শেষ হলো ’৭১-এর নাট্যোৎসব

দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা নাট্যদল ও নাট্যপ্রেমীদের স্বরূপ উপস্থিতি ছিল গত ১৪ দিন। এই উৎসবে গত ১৪ দিনে মঞ্চায়িত হয় একশ’ দুটি নাটক। উৎসবের দশম দিনে মঞ্চে মঞ্চায়িত হয় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ নাট্যদল ঢাকার নাটক ‘রাজারবাগ ৭১।’ ওইদিন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর ৩টি মিলনায়তই ছিল নাট্যাৎসবে ভরপুর।


ঢাকার মেট্রোপলিটন পুলিশ নাট্যদল পরিবেশনায়, রচনা ও নির্দেশনায় মান্নান হীরা, পৃষ্ঠপোষক বেনজীর আহমেদ বিপিএম কমিশনার, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সার্বিক সহযোগিতায়, রাজারবাগের পুলিশ অভিনেতা-অভিনেত্রী ঘড়ির কাঁটায় রাত ৮টায় কৌতূহলী জনসম্মুখে তুলে ধরলেন নাটক ‘রাজারবাগ ৭১’-এর সংলাপ। ১৯৭১ সালের ২৫ মে মার্চ রাত মানব জাতির ইতিহাসে এক কলঙ্কময় অধ্যায়। ভয়াল এ রাতে পাকিস্তানী দখলদার বাহিনী অতর্কিত বাংলার নিরস্ত্র জনতার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা নির্বিচারে হত্যা করে নারী, শিশু, পথচারীসহ হাজার হাজার নিরীহ মানুষ, জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেয় বাড়িঘর, দোকানপাট। তাদের ঐ পৈশাচিকতার প্রথম টার্গেট ছিল রাজারবাগ পুলিশ লাইনস। ভারি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত শক্তিশালী পাক সামরিক বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্যের সামনে পিছু না হটে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের বীর পুলিশ সদস্যরা সেকেলে থ্রি নট থ্রি রাইফেল দিয়ে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সম্মুখ যুদ্ধে। সূচনা হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রতিরোধের ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে রচিত নাটক ‘রাজারবাগ ৭১।’ আমাদের মহান স্বাধীনতা অর্জনে বাংলাদেশ পুলিশের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকাকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে নাটকের দর্শকবৃন্দ। ‘রাজারবাগ ৭১’ নাটকটি ইতিহাস আশ্রিত তবে নাটকের প্রয়োজনে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা কল্পনাশ্রয়ী ঘটনা। নাটকের পর্বে পর্বে ছিল করতালি আবার কখনোবা নীরবতা। বিন্দুমাত্রও অসহ্য বা হতাশ হয়নি আমন্ত্রিত দর্শক। উৎসবের এগারোতম দিবসে জাতীয় নাট্যশালায় জেলা শিল্পকলা একাডেমী সিরাজগঞ্জ মঞ্চায়ন করে নাটক ‘ক্ষোভ’, এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে শূন্যন এর ‘লালজমিন’, সরকারি হরগঙ্গা কলেজ মুন্সিগঞ্জ ‘জল মহলায় নীল সমাধি’, স্টুডিও থিয়েটার হলে সরকারি বৃন্দাবন কলেজ, হবিগঞ্জ ‘যুদ্ধ এবং জয়িতারা’, জয়পুরহাট সরকারি কলেজ, জয়পুরহাট ‘ভূতকেত্তন’, গুরুদয়াল সরকারি কলেজ, কিশোরগঞ্জ ‘প্রমথন’, জাতীয় সংগীত ও নৃত্যকরা কেন্দ্র মিলনায়তনে স্বপ্নদল, ঢাকা ‘স্বাধীনতার সংগ্রাম’, বরগুনা সরকারী কলেজ, বরগুনা ‘তোড়’, শরীয়তপুর সরকারী কলেজ, শরীয়তপুর ‘রাত্রি শেষে যাত্রী’। উৎসবের তেরতম দিনে জাতীয় নাট্যশলায় থিয়েটার (বেইলী রোড), ঢাকা ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার জেলা শিল্পকলা একাডেমি, চট্টগ্রাম ‘বধ্যভূমি ফয়’স লেক’, স্টুডিও থিয়েটার রাঙ্গামাটি সরকারী কলেজ, রাঙ্গামাটি ‘একটি সূর্যের জন্য’, লক্ষ্মীপুর সরকারী কলেজ, লক্ষ্মীপুর ‘দিন বদলের পালা’, নোয়াখালী সরকারি কলেজ, নোয়াখালী ‘পূর্ব বাংলা ডট দেশ’, জাতীয় সঙ্গীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্র মিলনায়তন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা সরকারী কলেজ, নাটোর ‘কলম কলঙ্ক’, সুনামগঞ্জ সরকারী কলেজ, মৌলভীবাজার ‘বাংলা মায়ের ছেলে’ ও সানফ্লাওয়ার স্কুল এ্যান্ড কলেজ সৈয়দপুর, নীলফামারি ‘ক্ষমা নেই’ মঞ্চায়িত হয়। তবে এ নাট্যোৎসবে যতগুলো নাটক মঞ্চায়িত হয়েছে সব নাটকই আলোচনায় আসেনি। পূর্বে যেসব নাটক দেখেছি সেসব নাটকে যুদ্ধের সংবাদ আছে, নারী ধর্ষণের চিত্র অঙ্কনের জন্য উন্মাদনা আছে, দশর্ক জনপ্রিয়তার জন্য সর্বস্ব সংলাপ আছে। কিন্তু স্বাধীনতার ঊষালগ্নে বাংলা, উর্দু সংলাপে রচিত চিৎকার, স্লোগান ও বক্তৃতানির্ভর এসব নাটকে শৈল্পিক পরিমিতিবোধ বা শিল্পকুশলতা দুর্লঙ্ঘ। স্বাধীনতার উন্মাদনা ও উচ্ছ্বাস হ্রাস পেতে থাকলে এসব নাটকও ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় বিস্মৃতির অতল গহ্বরে। তবু এরই মধ্যে কয়েকটি শিল্পিত নাটকের নাম স্বাধীনতার রক্তাক্ত দলিল হিসেবে স্মরণযোগ্য। যেমন মমতাজ উদদীন আহমদের ‘স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা’, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম, বর্ণচোরা; মামুনুর রশিদের পশ্চিমের সিঁড়ি; নিলীমা ইবরাহীমের যে অরণ্যে আলো নেই; আলাউদ্দিন আল আজাদের বেতার নাটক নিঃশব্দে যাত্রা, নরকে লাল গোলাপ প্রভৃতি। মুক্তিযুদ্ধকে অবলম্বন করে মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পরবর্তীকালে অনেক মঞ্চসফল ও শিল্পঋদ্ধ নাটক রচিত হয়েছে।
খ. এনামুল হক মুকুল

No comments

Powered by Blogger.