চালচিত্র-রাজনৈতিক ক্রান্তিলগ্নে সরকারের দক্ষতা-সততা কি প্রশ্নবিদ্ধ! by শুভ রহমান
সার্বিক অবস্থাদৃষ্টে বিশ্লেষক ও সচেতন দেশবাসীর অনেকের মনে এমন একটি ধারণা বদ্ধমূল হয়ে যাচ্ছে, যেন দেশ একটা রাজনৈতিক ক্রান্তিলগ্নে এসে দাঁড়িয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার বর্তমান মেয়াদের তিন বছর পূর্তির মুখে এসে কয়েকটি ইস্যুতে যেন তার ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলছে। সেগুলো হচ্ছে পদ্মা সেতু, শিরশ্ছেদের ঘটনা_এ রকম কয়েকটি স্পর্শকাতর বিষয়।
আর ঠিক সে সময়ই দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি তার মৌলবাদী শরিকদের নিয়ে রোডমার্চের পর রোডমার্চ করে সরকারের নাজুক অবস্থাকে তাদের ক্ষমতার স্বার্থে কাজে লাগানোর জন্য যেন মরিয়া হয়ে উঠেছে। সিলেট অভিমুখে অনুষ্ঠিত তাদের প্রথম রোডমার্চ সরকারের পূর্ণ সহযোগিতায় মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ও সফল হওয়ার পর তারা স্বাভাবিকভাবেই উৎসাহিত হয়ে উঠেছে। এবার বগুড়া হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ অভিমুখে দ্বিতীয় রোডমার্চের প্রাক্কালে তারা বলেছে, এই রোডমার্চ হবে সরকারের জন্য 'সতর্কবার্তা'। সরকার নাকি জনগণের চোখের ভাষা পড়তে পারেনি। ওদিকে মহাজোট সরকারের খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই মনে হচ্ছে এবার শক্ত অবস্থান নিয়ে ফেলেছেন। রোডমার্চের উদ্দেশ্য যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করা_এমন কথা তিনি আগেও বলেছেন। এবার রোডমার্চে এত গাড়ি কিভাবে কোথা থেকে এল, তার খবরাখবর নেওয়া হচ্ছে বলে শাসিয়েছেন। আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেন, রোডমার্চ নয়, সংসদ মার্চ করুন। আজ বৃহস্পতিবার সংসদ বসছে, বিএনপি সংসদে যাচ্ছে না। অন্যদিকে বিরোধী দল আগেই রোডমার্চে বাধাদানের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে রেখেছে।
লক্ষণীয়ভাবেই ঠিক এ সময় জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আগামী নির্বাচনে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়ে মহাজোট থেকে একটা পৃথক সুবিধাবাদী অবস্থান গ্রহণ করতে চাইছেন। রাজনৈতিক ক্রান্তিকালে তাঁর এই ঘোষণাকে বিশ্লেষকরা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন।
সচেতন মানুষ লক্ষ করছে, কয়েকটি বড় ইস্যুতে যেমন শাসক মহাজোট একটা আপাত নাজুক অবস্থায় পড়েছে, তেমনি অন্যদিকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মহাজোট সরকারের আমলে নাজুক বা হতাশাব্যঞ্জক অবস্থা আবার কেটে যেতেও শুরু করেছে। যেমন_গত শনিবারের কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে বাজার পরিস্থিতির একটা আশাব্যঞ্জক উন্নতির কথা বলা হয়েছে। দ্য ইনডিপেনডেন্টের