সাফল্যের মূলে ॥ শ্রেণী কক্ষে নিয়মিত পাঠদানে নিশ্চয়তা, সচেতন অভিভাবক by বিভাষ বাড়ৈ

যেন মাধ্যমিকের সঙ্গে পাল্লা দিয়েই এগোচ্ছে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের সাফল্য। গেল এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার পর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলেও পাসের হার, জিপিএ-৫ প্রাপ্তি থেকে শুরু করে সকল সূচকেই ঘটল ইতিবাচক পরিবর্তন। এইচএসসিতে গ্রেডিং পদ্ধতির প্রথম বছর ২০০৩ সালে জিপিএ-৫ পেয়েছিল মাত্র ২০ জন।


আর এবার পদ্ধতির ১০ বছরের মাথায় সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬১ হাজার ১৬২ জনে। এবার পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতে ইতিহাসের সকল রেকর্ড ভেঙ্গে গেছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানেই জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে একুশ হাজার ১৯৩ জন। পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও কমেছে ফেল করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা। বেড়েছে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও। এদিকে ভাল ফলের কারণ খুঁজছে সকলেই। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রেণীকক্ষে নিয়মিত শিক্ষা নিশ্চিত করা, হাওড়-বাঁওড়, চরাঞ্চলসহ দুর্গম অঞ্চলের প্রায় ৫ হাজার পিছিয়ে পড়া প্রতিষ্ঠানের ওপর বিশেষ নজর, শিক্ষক প্রশিক্ষণ জোরদার, ইংরেজী, গণিত, বিজ্ঞান ও একমাত্র সৃজনশীল বিষয় বাংলায় ভাল ফলই ঈর্ষণীয় সাফল্যের এই চিত্র।
এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় গ্রেডিং পদ্ধতির প্রথম বছর ২০০৩ সালে মাত্র ২০ জনের জিপিএ-৫ প্রাপ্তি এবং এবারের বিশাল সংখ্যাই বলে দেয় ফলাফলের বিশাল পার্থক্যের একটি চিত্র। ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গ্রেডিং পদ্ধতি চালুর চালুর পর থেকে প্রায় প্রতিবছরই বাড়ছে পাসের হার। পাসের হারের দিকে দুয়েক বছর ব্যতিক্রম হলেও জিপিএ-৫ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে তেমন ঘটেনি, বরং প্রতিবছরই হু হু করে বাড়ছে এই সংখ্যা। এবার গ্রেডিং পদ্ধতিতে দশমবারের মতো অনুষ্ঠিত এইচএসসি ও সমানের পরীক্ষায় পাসের হার যেমন বেড়েছে, তেমনি জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যাও রেড়েছে পাল্লা দিয়ে। দেশের সার্বিক ফলাফলের এই চিত্রকে সাধারণভাবে ইতিবাচক বলেই মনে করা হচ্ছে। এদিকে সাফল্য যতই হোক উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে ভর্তিতে মোট আসনে কোন ধরনের সঙ্কট হবে না বলেই স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। তবে ভাল মানের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা সীমিত হওয়ায় কাক্সিক্ষত প্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপক প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হবে মেধাবীরা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা বোর্ড এবং বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য পরিসংখ্যান ব্যুারো (ব্যানবেইজ) জানিয়েছে, নামী দামী কিছু প্রতিষ্ঠানে ভর্তির চাপ থাকলেও সারাদেশের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন নিয়ে চিন্তার কোন কারণ নেই। ফলাফল নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার পাসের হার থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতির পেছনে কাজ করেছে বেশ কিছু বিষয়। ভাল করার বিষয়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, বোর্ডগুলোর প্রচারণামূলক কার্যক্রম এবং কঠোর পদক্ষেপও এবারের ভাল ফলের নতুন রেকর্ড করার পেছনে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে বলে মনে করছেন শিক্ষা বোর্ডগুলোর চেয়ারম্যান, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, সেরা স্কুলের প্রধানরা ও পরীক্ষকরা। এছাড়াও আছে ইংরেজী, গণিত ও বিজ্ঞানে পাসের হার বৃদ্ধি। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশের যে কোন পাবলিক পরীক্ষায় খারাপ ফলের পেছনে সব সময় মুখ্য ভূমিকা পালন করে ইংরেজী, বিজ্ঞানের বিষয়গুলোর খারাপ ফল। কিন্তু এবার ইংরেজীতে পাস করেছে ৮৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ। গত বছর যেখানে ইংরেজীতে পাসের হার ছিল ৮২ দশমিক ৮৯ শতাংশ। এর আগের বছর ছিল ৭৮ দশমিক ২১ শতাংশ। বিজ্ঞানের বিষয়গুলোর পাসের হারও প্রায় একই। গত বছর পাদার্থবিজ্ঞানে পাসের হার ছিল ৮৩ শতাংশ, এবার পাস করেছে ৮৬ দশমিক ৮৫ শতাংশ। ২০১০ সালে পদার্থ বিজ্ঞানের পাসের হার ছিল ৮৩ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ, তার আগের বছর ছিল ৭৭ শতাংশ। রসায়নে গত বছর পাসের হার ছিল ৮৫ শতাংশ, আর এবার রসায়নে পাস করেছে ৮০ দশমিক ৭৩ শতাংশ পরীক্ষার্থী। অন্যদিকে উচ্চ মাধ্যমিকে এবারই প্রথম বাংলা প্রথমপত্রের (নিয়মিত ও প্রাইভেট) পরীক্ষা সৃজনশীল পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রথমবারের মতো সৃজনশীল হওয়ায় কিছুটা ভীতি থাকলেও শেষ পর্যন্ত ভয়কে জয় করেছে পরীক্ষার্থীরা। গত বছর প্রচলিত পদ্ধতিতে যেখানে পাস করেছে ৮৭ দশমিক ২৮ শতাংশ, এবার সেখানে সৃজনশীল পদ্ধতিতে পরীক্ষা দিয়ে পাস করেছে ৯৯ দশমিক শূন্য চার শতাংশ শিক্ষার্থী। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ শিক্ষার্থীদের সাফল্যের কারণ হিসাবে বললেন, এবার ফলের সকল সূচকেই ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে। এর জন্য শিক্ষার্থীদের প্রচেষ্টা অন্যতম। তবে শ্রেণীকক্ষে নিয়মিত শিক্ষা নিশ্চিত করার এবং হাওড়-বাঁওড়, চরাঞ্চলসহ দুর্গম অঞ্চলের চার হাজার ৮০০ পিছিয়ে পড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর বিশেষ নজর দেয়ার কারণে পুরো ফলে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে। এছাড়া শিক্ষক প্রশিক্ষণ জোরদার, ইংরেজী, বিজ্ঞান ও একমাত্র সৃজনশীল বিষয়ের ভাল ফল পাল্টে দিয়েছে পুরো চিত্র। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফাহিমা খাতুন বলেছেন, ইংরেজী, গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে পাসের হার বৃদ্ধি ভাল ফলের অন্যতম কারণ। এছাড়া ভাল ফল করতে আমরা কঠোর অবস্থান নিয়েছিলাম। প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত শিক্ষা নিশ্চিত করতে চেয়েছিলাম। কুমিল্লা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক কুন্ড গোপী দাসের মতে, অভিভাবকরা এখন সন্তানদের পড়াশোনার বিষয়ে অনেক বেশি সচেতন হয়েছে। তবে এবার বোর্ডগুলোর মনিটরিং ব্যবস্থা অনেক বেশি ছিল। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকরা বলেছেন, ক্লাসে পাঠদান উন্নত করতে, প্রতিটি অধ্যায় পড়ানোর পরই পরীক্ষা নেয়া, দুর্বল ছাত্রদের বাড়তি নজর দেয়ার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি পদক্ষেপ নিতে প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।
এদিকে অন্য অনেক কারণ থাকলেও কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যায় পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সকল শিক্ষক ও কর্মকর্তাই মনে করেন, গত কয়েক বছর ধরেই খাতা মূল্যায়নে শিক্ষকদের প্রতি কিছৃুটা উদার মনোভাব দেখানের মৌখিক একটা নির্দেশনা থাকে। শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানরাও বিষয়টিকে স্বীকার করলেন, তবে কেউ নাম প্রকাশ করে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হলেন না। তাঁরা বলেছেন, সরাসরি না বলা হলেও খাতা মূল্যায়নের সময় শিক্ষার্থীর প্রতি সর্বোচ্চ উদারতা দেখানোর জন্য শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান থাকে। যার একটা ইতিবাচক প্রভাব পরে শিক্ষার্থীদের ফলাফলে। পরীক্ষকরা মনে করেন, শিক্ষার মানের উন্নয়নে সরকারের নানা উদ্যোগের সঙ্গে খাতা মূল্যায়নে কিছুটা উদার মনোভাব যোগ হওয়ায় সাফল্য বাড়ছে ধারাবাহিকভাবে। তবে কিছুটা উদারভাবে পরীক্ষা নেয়া এবার উদারভাবে খাতা মূল্যায়নের কারণে ধারাবাহি ভাবে মাদ্রাসার ফল বেশি ভাল হচ্ছে। এবারও যার ব্যতিক্রম হয়নি। ১০ বোর্ডের পাসের হার যেখানে ৭৮ দশমিক শূন্য ৬৭ শতাংশ, সেখানে এবার মাদ্রাসায় পাসের হার ৯১ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
এদিকে জানা গেছে, আসন সঙ্কটের কারণে নয় বরং ভাল মনের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্কটের কারণেই এইচএসসিকে ভাল ফল করেও অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী পছন্দের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি নিয়ে সমস্যায় পড়বে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইজ) অনুযায়ী দেশের উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে কোন আসন সঙ্কট নেই। শিক্ষামন্ত্রীও ঘোষণা দিয়েছেন কৃতকার্যদের ভর্তির সঙ্কট হবে না। এছাড়া একই ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ে একই সঙ্গে ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার উদ্যোগ প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, গত বছরও একই ধরনের প্রতিষ্ঠানে একই সঙ্গে গুচ্ছ পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু সকল বিশ্ববিদ্যালয় ইতিবাচক সাড়া দেয়নি। এবারও বিষয়টি নিয়ে ভাবা হচ্ছে। আশা করি এবার আরও বেশি প্রতিষ্ঠান এতে সাড়া দেবে। শীঘ্রই ভর্তির বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তবে একই সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের সিদ্ধান্ত মেনেই কাজ করে। আমরা সেখানে হস্তক্ষেপ করতে বা কিছু চাপিয়ে দিতে পারি না।

No comments

Powered by Blogger.