অভিমত-সুদমুক্ত ঋণ ঘরে ঘরে চাই by আলী নিয়ামত

দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক অর্থাৎ ৮ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। এর মধ্যে প্রায় ৪ কোটি মানুষ হতদরিদ্র বা নিঃস্ব পর্যায়ের মানবেতর জীবনযাপনে অভ্যস্ত। খাদ্য, বস্ত্র, আশ্রয়, বাসস্থান, স্বাস্থ্য এবং শিা থেকে তারা বঞ্চিত। অথচ এদের মুক্তির জন্যই ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।


অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া যে কোন দেশের স্বাধীনতা অর্থহীন_ এ কথা আমরা জানি, মানি না, বুঝি না, বুঝতে চাই না?
রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব ও কর্তব্য ওসব অসহায়, হতদরিদ্র মানুষের তাঁদের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করা। স্বাধীনতাপ্রাপ্তির ৩৯ বছরের যাত্রায় দেশের কোন সরকার, শাসক গোষ্ঠীই এ পবিত্র দায়িত্ব পালন করতে সমর্থ হয়নি। এ জন্য স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপশক্তি যতটা না দায়ী, তার চেয়ে ঢের বেশি দায়ী বা অপরাধী আমরা নিজেরা, যারা স্বাধীনতার সকল সুযোগসুবিধা ভোগ করে, লুণ্ঠন করে, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের সকল মূলমন্ত্রকে অবদমিত করে, অবেহলা ও অবজ্ঞা করে নিজেদের ভাগ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি, মানমর্যাদা এবং প্রতিষ্ঠার সর্বোচ্চ উন্নয়ন ঘটিয়েছি। পাহাড়সম অট্টালিকা গড়ে, শিল্প প্রতিষ্ঠান তৈরি করে দরিদ্র মানুষ এবং দারিদ্র্যকে ব্যবহার করে, তাঁদের ভাগ্যের চাকা পরিবর্তন না করে নিজেদের সুপ্রতিষ্ঠিত করেছি দেশে-বিদেশে। এবং রাজনীতি, ধর্মনীতি, জঙ্গীবাদ, সন্ত্রাস ইত্যাদিতে বিশেষ অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছি।
সমাজ উন্নয়ন, শিল্প, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর মতায়ন ইত্যাদির মহা প্রকল্প গ্রহণ করে লাখ হাজার কোটি টাকা বিদেশ থেকে এনেছি, দেশ থেকে লুটপাট করেছি_পদ, পদবি, সম্মান, ডিগ্রী, পদকসহ আরও শত শত অর্জন ছিনিয়ে এনেছি।
এত কিছুর পরও আগেই বলেছি, দেশে আজও এই মুহূর্তে ৮ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে।
বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের অর্থমন্ত্রী একজন ভাষাসৈনিক, মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি তাঁর মমত্ববোধ, ভালবাসা পরীতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিষয়ে এক সময়ের তুখোড় ছাত্র। বিএ সম্মান এবং এমএতে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকারী তিনি। পরে অর্থনীতি বিষয়েও এমএ ডিগ্রীধারী (ঢাবি)। এবং পর পর দু'দুবার দেশের দ্বিতীয় মতাধর ব্যক্তিত্ব, অর্থমন্ত্রী। তাই তাঁর কাছে দেশ ও জাতির প্রত্যাশা অনেক, সেটাই স্বভাবিক।
শুরু থেকেই অর্থাৎ অর্থমন্ত্রী বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি যেভাবে দেশ-বিদেশে সমুন্নত রেখে চলেছেন, তা বলার অপো রাখে না। মতার অনেকটাই কাছাকাছি বরাবরই ছিলেন। আছেন তিনি। কিন্তু সততার অস্ত্রে সজ্জিত থাকার কারণে দুনর্ীতি নামক শব্দটি আজও তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। তাঁর প্রথম সাহসী উচ্চারণ, 'দেশের ৩ কোটি দরিদ্র মানুষ আজ ঋণের জালে বন্দী আছে।' এই উপলব্ধি এবং সত্য কথাটি তাঁকে আমার কাছে, আমার মতো সচেতন অনেকের কাছেই আরও বেশি গ্রহণযোগ্য এবং বিশ্বস্ত করে তুলেছে।