মার্কেট রিভিউয়ের শিরোনাম হচ্ছে, 'ভেজিটেবলস প্রাইসেস ডাউন, রাইস স্টেবল'। ওই শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে : শুক্রবার নগরীর কাঁচাবাজারে কাঁচামরিচ ও চিনিসহ শাকসবজির দাম কমে এসেছে। শুক্রবার নিউ মার্কেট ও পলাশী কাঁচাবাজারে প্রতি কেজি কাঁচামরিচ ১২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, যা আগের সপ্তাহে ছিল ২০০ টাকা। আর চিনি প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ৬০-৬২ টাকা দরে, আগের সপ্তাহে যা ছিল ৬৫-৬৮ টাকা কেজি। সব রকম মাছের দামই নগরীর কাঁচাবাজারে কমেছে। মিহি মিনিকেট চাল আগের সপ্তাহের মতোই প্রতি কেজি ৪৫-৪৬ টাকায় বিক্রি হয়েছে। মোটা চাল বিক্রি হয়েছে প্রতি কেজি ৩০ টাকায়। একই তারিখের কালের কণ্ঠের বাজারদরের প্রতিবেদনেও বাজারদর হ্রাসের সমর্থন পাওয়া যায়। শিরোনাম হচ্ছে : 'কমতির দিকে সবজির দাম'। উল্লেখ্য, আগের সপ্তাহগুলোয় ৫০-৬০ টাকার নিচে সবজি নেই বলে একটা আর্তরবই ধ্বনিত হচ্ছিল ঢাকার বাজারে। লক্ষণীয়, মূল্যহ্রাসের ওই প্রবণতা এখনো বজায় রয়েছে। এই বাজারদরের সঙ্গে আমরা স্বস্তিদায়ক আরো দু-একটি সংবাদ উদ্ধৃত করছি। ওই তারিখের কালের কণ্ঠের প্রথম পৃষ্ঠায় আছে 'মঙ্গা তাড়িয়ে আগাম নবান্ন' শীর্ষক একটি প্রতিবেদন। 'শনিবারের সুসংবাদ' উপশিরোনামে এতে বলা হয়েছে : "উত্তরাঞ্চলের কৃষকের ঘরে ঘরে চলছে আগাম নবান্ন উৎসব। মাত্র তিন বছর আগের চিরায়ত পদ্ধতিতে বোনা আমন ধান কার্তিকের মঙ্গা আর দীর্ঘ উপবাস শেষে কৃষকের ঘরে উঠত। সে সময় কাজের খোঁজে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়তেন লাখ লাখ কৃষি শ্রমিক। এখন সেই কষ্টের দিন শেষ হয়েছে। আগাম জাতের বিনা-৭ ও ব্রি-৩৩ ধান বদলে দিয়েছে উত্তরাঞ্চলের চিরচেনা মঙ্গা আর দুর্ভিক্ষের গানের সুর 'ও তুই কিসোত গোসা (অভিমান) হলু রে/নাল (লাল) বাজারের চ্যাংড়া (তরুণ) বন্ধু রে।' মাঠে সারিবদ্ধভাবে ধান কাটার পাশাপাশি এ গান গাইছিলেন একদল কৃষক।" প্রতিবেদনে এবার আগাম জাতের ধান উত্তরাঞ্চলের আবাদি জমির মোট ৪০ শতাংশে বোনা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। শনিবার আরেকটি সুসংবাদ দিয়েছে দৈনিক সমকাল। সে পত্রিকার 'সুখী মুশাপুর' শিরোনামের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে : 'এখানে অনাচার আর হিংসা-বিদ্বেষ বলতে কিছু নেই। ঘটে না কোনো সহিংসতা বা দাঙ্গা-হাঙ্গামার ঘটনা। মাদক সেবন বা মাদক ব্যবসা বলতে কী বোঝায়, তাও তারা জানে না। আর অভাব-অনটনও পিছু ছেড়েছে। গ্রামটির গরিব মানুষের দুই বেলা খাবার আজ নিশ্চিত। অনেকের অবস্থা সচ্ছল। সারা দিনের পরিশ্রম শেষে তারা রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমায়। আরো সফল দেশের কথা ভাবতে পারে।'
