ক্যামেরা ট্রায়ালে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে দুই নারীর সাক্ষ্য ও জবানবন্দী যুদ্ধাপরাধী বিচার

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদানকারী দুই ভুক্তভোগী নারীর জবানবন্দী ও জেরা শেষ হয়েছে। আরেকজনের জবানবন্দী দেয়ার কথা থাকলেও তার মার অসুস্থতার কারণে তিনি আসতে পারেননি।


আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে দুই ভুক্তভোগী নারী সাক্ষী তাদের জবানবন্দী প্রদান করেছেন।
এদিকে ক্যামেরা ট্রায়ালে সাধারণত সামরিক আদালতে গোপন বিচার অনুষ্ঠিত হয়। জনমনে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে সে বিষয়ে প্রসিকিউটরবৃন্দ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এই ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে সাক্ষী তার জবানবন্দী ও সাক্ষ্য প্রদান করতে পারেন। এটা আইসিটি আইনে করা হয়েছে। এদিকে জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের জামিন আবেদন আবারও নাকচ করে দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। একই ট্রাইব্যুনালে মাওলানা দেলওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলায় তদন্ত কর্মকর্তার জেরা অব্যাহত রয়েছে।
এই প্রথম কোন মহিলা সাক্ষীর জবানবন্দী গ্রহণ করল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। তাও আবার ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে। চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমের জবানবন্দী নেয়া হয়। পরে তাদের জেরা করেন কাদের মোল্লার আইনজীবী একরামুল হক। ট্রাইব্যুনাল এ মামলার কার্যক্রম আগামী ২৩ জুলাই সোমবার পর্যন্ত মুলতবি করেন।
এই প্রথমবারের মতো একজন সাক্ষী ক্যামেরা ট্রায়ালে ট্রাব্যুনালে সাক্ষ্য দিলেন। ক্যামেরা ট্রায়াল চলাকালে সেখানে সাংবাদিক এবং সাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। মঙ্গলবার প্রসিকিউটর নুরজাহান বেগম মুক্তা সাংবাদিকদের বলেন, আজ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য দিন। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্যাতিত সেই নারীদের মধ্যে একজন ট্রাইব্যুনালে তার নির্যাতনের কাহিনী বর্ণনা করেছেন। এ সাক্ষ্যগ্রহণ এদেশের নারীদের জন্য একটি মাইলফলকের সৃষ্টি করেছে।
তিনি বলেন, এই সাক্ষ্যের ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালের আদেশ অনুযায়ী গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে এজলাস কক্ষে যা হয়েছে তা বলা যাবে না। এ সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ বর্বরোচিত বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন এই প্রসিকিউটর। মঙ্গলবার সকালে কাদের মোল্লাকে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। ১২ জুলাই প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালে তাদের নাম দেয়। এরপর ট্রাইব্যুনাল ১৭ জুলাই মঙ্গলবার সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য করে দেয়।
সাক্ষীকে জেরা করার সময় প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের তিনজন করে মোট ছয়জন আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন দুজন। তারা হচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধা মোজাফফর আহম্মেদ খান ও মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল হক মামা। পরে আসামিপক্ষ তাদের জেরা করেছে। কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের ৬টি ঘটনায় গত ২৮ মে অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল-২। একটি মামলায় তাকে ২০১০ সালের ১৩ জুলাই গ্রেফতার করা হয়। পরে ট্রাইব্যুনালে তদন্তকারী সংস্থার এক আবেদনের প্রেক্ষিতে ওই বছরের ২ আগষ্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আটক রাখার আদেশ দেয়া হয়।
ক্যামেরা ট্রায়াল কি ?
ক্যামেরা ট্রায়াল আবার কি? এটা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন থাকতে পারে। বিশেষ করে সামরিক আদালতে গোপন বিচারের সময় এ ধরনের ক্যামেরা ট্রায়াল হয়ে থাকে। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে ক্যামেরা ট্রায়াল। এটা নিয়ে অনেকেই ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে পারে। বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরবৃন্দ পরিষ্কার করে দিয়েছেন। এটা আইনসিদ্ধ বিষয়।
