'দোয়েল' একটি স্বপ্নের বাস্তবায়ন by হাসানুল হক ইনু

ত ১১ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টেলিফোন শিল্প সংস্থা কর্তৃক সংযোজিত প্রথম দেশীয় ল্যাপটপ কম্পিউটার 'দোয়েল'-এর বিপণন ও সংযোজন কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। বাংলাদেশে উৎপাদিত ল্যাপটপ দোয়েলের যাত্রা শুরু দেশে তথ্যপ্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিকস জগতে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।


২০০৯ সালের ২২ নভেম্বরে অনুষ্ঠিত ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সপ্তম বৈঠকে আমরা টঙ্গীর বাংলাদেশ টেলিফোন শিল্প সংস্থা_টেশিসকে কাজে লাগিয়ে ল্যাপটপসহ তথ্যপ্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিকস খাতে কিছু প্রয়োজনীয় যন্ত্র ও যন্ত্রাংশের দেশীয় উৎপাদনের বিষয়ে আলোচনা করে নিচের সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ দিই। এগুলো হলো_১. চঝঞঘ ঝবঃ (ঐধহফংবঃ), ২. ঝঃবহড় ঝবঃ, ৩. ঝসধষষ ঊীপযধহমব/উরমরঃধষ চঅইঢ, ৪. ঙঝচ মালামাল, ৫. ঞবষবঃধষশ-এর জন্য ইঞঝ ঞড়বিৎ তৈরি/সরবরাহ, ৬. গড়নরষব ঈযধৎমবৎ, ৭. উরমরঃধষ চৎবঢ়ধরফ ঊষবপঃৎরপ গবঃবৎ, ৮. খধঢ়ঃড়ঢ়/ঘড়ঃবনড়ড়শ/ঘবঃ নড়ড়শ, ৯. গড়নরষব ঝবঃ, ১০. গধরহঃবহধহপব ঋৎবব ইধঃঃবৎু, ১১. ঝড়ষধৎ চড়বিৎ চধহবষ, ১২. ঝওগ ঈধৎফ চষধহঃ, ১৩. ঋৎবব ঝঃৎববঃ ঝড়ষধৎ খরমযঃরহম ঝুংঃবস, ১৪. জবপুপষরহম চষধহঃ ভড়ৎ ডধংঃব গধঃবৎরধষ ভড়ৎ ইরড়-মধং ইত্যাদি। এসব যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ তৈরির প্লান্ট স্থাপনের মাধ্যমে টেশিসকে 'টেলিকম এবং ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ উৎপাদন জোন' হিসেবে গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়। সংসদীয় কমিটির সিদ্ধান্তের ভিত্তি ছিল_আমাদের বিশ্বাস, আমাদের আশা, আমাদের স্বপ্ন। আমাদের বিশ্বাস ছিল, দেশে ইলেকট্র্রনিকস ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে যে দক্ষ জনশক্তি আছে তাদের কাজে লাগিয়ে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে এ খাতকে স্বনির্ভর করা সম্ভব। সংসদীয় কমিটির এ সভায় মাননীয় মন্ত্রী উপস্থিত থাকতে পারেননি। তিনি তখন টেলিকম সম্মেলনে পর্তুগাল ছিলেন। ২৪ নভেম্বর দেশে ফিরেই মন্ত্রী সংসদীয় কমিটির সুপারিশের গুরুত্ব অনুধাবন করেন। সংসদীয় কমিটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ত্বরিত পদক্ষেপ নেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ কাজে সর্বাত্মক সমর্থন দেন, অনুপ্রেরণা দেন। আর এভাবেই আমাদের স্বপ্ন দেখার মাত্র এক মাস ১১ দিন কম দুই বছরের মাথায় দোয়েলের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে একটি স্বপ্নের বাস্তবায়ন হলো। ডিজিটাল বাংলাদেশের আকাশে উড়ল দোয়েল। আমরা জাতীয়ভাবে তিনটি যুদ্ধের মধ্যে আছি। সুষম উন্নয়নের মাধ্যমে দরিদ্র ও বৈষম্য উচ্ছেদের যুদ্ধ, পরিবেশ ও প্রকৃতির মানচিত্র রক্ষার যুদ্ধ, সাম্প্রদায়িকতা-জঙ্গিবাদ-যুদ্ধাপরাধী চক্র উচ্ছেদের যুদ্ধ।
আজ দুনিয়াটা তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লবের যুগ অতিক্রম করছে। আমরা যে তিনটি যুদ্ধে লিপ্ত, সে তিনটি যুদ্ধে জিততে হলে তথ্যপ্রযুক্তির ওপর আমাদের অংশীদারি অর্জন করতে হবে। এর মধ্যেই আমাদের খুঁজে বের করতে হবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর। কিভাবে তথ্যপ্রযুক্তি আয়ত্ত করতে হবে এবং কোথায় তা প্রয়োগ করতে হবে, এ ধরনের এক রাজনৈতিক যুগসন্ধিক্ষণে এবং বহু বাধার পাহাড় থাকার পরও প্রধানমন্ত্রী এই তিন যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন এবং বাংলাদেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশে রূপান্তরের ঘোষণা দেন। প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্ত রাজনীতির জন্য মোড় বদলকারী, যুগোপযোগী। তিনি পৃথিবীর উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে এক নতুন যুগান্তকারী মাত্রা যোগ করেন এবং দেশকে স্বাবলম্বী করার