বাজারের এই আশাব্যঞ্জক হাল, এই মঙ্গা বিজয়ের কথা, এই সুখী মুশাপুরের মানুষের চোখে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন_এসব পরিবর্তন তো এই মহাজোট আমলেরই বাস্তব চিত্র। একে তুচ্ছ করা তো মূঢ়তারই নামান্তর। এসব ক্ষেত্রে সূচিত পরিবর্তনকে স্থায়ী করতে হলে দরকার একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক সংসদ আর গোটা সমাজের গণতন্ত্রায়ণ ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন।
দেশে সত্যিকার একটি গণতান্ত্রিক সরকার থাকলেই মঙ্গা বিজয়, সুখী মুশাপুর, জাতীয় শিক্ষানীতি চালুর মাধ্যমে শিক্ষা সংস্কারের মতো সব স্থায়ী পরিবর্তন আসতে পারে।
কিছুকাল আগে, গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর এ কলামে 'কারা যেন সব নিভিয়ে দিচ্ছে আশার আলো' শিরোনামের লেখাটিতে আমরা বলেছিলাম : 'গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির যে দুঃসহ কষ্ট মানুষ ভোগ করে আসছে, তা দূর করার বাস্তব সম্ভাবনা দেখতে পেয়ে এখন শেষ ধৈর্যটুকু ধরতে প্রস্তুত। এর মধ্যে আরো সব আশাব্যঞ্জক ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে। শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার জন্য জাতিসংঘ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাকে জাতিসংঘের অন্যতম দাপ্তরিক ভাষার মর্যাদা দেওয়ার জন্য সাধারণ পরিষদে বাংলায় দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলিষ্ঠ বক্তব্য দিয়েছেন। তা ছাড়া ২০১৫ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্য হ্রাস, জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা, পরিবেশ রক্ষাসহ জাতিসংঘঘোষিত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলস, সংক্ষেপে এমডিজি) অর্জনে সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রীর বলিষ্ঠ ভূমিকা মার্কিন প্রেসিডেন্টসহ ব্যাপকভাবে বিশ্বসম্প্রদায়ের ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেছে।...দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা বিদ্যুৎ ও গ্যাস উৎপাদনের ক্ষেত্রে নতুন এবং বড় রকম আশাব্যঞ্জক ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে। বাপেঙ্রে সফল উদ্যোগের ফলে সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার সংযোগস্থলে নতুন গ্যাসক্ষেত্র (সুনেত্রা) পাওয়ার খবর দেশকে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট মোকাবিলার ক্ষেত্রে নতুন ভরসা জুগিয়েছে। আবার একই সঙ্গে ফেঞ্চুগঞ্জ ও সালনা গ্যাসক্ষেত্রে নতুন কূপ খননের সরকারি নীতিগত সিদ্ধান্ত, শ্রীকাইল ও সুন্দরপুরেও বাপেঙ্রে কূপ খননের পরিকল্পনা এবং গ্যাসক্ষেত্রগুলো সংলগ্ন বাপেঙ্রে এ-জাতীয় আরো নতুন নতুন কূপ খননের উদ্যোগ দেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে বড় রকম ভূমিকা রাখবে।...'