তাঁরই সুনির্দেশনায় এবং ব্যবস্থাপনায় অর্থনীতিবিদ জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবুল বারকাত দরিদ্রদের সুদমুক্ত ঋণ দানে এগিয়ে এসেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর আরেক দেশবরেণ্য অর্থনীতিবিদ গরিবের বন্ধু বলে খ্যাত ড. আতিউর রহমান হাজার হাজার কোটি টাকা প্রকাশ্যে নামমাত্র সুদে (২%) গরিবদের (কৃষক) মাঝে স্কুল মাঠে মাঠে বিতরণ শুরু করেছেন দেশজুড়ে।
এঁদের দেখাদেখি দেশের অন্যতম শিল্প প্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা গ্রুপও কয়েকটি গ্রামে হাজার হাজার হতদরিদ্র মানুষকে সুদমুক্ত ঋণ দিয়ে উন্নয়নমূলক কাজে এগিয়ে এসেছে। জাতিসংঘের 'ইউএনডিপির' কর্মকর্তারা এ কাজের জন্য সরাসরি বসুন্ধরা কার্যালয়ে গিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
সরকারের পাশাপাশি বেসরকারী একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের এই মহতী মানবদরদী উদ্যোগ ও সুদমুক্ত ঋণ কার্যক্রম স্বাধীনতাপ্রাপ্তির ৩৯ বছরের যাত্রায় দেশের জন্য একটা অনেক বড় দৃষ্টান্ত। অনেক বড় আশা ও ভরসার উৎস। টিআইবির জরিপ মতে দেশে বর্তমানে ৬৩ হাজার কোটিপতি আছেন (২০০৮)। অনুমান করতে পারি, দেশে আরও ৫০ লাধিক লাখপতি রয়েছেন। এরা প্রত্যেকেই যদি নিজ নিজ গ্রামে একটি করে সুদমুক্ত ঋণ প্রকল্প শুরু করেন গরিব হটাতে, দারিদ্র্য দূর করতে, সেটিই হবে কাজের কাজ। আর এই কাজ এবং কার্যক্রম অর্থাৎ সুদমুক্ত ঋণ প্রদানের মাধ্যমে যদি উলি্লখিত ৮ কোটি মানুষ পর্যায়ক্রমে ঘুরে দাঁড়াতে পারেন, তবে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যমতে, আগামী ২০২১ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ দাতাদেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে সুপ্রতিষ্ঠিত হবেই। আর যারা এ যাবতকালে (২০০৯ পর্যন্ত) ২০-৪০% সুদ নিয়ে দেশ থেকে 'দারিদ্র্য' তাড়াবার স্বপ্ন দেখে আসছেন, তাদের জন্য উপরোক্ত উদ্যোগ, কার্যক্রম একটা বড় ধরনের ধাক্কা, শিা হবে। তাদের তখন পালিয়ে বাঁচতে হবে। নয়ত তাদের লুণ্ঠিত সব অর্থ, সম্পদ, ব্যবসাবাণিজ্য ওইসব মানুষকে ফিরিয়ে দিতে হবে_ স্বেচ্ছায় বাংলাদেশে মানসম্মান নিয়ে বাস করতে হলে আমি ব্যক্তিগতভাবে এবারের ইংরেজী নববর্ষে এ প্রত্যাশাই করছি, সবাইকে তা করতেও বিনীত আহ্বান জানাচ্ছি। কারণ, আমার ৪৭ বছরের জীবনে আমি যা দেখেছি, বুঝেছি এবং উপলব্ধি করেছি তা থেকেই এটা আমার কাছে স্পষ্ট হয়েছে_ দরিদ্র মানবের রক্তখেকো ওই দানবদের দিন বদলের সময় এসেছে, তাদের অাঁস্তাকুড়ে যেতেই হবে। জননেত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ মানেই তাই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা, অন্য কিছু নয়। আর সোনার বাংলা মানেই ুধামুক্ত বাংলাদেশ, শোষণমুক্ত বাংলাদেশ, নিররমুক্ত বাংলাদেশ, দুনর্ীতিমুক্ত ও সন্ত্রাসমুক্ত বাংলাদেশ, রাজাকার ও জঙ্গীমুক্ত বাংলাদেশ, যুদ্ধাপরাধীমুক্ত বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের খুনীমুক্ত বাংলাদেশ, জাতীয় ৪ নেতা হত্যাকারীমুক্ত বাংলাদেশ। _সবাইকে নববর্ষের শুচ্ছো।
লেখক : সাংবাদিক, সংগঠক এবং উন্নয়ন কমর্ী

No comments

Powered by Blogger.