প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী বলেছেন, কোন মানুষের নিরাপত্তা, সম্মান, সম্ভ্রমের বিষয় থাকলে এটা (ক্যামেরা ট্রায়াল) হয়। এটার সঙ্গে সামরিক আদালতের ক্যামেরা ট্রায়ালের কোন সম্পর্ক নেই। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনেই এর বিধান করা হয়েছে।
প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলী বলেছেন, বর্তমান আইসিটি এ্যাক্টের ১০(৪) ধারায় বলা হয়েছে, কোন নির্যাতিত মহিলা জনসস্মুখে প্রকাশ হতে ইচ্ছুক নন। নিরাপত্তা, গোপনীয়তা, পারিবারিক এবং ব্যক্তিগত মর্যাদার বিষয় বিবেচনা করে এটা করা হয়েছে। আইসিটি এ্যাক্টের ১০(৪) এ ক্যামেরা ট্রায়ালের বিধান রাখা হয়েছে। কাজেই কেউ এই বিষয়টি নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই।
প্রসিকিউটর নুরজাহান বেগম মুক্তা বলেছেন, ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে যে সব সাক্ষী জবানবন্দী ও সাক্ষ্য দিয়েছেন তা সাংবাদিকদের সামনে বলা যাবে না। এটা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এ্যাক্টের ১০(৪) ধারায় সন্নিবেশিত করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এ প্রথম দুই মহিলা তাদের জবানবন্দী ট্রাইব্যুনালে প্রদান করলেন। পরে আসামি পক্ষের আইনজীবী তাদের জেরাও করেছেন। ক্যামেরা ট্রায়াল নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারবে না। কারণ এটি আইনেই রয়েছে।
গোলাম আযম ॥ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতারকৃত জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের জামিন আবেদন আবারও নাকচ করে দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। বুধবার চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিমের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ এই আদেশ দেন।
আদেশে বলা হয়, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামিনের কোনে বিধান নেই। এ ছাড়া মামলার এ পর্যায়ে জামিন দেয়া সম্ভব নয়। পবিত্র রমজান মাসে জামাতে তারাবি নামাজ আদায় করতে ও এতেকাফ পালনে তিনি কারা কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে পারেন।
আসন্ন রোজায় জামায়াতে তারাবির নামাজ পড়া ও এতেকাফ করার জন্য মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনালে এই জামিনের আবেদন করেন গোলাম আযম। যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত জামায়াত নেতা গোলাম আযম গত ১১ জানুয়ারি থেকে কারা হেফাজতে রয়েছেন। ১৩ মে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। তাকে রাখা হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে প্রিজন সেলে।
সাঈদী ॥ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতারকৃত জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা দেলওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোঃ হেলালউদ্দিনের জেরা অব্যাহত রয়েছে। বুধবার ৩২তম দিনের মতো তাকে আসামিপক্ষের আইনজীবী জেরা করা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাব্যুনালে-১। আজ আবার তাকে জেরা করা হবে।
চেয়ারম্যান বিচারপতি মোঃ নিজামুল হক নাসিমের নেতৃত্বাধীন ৩ সদস্যের ট্রাইব্যুনালে তদন্ত কর্মকর্তা মোঃ হেলালউদ্দিনকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী মিজানুল ইসলাম। ৮ এপ্রিল থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত সাঈদীর বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন সাক্ষ্য দেন ট্রাইব্যুনালে। এর পর ২৫ এপ্রিল থেকে তাকে জেরা করছেন আসামিপক্ষ।
অসুস্থ অবস্থায় বর্তমানে ইব্রাহিম কার্ডিয়াক (বারডেম) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সাঈদীর অনুপস্থিতিতেই তার বিচার কার্যক্রম চলছে। অসুস্থতার কারণে তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়নি। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুন দেলওয়ার হোসাইন সাঈদীকে তার রাজধানীর শহীদবাগের বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়। এর পর তাকে ২ আগষ্ট মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়।

No comments

Powered by Blogger.