আমাদের আশাবাদ যে অত্যন্ত বাস্তব ছিল, তা ইতিমধ্যে রশিদপুরে বাপেঙ্রে উদ্যোগে আরো নতুন গ্যাসক্ষেত্র চিহ্নিত করা এবং গ্যাসকূপ খননের উদ্যোগ গ্রহণের মধ্য দিয়েই প্রমাণিত হচ্ছে।
বস্তুত গ্যাসই সেই অলৌকিক জাদুদণ্ড, যা এ দেশের দুঃখ-দুর্দশা ও দারিদ্র্য মোচন করে মানুষকে উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথ দেখাবে। মহাজোট সরকারের আমলে বাপেঙ্রে এ রকম উদ্যোগ থেমে নেই। একে সব রকম অবকাঠামোগত সহায়তা দান এবং সে ক্ষেত্রে সব আমলাতান্ত্রিক বাধা অপসারণে সরকারকে যথাসময়ে প্রয়োজনীয় তাগিদ দেওয়ার ও প্রয়োজনীয় সতর্কবাণী উচ্চারণের দেশপ্রেমিক কর্তব্যটি প্রচারমাধ্যম সচেতনভাবেই করে চলেছে।
আমরা তো দেখছি, একই সঙ্গে অন্য যেসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সোনালি সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হচ্ছে, যেমন_পাটের জেনোম উদ্ভাবন, বন্ধ পাটকলগুলো চালু করা, পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধি, জাহাজ নির্মাণ শিল্পের বিকাশ ঘটানোর মধ্য দিয়ে সমুদ্রগামী জাহাজ নির্মাণ এবং উন্নত পাশ্চাত্য দেশের কাছে তা বিক্রি_এ রকম আরো উল্লেখযোগ্য সব সাফল্য অর্জিত হয়েছে মহাজোট সরকারের আমলেই। জাহাজ নির্মাণ শিল্প দেশের বৃহত্তম রপ্তানিমুখী শিল্প খাত হতে পারে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত হয়েছে।
পদ্মা সেতু
আজ পরিশেষে দেশের যোগাযোগব্যবস্থায় বৈপ্লবিক একটা পরিবর্তন সূচিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে। এ সেতু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, যোগাযোগ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি_সব ক্ষেত্রেই বিপ্লব ঘটিয়ে দেবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা প্রায় বাস্তবায়নের মুখে এসে দুর্নীতি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের কিছু অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অচলাবস্থায় নিক্ষিপ্ত হয়েছে। অর্থমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী দুজনই সে অভিযোগের সন্তোষজনক নিষ্পত্তিতে উদ্যোগী হয়েছেন এবং দেশবাসীকে আশ্বস্ত করছেন, এ অচলাবস্থা কেটে যাবে। বলছেন, এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়, 'এটা সাময়িক'। বস্তুত অতীতে যা ঘটেনি, সরকারের আন্তরিক উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে জাইকা, এডিবি, বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু নির্মাণে অর্থায়ন করবেই, এটাই বিশ্ববাস্তবতা।
আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপ আমাদের হাতে নেই, কিন্তু আমাদের হাতে পদ্মা সেতু থাকলে, বাপেঙ্রে উদ্যোগে সম্পূর্ণ দেশি প্রযুক্তিতেই গ্যাসকূপ খনন ও গ্যাস উত্তোলন নিশ্চিত হলে, পাটের জেনোম কাজ লাগিয়ে উন্নতমানের পাট উৎপাদন ও বিশ্ববাজারে তার প্রবেশ নিশ্চিত করতে পারলে প্রদীপের দৈত্যটাকে তো আমরা হাতের মুঠোয়ই পাব। দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার শক্তি থাকবে আমাদের হাতের মুঠোয়ই। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের পক্ষে তার ডিজিটাল বাংলাদেশ ও ২০২১ সালের ভিশন বাংলাদেশ বা রূপকল্প বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য অর্জন তখন আদৌ কল্পনাপ্রসূত ব্যাপার থাকবে না_তা হবে অত্যন্ত বাস্তব।
