপর কাজ করতে আসবে।
নন্দন : পর্দায় আপনাদের রসায়ন নিয়ে বলুন?
আফজাল : 'চেহারা' নাটক দিয়েই কিন্তু আমরা মানুষের কাছে বেশি পরিচিতি পাই। যদিও সুবর্ণাকে মানুষ আগে থেকেই চিনত গোলাম মুস্তাফার মেয়ে হিসেবে। আমার আগেই সে টিভিতে অভিনয় করেছে। 'চেহারা'র আগে দু-একটি নাটকে অভিনয় করলেও ঠিক সেভাবে দর্শকরা চিনতে পারেনি তাকে। ওর মতো আমাকেও দর্শক চিনতে শুরু করে 'চেহারা' নাটক দিয়েই।
সুবর্ণা : আমাদের মাথায় কখনও জুটি বিষয়টি ঢোকেনি। কখনও চিন্তাও করিনি এ নিয়ে।
আফজাল : আমি সুবর্ণার সঙ্গে একমত। আমরা জুটি হিসেবে নিজেকে ভাবিনি, আর চেষ্টাও করিনি। লেখকরা আমাদের নিয়ে ওভাবে লিখতেন, প্রযোজকরা অভিনয় করাতেন, মানুষ দেখে পছন্দ করত। পরে বুঝেছি, ইচ্ছে করলেই যে জুটি তৈরি করা যায়, তা কিন্তু না। কারণ অনেকেই একসঙ্গে অনেকদিন ধরেই অভিনয় করেছেন, কিন্তু জুটি হয়নি।
সুর্বণা : আমরা পরিকল্পনা করে জুটি গড়িনি। তখন দর্শকরা আমাদের অভিনীত নাটকগুলো বেশ উপভোগ করেছেন।
আফজাল : এবার একটু কলকাতার কথা বলি। সত্যজিৎ রায়, শম্ভুু মিত্র, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, উত্তম কুমারসহ ওদের কত অলঙ্কারই না ছিল। তারা যখন মারা গেলেন, ভেঙেচুরে পড়ার কথা ছিল সব। কিন্তু তারপরও তারা আবার এগিয়ে যেতে থাকলো।সুবর্ণা : আমার অবাক লাগে, উত্তম কুমার মারা যাওয়ার পর কলকাতা চলচ্চিত্র শিল্পের মুখ থুবড়ে পড়ার মতো অবস্থা হয়েছিল।
আফজাল : তখন বাংলাদেশি নির্মাতারা গিয়ে ওদের চলচ্চিত্র শিল্পকে আবার দাঁড় করালো।
সুবর্ণা : হ্যাঁ, 'বেদের মেয়ে জোসনা', 'বাবা কেন চাকর'_ বাংলাদেশের এমন কয়েকটি ছবি কলকাতায় পুনরায় তৈরি হয়েছে।
আফজাল : তাহলে বোঝ_ ওরা সেখান থেকে আজ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এখন তাদের ওখানে দুই ধরনের ছবি তৈরি হচ্ছে। একটাকে বলা হয় প্যারালাল মুভি। এতে থাকে সুন্দর গল্প আর নির্মাণ। অন্যটি হলো বাণিজ্যিক ছবি। যেহেতু কলকাতায় আমার মামার বাড়ি, সেহেতু ছোটবেলায় দেখেছি, ওখানকার মেয়েরা অনেক সুন্দরী। আর আমাদের এখানকার ছেলেরা অনেক ভালো ছিল। কিন্তু এখন ওদের মেয়েদের পাশাপাশি ছেলেরাও অনেক আধুনিক হয়েছে। আর আমরা এখানে কী করলাম, কী হলো!
সুবর্ণা : ভারতের ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেল খুব বেশি সময় নিয়ে দেখতে পারি না। এতে অনেক সহিংসতা থাকে। অনেকের মুখেই শুনি, তারা নাকি ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ছাড়া আর কোনো চ্যানেল দেখেন না। একটা হরিণকে একটা বাঘ টেনেহিঁচড়ে খেয়ে ফেলছে_ এমন নৃশংস দৃশ্য দেখার কী হলো বুঝতে পারি না। হ্যাঁ, বন্যপ্রাণীর টিকে থাকার বিষয়টি জানি। কিন্তু...