শিরশ্ছেদের ঘটনা
এরই মধ্যে সৌদি আরবে আট বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ নিয়ে যে অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যা সরকারের ভাবমূর্তি ম্লান করতে উদ্যত হয়েছে, হাইকোর্টের একটি রুলের সন্তোষজনক নিষ্পত্তির মাধ্যমে তারও সন্তোষজনক নিষ্পত্তি ঘটবে বলেই দেশবাসীর প্রত্যাশা।
বস্তুত দেশের প্রধান বিরোধী দল সরকারের বিভিন্ন সম্ভাবনা ও অর্জনের প্রতি চোখ বন্ধ করে যে রোডমার্চ করছে, তা কিছুতেই দেশবাসীকে তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত ও আশ্বস্ত করার মতো কোনো কার্যক্রম হতে পারে না। রোডমার্চ মহাজোট সরকারের ওপর ব্যর্থতার দোষারোপ করে তাকে ক্ষমতা ত্যাগের যে সতর্কবার্তা দিতে চাইছে, তার কোনো যুক্তি দেশবাসী খুঁজে পাবে বলে আমরা মনে করি না। তবে দেশ যে এ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে একটি রাজনৈতিক ক্রান্তিকালে এসে দাঁড়িয়েছে, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না। দেশবাসীর সামনে আজ অগি্নপরীক্ষা, তারা কোন পক্ষ অবলম্বন করবে_সব সম্ভাবনা দুই হাতে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে একটা শূন্যতার মধ্যে, একটা লক্ষ্যহীনতার মধ্যে ঝাঁপ দেবে, নাকি মহাজোট সরকার দেশের যেসব সোনালি সম্ভাবনার দুয়ার উন্মুক্ত করে দিয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়নের জন্য সংঘবদ্ধ ও সংগঠিতভাবে সর্বশক্তি দিয়ে তার সমর্থনে সবেগে মাথা তুলে দাঁড়াবে।
লক্ষণীয়ভাবেই ঠিক এ সময় জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আগামী নির্বাচনে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়ে মহাজোট থেকে একটা পৃথক সুবিধাবাদী অবস্থান গ্রহণ করতে চাইছেন। রাজনৈতিক ক্রান্তিকালে তাঁর এই ঘোষণাকে বিশ্লেষকরা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন।
সচেতন মানুষ লক্ষ করছে, কয়েকটি বড় ইস্যুতে যেমন শাসক মহাজোট একটা আপাত নাজুক অবস্থায় পড়েছে, তেমনি অন্যদিকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মহাজোট সরকারের আমলে নাজুক বা হতাশাব্যঞ্জক অবস্থা আবার কেটে যেতেও শুরু করেছে। যেমন_গত শনিবারের কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে বাজার পরিস্থিতির একটা আশাব্যঞ্জক উন্নতির কথা বলা হয়েছে। দ্য ইনডিপেনডেন্টের মার্কেট রিভিউয়ের শিরোনাম হচ্ছে, 'ভেজিটেবলস প্রাইসেস ডাউন, রাইস স্টেবল'। ওই শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে : শুক্রবার নগরীর কাঁচাবাজারে কাঁচামরিচ ও চিনিসহ শাকসবজির দাম কমে এসেছে। শুক্রবার নিউ মার্কেট ও পলাশী কাঁচাবাজারে প্রতি কেজি কাঁচামরিচ ১২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, যা আগের সপ্তাহে ছিল ২০০ টাকা। আর চিনি প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ৬০-৬২ টাকা দরে, আগের সপ্তাহে যা ছিল ৬৫-৬৮ টাকা কেজি। সব রকম মাছের দামই নগরীর কাঁচাবাজারে কমেছে। মিহি মিনিকেট চাল আগের সপ্তাহের মতোই প্রতি কেজি ৪৫-৪৬ টাকায় বিক্রি হয়েছে। মোটা চাল বিক্রি হয়েছে প্রতি কেজি ৩০ টাকায়। একই তারিখের কালের কণ্ঠের বাজারদরের প্রতিবেদনেও বাজারদর হ্রাসের সমর্থন পাওয়া যায়। শিরোনাম হচ্ছে : 'কমতির দিকে সবজির দাম'। উল্লেখ্য, আগের সপ্তাহগুলোয় ৫০-৬০ টাকার নিচে সবজি নেই বলে একটা আর্তরবই ধ্বনিত হচ্ছিল ঢাকার বাজারে। লক্ষণীয়, মূল্যহ্রাসের ওই প্রবণতা এখনো বজায় রয়েছে। এই বাজারদরের সঙ্গে আমরা স্বস্তিদায়ক আরো দু-একটি সংবাদ উদ্ধৃত করছি। ওই তারিখের কালের কণ্ঠের প্রথম পৃষ্ঠায় আছে 'মঙ্গা তাড়িয়ে আগাম নবান্ন' শীর্ষক একটি প্রতিবেদন। 'শনিবারের সুসংবাদ' উপশিরোনামে এতে বলা হয়েছে : "উত্তরাঞ্চলের কৃষকের ঘরে ঘরে চলছে আগাম নবান্ন উৎসব। মাত্র তিন বছর আগের চিরায়ত পদ্ধতিতে বোনা আমন ধান কার্তিকের মঙ্গা আর দীর্ঘ উপবাস শেষে কৃষকের ঘরে উঠত। সে সময় কাজের খোঁজে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়তেন লাখ লাখ কৃষি শ্রমিক। এখন সেই কষ্টের দিন শেষ হয়েছে। আগাম জাতের বিনা-৭ ও ব্রি-৩৩ ধান বদলে দিয়েছে উত্তরাঞ্চলের চিরচেনা মঙ্গা আর দুর্ভিক্ষের গানের সুর 'ও তুই কিসোত গোসা (অভিমান) হলু রে/নাল (লাল) বাজারের চ্যাংড়া (তরুণ) বন্ধু রে।' মাঠে সারিবদ্ধভাবে ধান কাটার পাশাপাশি এ গান গাইছিলেন একদল কৃষক।" প্রতিবেদনে এবার আগাম জাতের ধান উত্তরাঞ্চলের আবাদি জমির মোট ৪০ শতাংশে বোনা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। শনিবার আরেকটি সুসংবাদ দিয়েছে দৈনিক সমকাল। সে পত্রিকার 'সুখী মুশাপুর' শিরোনামের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে : 'এখানে অনাচার আর হিংসা-বিদ্বেষ বলতে কিছু নেই। ঘটে না কোনো সহিংসতা বা দাঙ্গা-হাঙ্গামার ঘটনা। মাদক সেবন বা মাদক ব্যবসা বলতে কী বোঝায়, তাও তারা জানে না। আর অভাব-অনটনও পিছু ছেড়েছে। গ্রামটির গরিব মানুষের দুই বেলা খাবার আজ নিশ্চিত। অনেকের অবস্থা সচ্ছল। সারা দিনের পরিশ্রম শেষে তারা রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমায়। আরো সফল দেশের কথা ভাবতে পারে।'
বাজারের এই আশাব্যঞ্জক হাল, এই মঙ্গা বিজয়ের কথা, এই সুখী মুশাপুরের মানুষের চোখে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন_এসব পরিবর্তন তো এই মহাজোট আমলেরই বাস্তব চিত্র। একে তুচ্ছ করা তো মূঢ়তারই নামান্তর। এসব ক্ষেত্রে সূচিত পরিবর্তনকে স্থায়ী করতে হলে দরকার একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক সংসদ আর গোটা সমাজের গণতন্ত্রায়ণ ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন।
দেশে সত্যিকার একটি গণতান্ত্রিক সরকার থাকলেই মঙ্গা বিজয়, সুখী মুশাপুর, জাতীয় শিক্ষানীতি চালুর মাধ্যমে শিক্ষা সংস্কারের মতো সব স্থায়ী পরিবর্তন আসতে পারে।
কিছুকাল আগে, গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর এ কলামে 'কারা যেন সব নিভিয়ে দিচ্ছে আশার আলো' শিরোনামের লেখাটিতে আমরা বলেছিলাম : 'গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির যে দুঃসহ কষ্ট মানুষ ভোগ করে আসছে, তা দূর করার বাস্তব সম্ভাবনা দেখতে পেয়ে এখন শেষ ধৈর্যটুকু ধরতে প্রস্তুত। এর মধ্যে আরো সব আশাব্যঞ্জক ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে। শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার জন্য