আফজাল : হ্যাঁ, কিন্তু একটা বিষয় আছে। এমনও দেখেছি, তুইও দেখে থাকবি; একটা খুব দুর্লভ মাছ। বিশাল একটা জঙ্গল থেকে তাকে খুঁজে বের করা হয়েছে। সেই মাছটাকে নিয়ে সুস্থ করে তার জন্য একটা উৎসব করে তাকে আবার জলের মধ্যে ফিরিয়ে দিয়ে এলো। তখন মনে হয়, মানুষের মমত্ব, স্নেহ ইত্যাদি আছে।
সুবর্ণা : আফজাল, তুই দেখ। আমি 'সীমান্ত' আর 'গহীনে' ধারাবাহিক দুটিতে কাজ করলাম_ তখন অনেকেই আমাকে বলেছে, আমি নাকি গ্রামের নাটক বেশি করি। শহুরে নাটক করি না কেন। এটা শুনে সৌদ [বদরুল আনাম সৌদ] বলে, 'শহুরে নাটক না, এগুলোকে বলো ঘরের ভেতরের নাটক!'
আফজাল : ওসব বাদ দিয়ে আমার একটি কথা শুনতে তোর নির্মম লাগবে। হয়তো আপত্তিও ঠেকবে। কিন্তু এটা বাস্তবতা। তোর প্রজন্মের পর শমী-বিপাশা [শমী কায়সার ও বিপাশা হায়াত] পর্যন্তই কিন্তু শেষ। তারপর কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শিক্ষিত কোনো মেয়ের চরিত্রে কাউকে নিতে চাইলে আমি কী করব? কাউকে তো পাই না।
সুবর্ণা : আমার নজরে দু'জন আছে_ বন্যা আর প্রীতি [বন্যা মির্জা ও সানজিদা প্রীতি]।
আফজাল : নাটক পরিচালনা করা এখন খুব কঠিন। আমার ক্ষেত্রে কিছু অদ্ভুত অদ্ভুত ঘটনা হয়। একবার এক অভিনেতা কোট পরে এসে দাঁড়াল। তখন আমার মনে হলো, গোলাম মুস্তাফার যুগ শেষ হয়ে গেছে। তার মতো সব অভিনেতারই অভিনয়ের আগে একটা উপস্থিতি দরকার। একটা মানুষকে কোট পরিয়ে দিলেই কিন্তু হবে না, দৃশ্যের মধ্যে ঢুকতে হবে চরিত্রের মধ্য দিয়ে। আমার দেশে যখন দেখি এই চরিত্রে অভিনয় করার মতো কোনো মানুষ নেই, তখন আমি কী গল্প পরিবেশন করব? এটা দুঃখজনক। সুবর্ণা, তোরা কীভাবে করছিস জানি না। বাইরে থেকে যখন দেখি, তখন তা কেন হচ্ছে উত্তর খুঁজে পাই না।
সুবর্ণা : আফজাল, আমি একবার একটি নাটক দেখতে বসলাম। নায়ক-নায়িকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। কিন্তু সারাক্ষণই তারা গাছের তলায় বসে প্রেম করছে। তাদের কি আর কাজ নেই? একটা ছেলে বা মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে। সে যতই গুণ্ডা বা বদমাশ হোক, তাকে তো কিছুটা হলেও লেখাপড়া করতে হচ্ছে। ক্লাস তো করতে হবে, নাকি?
আফজাল : আরেকটা কথা বলি। তুই চিন্তা করে দেখ, যারা প্রেমের নাটক করে, তারা কি প্রেম বোঝে? এর জন্য দায়ী পত্রিকাগুলোও।
সুবর্ণা : আগে টেলিভিশন নাটকের সমালোচনা করতেন জাহানারা ইমাম। চিন্তা করে দেখ আফজাল। ওনার কাছে কোনো নাটক ভালো না লাগলে কিন্তু বলে দিতেন। শুধু তা-ই নয়; কীভাবে তৈরি করলে আরও ভালো হতো তা নিয়েও পরামর্শ দিতেন। আমরা অনেক ভাগ্যবান, আবদুল্লাহ আল মামুন, আতিকুল হক চৌধুরী, নাসির উদ্দীন ইউসুফকে পেয়েছি; যারা আমাদের অভিনয় শিখিয়েছেন। আমরা শিখতে পেরেছি। এখন তো আর সেটা নেই। এখন তুমি যে দৃশ্যেই অভিনয় করো না কেন, সেটাই খুব ভালো। এখন আমার বিচারক আমি নিজেই। আমার জন্য আমার চেয়ে ভালো বিচারক আর কেউ নেই।
আফজাল : মানুষের মধ্যে মৌলিকত্ব বলে একটা বিষয় আছে। আমরা যেহেতু একসঙ্গে মঞ্চে কাজ করতাম, মহড়া শেষে সুবর্ণাকে বাসায় দিয়ে আসতাম। তখন 'বরফ গলা নদী' নামের একটি ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করছিল ও। ওকে বাসায় দিয়ে এসে রাতে টিভিতে নাটকটি দেখছিলাম। বিশ মিনিট আগ পর্যন্ত যার সঙ্গে ছিলাম, সে অভিনয় করছে। তার অভিনয় দেখে আমি কাঁদছি। কোনো দর্শকদের ক্ষেত্রে এটা এখন ঘটে? ঘটে না। পুরনো একটা নাটকের যে কোনো ফ্রেম দেখলে এখনও বসে থাকা যায়। আর এখনকার নাটকের ফ্রেম কী হয়?