জাতিসংঘ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাকে জাতিসংঘের অন্যতম দাপ্তরিক ভাষার মর্যাদা দেওয়ার জন্য সাধারণ পরিষদে বাংলায় দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলিষ্ঠ বক্তব্য দিয়েছেন। তা ছাড়া ২০১৫ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্য হ্রাস, জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা, পরিবেশ রক্ষাসহ জাতিসংঘঘোষিত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলস, সংক্ষেপে এমডিজি) অর্জনে সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রীর বলিষ্ঠ ভূমিকা মার্কিন প্রেসিডেন্টসহ ব্যাপকভাবে বিশ্বসম্প্রদায়ের ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেছে।...দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা বিদ্যুৎ ও গ্যাস উৎপাদনের ক্ষেত্রে নতুন এবং বড় রকম আশাব্যঞ্জক ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে। বাপেঙ্রে সফল উদ্যোগের ফলে সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার সংযোগস্থলে নতুন গ্যাসক্ষেত্র (সুনেত্রা) পাওয়ার খবর দেশকে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট মোকাবিলার ক্ষেত্রে নতুন ভরসা জুগিয়েছে। আবার একই সঙ্গে ফেঞ্চুগঞ্জ ও সালনা গ্যাসক্ষেত্রে নতুন কূপ খননের সরকারি নীতিগত সিদ্ধান্ত, শ্রীকাইল ও সুন্দরপুরেও বাপেঙ্রে কূপ খননের পরিকল্পনা এবং গ্যাসক্ষেত্রগুলো সংলগ্ন বাপেঙ্রে এ-জাতীয় আরো নতুন নতুন কূপ খননের উদ্যোগ দেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে বড় রকম ভূমিকা রাখবে।...'
আমাদের আশাবাদ যে অত্যন্ত বাস্তব ছিল, তা ইতিমধ্যে রশিদপুরে বাপেঙ্রে উদ্যোগে আরো নতুন গ্যাসক্ষেত্র চিহ্নিত করা এবং গ্যাসকূপ খননের উদ্যোগ গ্রহণের মধ্য দিয়েই প্রমাণিত হচ্ছে।
বস্তুত গ্যাসই সেই অলৌকিক জাদুদণ্ড, যা এ দেশের দুঃখ-দুর্দশা ও দারিদ্র্য মোচন করে মানুষকে উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথ দেখাবে। মহাজোট সরকারের আমলে বাপেঙ্রে এ রকম উদ্যোগ থেমে নেই। একে সব রকম অবকাঠামোগত সহায়তা দান এবং সে ক্ষেত্রে সব আমলাতান্ত্রিক বাধা অপসারণে সরকারকে যথাসময়ে প্রয়োজনীয় তাগিদ দেওয়ার ও প্রয়োজনীয় সতর্কবাণী উচ্চারণের দেশপ্রেমিক কর্তব্যটি প্রচারমাধ্যম সচেতনভাবেই করে চলেছে।
আমরা তো দেখছি, একই সঙ্গে অন্য যেসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সোনালি সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হচ্ছে, যেমন_পাটের জেনোম উদ্ভাবন, বন্ধ পাটকলগুলো চালু করা, পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধি, জাহাজ নির্মাণ শিল্পের বিকাশ ঘটানোর মধ্য দিয়ে সমুদ্রগামী জাহাজ নির্মাণ এবং উন্নত পাশ্চাত্য দেশের কাছে তা বিক্রি_এ রকম আরো উল্লেখযোগ্য সব সাফল্য অর্জিত হয়েছে মহাজোট সরকারের আমলেই। জাহাজ নির্মাণ শিল্প দেশের বৃহত্তম রপ্তানিমুখী শিল্প খাত হতে পারে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত হয়েছে।
পদ্মা সেতু