সুবর্ণা : অনেক রাশভারি কথা হলো। এবার আমার একটা মজার গল্প 'পারলে না রুমকি'। আমাদের বন্ধু দিপা দাসের মা আমাকে হাত ধরে টেনে রান্নাঘরে নিয়ে গিয়ে বললেন, 'এত জিদ ভালো না মা, সংসারে এত জিদ ভালো না।' তখন আমি বলি_ 'মাসি মা, টিভির নাটক ছিল।' এবার তিনি বললেন, 'না, তারপরও সংসারে এত জিদ ভালো না।' [হাসি]
আফজাল : সুবর্ণা, কয়েকদিন আগে জহিরউদ্দিন পিয়ারের পুরনো একটা নাটক দেখাচ্ছিল, কাজী নজরুল ইসলামের লেখা। টিভি স্টুডিওতে তাঁবুটাবু, যুদ্ধক্ষেত্র বানিয়ে। তখন খুব ভালো নাটক ছিল।
সুবর্ণা : মনে পড়েছে_ 'হাসনা হেনা'।
আফজাল : টেলিভিশনের ওই ছোট স্টুুডিওতে পাহাড়, যুদ্ধক্ষেত্র, বেদুইনদের বসতি_ পুরো বিষয়টাই তৈরি হতো। মাঝে একটু দেখলাম। টেলিভিশন বাদ দাও, কিছুদিন আগে আমি 'নবাব সিরাজউদ্দৌলা' ছবিটি দেখছি। হার্ডবোর্ডের সেট, তবুও মানুষ সেটা প্রাণভরে উপভোগ করেছে। কারণ এতে মানুষের হৃদয় ছিল। 'সাত ভাই চম্পা' দেখেছি। গাছের মধ্যে কাগজের সাদা ফুল লাগিয়ে 'সাত ভাই চম্পা জাগো রে' গানের সঙ্গে নায়িকা ঠোঁট মেলাচ্ছে। কিন্তু সেগুলো মিথ্যা মনে হয় না কেন? কারণ বিশ্বাসটা মানুষের মনে।
সুবর্ণা : শাবানা আপা একটি চলচ্চিত্রের গানে ঠোঁট মিলিয়েছেন_ 'শুধু গান গেয়ে পরিচয়'। আমরা দেখেছি ব্যাকড্রপে কালো কাপড় ঝুলছে। তাতে কিছু আসে যায় না। এখন ছবির অবস্থা আরও খারাপ। গত কয়েকবারের মতো এবারও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জুরি বোর্ডে ছিলাম। এ দেশে এই সময়ের সেরা নায়ক শাকিব খান ছবিপ্রতি ৩৫ লাখ টাকা নেয় শুনেছি। এতে আমি খুশি, আমাদের দেশের একজন নায়ক তার পারিশ্রমিক ৩৫ লাখ টাকা নিচ্ছে। তবে একটি ছবির দৃশ্যে সে বাড়ি খুঁজছে। বাড়ির ঠিকানা লেখা কাগজটা তার হাতে। এরপর জুম করে বাড়ির দেয়ালে সেই ঠিকানা মিলিয়ে নিচ্ছে। আশ্চর্য! আফজাল, তুই জানিস, কম্পিউটারের প্রিন্ট দেওয়া কাগজ দেয়ালে লাগানো। তাহলে বোঝ! আমাদের নাটকের বাজেট অনেক কম। তারপরও কোনো বাড়ির ঠিকানা যদি দেখাতে হয়, তাহলে আমরা বাড়ির একটি নামফলক তৈরি করে দেয়ালে রাখি।
নন্দন : এখনকার টিভি নাটক নিয়ে বলুন।
সুবর্ণা : এখনকার সব টিভি নাটকই যে ভালো হচ্ছে না, তা কিন্তু নয়। এখন নাটকের বাজেট অনেক কমে গেছে। একটি নাটকে খুব বেশি হলে দুই অথবা তিনজন প্রধান পাত্র-পাত্রী নেওয়া হয়। আর বাকিদের অনেক কম টাকায় একেবারে নতুন নেওয়া হয়। আরেকটি কারণ হলো, এখন অনেক টিভি চ্যানেল বলে দিচ্ছে_ এই অভিনয়শিল্পীদের নিন। আফজাল, তুই দেখ, এখন এমনও আছে, একজন এক দিনে চারটি নাটকের কাজ করছে।
আফজাল : ধর, আমাদের দেশের যেসব ছেলে ক্রিকেট খেলছে, আমাদের চেয়ে ওদের বয়স অনেক কম। কিন্তু আমরা তাদের আলাদা একটা সম্মান করি। কেন? কারণ তারা নিজেদের একটা জায়গায় নিয়ে গেছে। তারা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা গ্রহণ করছে। তুমি সুবর্ণা, তোমাকে আমি সম্মান করি কেন? তোমার গুণের জন্য। দর্শক আর অভিনয়শিল্পীর মধ্যে পার্থক্য হলো_ আমি এটা পারি না, ও ওটা পারে; তাই আমি তাকে অবাক হয়ে দেখি। দুঃখজনক হলেও বলতে হচ্ছে, এখন রাস্তা থেকে ধরে এনে অভিনয় করানো হচ্ছে। আর গণমাধ্যমগুলো তাদের বড় বড় স্থিরচিত্র ছাপে। টিভি চ্যানেলে পা নাচাতে নাচাতে যখন তারা সাক্ষাৎকার দেয়, তখন মনে হয় আত্মহত্যা করি! আমার কপাল ভালো যে, নিয়মিত অভিনয় করি না। আরে ভাই, কাজের তো একটা সম্মান আছে। আমি অভিনয় করি_ এটা বলা যে কত মর্যাদার, সেটা এখন নাই। সুবর্ণা, তুইও নাটকে অভিনয় করিস, অন্যদিকে আরও নতুন কয়েকজন এসে বলল_ আমিও পঞ্চাশটা নাটকে অভিনয় করেছি; তাহলে তফাৎটা কোথায়? পৃথিবীতে একজন অভিনেতাকে যে সম্মান দেখানো হয়, আমাদের দেশে সেটা নেই। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে যদু-মধুরা অভিনয় করতে পারে না। ভারতের অনেক অভিনেতা বা পরিচালক সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন। এটা কেন? কারণ যখন একজন সহকারী হিসেবে কাজ করে, তখন সে মানুষকে ছোট করে দেখে না। আর কাজটাও শিখতে পারে। কোনো কাজই ছোট না। একেবারে শুন্য থেকে শিখে কাজটা করতে হবে। তাহলেই মানুষের প্রতি সম্মানবোধটা তৈরি হবে।
সুবর্ণা : পুরনো দিনের একটা কথা বলি। একবার আফজালের সঙ্গে মোটরসাইকেলে চড়ে ফিরছিলাম। আফজাল এমনভাবে চালিয়েছে যে, পেছন থেকে আমি রাস্তায় পড়ে গেছি। কিন্তু আফজাল টের পায়নি। অনেকদূর চলে যাওয়ার পর সে বুঝতে পারে পেছনে আমি নেই। মোটরসাইকেল ঘুরিয়ে কাছে এসে কোথায় ব্যথা পেয়েছি কি-না জিজ্ঞাসা করবে, তা না করে আফজাল আমাকে বলছে_ 'তুই পড়ে গেছিস কেন?' কী আশ্চর্য, তুই পড়ে গেলি!' ভাগ্যিস তখন এখনকার মতো ট্রাফিক ছিল না।
আফজাল : সেই সময়ের দিনগুলো এখন গল্প-উপন্যাসের মতো মনে হয়। হ
 

No comments

Powered by Blogger.