আজ পরিশেষে দেশের যোগাযোগব্যবস্থায় বৈপ্লবিক একটা পরিবর্তন সূচিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে। এ সেতু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, যোগাযোগ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি_সব ক্ষেত্রেই বিপ্লব ঘটিয়ে দেবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা প্রায় বাস্তবায়নের মুখে এসে দুর্নীতি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের কিছু অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অচলাবস্থায় নিক্ষিপ্ত হয়েছে। অর্থমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী দুজনই সে অভিযোগের সন্তোষজনক নিষ্পত্তিতে উদ্যোগী হয়েছেন এবং দেশবাসীকে আশ্বস্ত করছেন, এ অচলাবস্থা কেটে যাবে। বলছেন, এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়, 'এটা সাময়িক'। বস্তুত অতীতে যা ঘটেনি, সরকারের আন্তরিক উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে জাইকা, এডিবি, বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু নির্মাণে অর্থায়ন করবেই, এটাই বিশ্ববাস্তবতা।
আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপ আমাদের হাতে নেই, কিন্তু আমাদের হাতে পদ্মা সেতু থাকলে, বাপেঙ্রে উদ্যোগে সম্পূর্ণ দেশি প্রযুক্তিতেই গ্যাসকূপ খনন ও গ্যাস উত্তোলন নিশ্চিত হলে, পাটের জেনোম কাজ লাগিয়ে উন্নতমানের পাট উৎপাদন ও বিশ্ববাজারে তার প্রবেশ নিশ্চিত করতে পারলে প্রদীপের দৈত্যটাকে তো আমরা হাতের মুঠোয়ই পাব। দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার শক্তি থাকবে আমাদের হাতের মুঠোয়ই। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের পক্ষে তার ডিজিটাল বাংলাদেশ ও ২০২১ সালের ভিশন বাংলাদেশ বা রূপকল্প বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য অর্জন তখন আদৌ কল্পনাপ্রসূত ব্যাপার থাকবে না_তা হবে অত্যন্ত বাস্তব।
শিরশ্ছেদের ঘটনা
এরই মধ্যে সৌদি আরবে আট বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ নিয়ে যে অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যা সরকারের ভাবমূর্তি ম্লান করতে উদ্যত হয়েছে, হাইকোর্টের একটি রুলের সন্তোষজনক নিষ্পত্তির মাধ্যমে তারও সন্তোষজনক নিষ্পত্তি ঘটবে বলেই দেশবাসীর প্রত্যাশা।
বস্তুত দেশের প্রধান বিরোধী দল সরকারের বিভিন্ন সম্ভাবনা ও অর্জনের প্রতি চোখ বন্ধ করে যে রোডমার্চ করছে, তা কিছুতেই দেশবাসীকে তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত ও আশ্বস্ত করার মতো কোনো কার্যক্রম হতে পারে না। রোডমার্চ মহাজোট সরকারের ওপর ব্যর্থতার দোষারোপ করে তাকে ক্ষমতা ত্যাগের যে সতর্কবার্তা দিতে চাইছে, তার কোনো যুক্তি দেশবাসী খুঁজে পাবে বলে আমরা মনে করি না। তবে দেশ যে এ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে একটি রাজনৈতিক ক্রান্তিকালে এসে দাঁড়িয়েছে, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না। দেশবাসীর সামনে আজ অগি্নপরীক্ষা, তারা কোন পক্ষ অবলম্বন করবে_সব সম্ভাবনা দুই হাতে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে একটা শূন্যতার মধ্যে, একটা লক্ষ্যহীনতার মধ্যে ঝাঁপ দেবে, নাকি মহাজোট সরকার দেশের যেসব সোনালি সম্ভাবনার দুয়ার উন্মুক্ত করে দিয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়নের জন্য সংঘবদ্ধ ও সংগঠিতভাবে সর্বশক্তি দিয়ে তার সমর্থনে সবেগে মাথা তুলে দাঁড়াবে।
No comments