উন্নয়নের সদর দরজাটা খুলে দেন। ডিজিটাল বাংলাদেশে পেঁৗছানোর মানচিত্র দরকার। সেখানে থাকবে প্রয়োজনের ক্রমতালিকা। চিহ্নিত হবে অগ্রাধিকার। উল্লেখ থাকবে কাজের সময়-কাঠামো। এই মানচিত্র তৈরিতে মনোযোগ দিতে হবে_মানবসম্পদ উন্নয়নে, অবকাঠামো নির্মাণে, তথ্যের সহজলভ্যতা-প্রাপ্যতা নিশ্চিত করায়, ব্যবসাবান্ধব সরকারি নীতিতে, তথ্যপ্রযুক্তির অঙ্গনে শৃঙ্খলা আনয়নে, অর্থায়ন নিশ্চিত করায়, অবকাঠামো নির্মাণের দিকে। তথ্যপ্রযুক্তির প্রয়োগ এমন জায়গায় করতে হবে, যা ভালো উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারে। জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। ল্যাপটপ দোয়েল তেমনি একটি বিশেষ উদাহরণ। সরকার এরই মধ্যে অনেক ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে। এখানে আমি বলব, সরকার তথ্যপ্রযুক্তির প্রাপ্যতা-সহজলভ্যতা আরো সুনিশ্চিত করতে টেলিকম ও তথ্যপ্রযুক্তির খাতকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করে এ খাতের জন্য বিশেষ সুবিধা প্রদান, তথ্যপ্রযুক্তিবান্ধব শুল্ক ও করনীতি ঘোষণার বিষয় বিবেচনায় নিতে পারে। বর্তমান যুগে ইন্টারনেট সুবিধা পাওয়া হচ্ছে মানবাধিকারতুল্য একটি অধিকার। সে জন্য ইন্টারনেটের ব্যান্ডউইথের দাম আরো কমানো, বিনা পয়সায় ইন্টারনেট সংযোগ প্রদান, ইন্টারনেট মডেম ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির ওপর সব শুল্ক প্রত্যাহার, মোবাইল সেটের ওপর বিদ্যমান ১২ শতাংশ হারে ট্যাঙ্ এবং সিমকার্ডের ওপর ৬০০ টাকার ট্যাঙ্ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা উচিত।
বর্তমানে চালু ঝঁনসধৎরহব ঈধনষব-এর সমান্তরাল, এশিয়ার ৩২টি দেশজুড়ে ভূমির ওপর দিয়ে ঙঢ়ঃরপধষ ঋরনবৎ-এর অংরধহ ঞবৎৎবংঃৎরধষ ঘবঃড়িৎশ গড়ে তোলা দরকার। বাংলাদেশে 'অংরধহ ঞবৎৎবংঃৎরধষ ওহভড়ৎসধঃরড়হ ঐরমযধিু'-এর 'ঘবঃড়িৎশ ঙঢ়বৎধঃরহম ঈবহঃৎব' গড়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল রয়েছে। এই কেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণ ও সচল রাখতে বহুলোকের কর্মসংস্থান হবে। কালিয়াকৈরে নির্মাণাধীন হাইটেক পার্ক 'বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক টেকনোলজি পার্ক'-এ রূপান্তর করে তথ্যপ্রযুক্তির আন্তর্জাতিক মিলনকেন্দ্রে রূপান্তরিত করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। ২০১৪ সালের মধ্যে ১৮ হাজার ৫০০টি মাধ্যমিক স্কুল ও ১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিককে প্রধানমন্ত্রী ডিজিটাল করার বলিষ্ঠ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই লাখ লাখ দোয়েলের ডিজিটাল বাংলাদেশের আকাশে ওড়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
দোয়েল উৎপাদন ইলেকট্রনিকস যন্ত্র উৎপাদনের জগতে একটি ছোট পদক্ষেপ। কিন্তু এ দোয়েলই বাংলাদেশের জনগণের হাতে তথ্যপ্রযুক্তির জগতে প্রবেশ করার সদর দরজা খোলার চাবিকাঠি তুলে দেবে। তথ্যপ্রযুক্তি জনগণকে দারিদ্র্যের লজ্জা থেকে মুক্ত করতে এবং বিশাল সামাজিক বিভক্তি দূর করতে সাহায্য করে। আর বাংলাদেশে এই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেবে তথ্যপ্রযুক্তি জ্ঞানসমৃদ্ধ ৩০ বছর বয়সের নিচের প্রায় সাত কোটি যুবক। দোয়েল একটি স্বপ্নের বাস্তবায়ন করেছে। তাই মনে রাখতে হবে, এখন কেবল 'বন্দুকের নলের ভেতর থেকে অথবা ব্যালটের মধ্য থেকেই ক্ষমতা প্রবাহিত হয় না।' কম্পিউটারের মাউসে ছোট একটি টোকার মধ্য দিয়ে এখন ক্ষমতা প্রবাহিত হতে শুরু করেছে। 'চড়বিৎ ভষড়ংি ড়ঁঃ ড়ভ ধ পষরপশ ড়ভ সড়ঁংব ড়ভ ধ খধঢ়ঃড়ঢ়.' দোয়েল আজ বাংলার মানুষকে সেই ক্ষমতার স্বাদ দিতে হাজির। প্রযুক্তি হচ্ছে স্বাধীনতা। তথ্যপ্রযুক্তি হচ্ছে বিশাল জনগোষ্ঠীর মুক্তি সাধনের হাতিয়ার। স্বপ্নের ল্যাপটপ দোয়েল ডিজিটাল বৈষম্য দূর করার সংগ্রামে বাংলাদেশকে এক ধাপ এগিয়ে নেবে। দোয়েল মানুষকে জ্ঞানের, তথ্যের জগতে উড়িয়ে নিয়ে যাবে। তথ্যের অজ্ঞতা দূর করতে, জ্ঞানের জগতে ঢুকতে, উৎপাদককে বাজারে ঢুকতে, গ্রাম-শহরের বৈষম্য কমাতে সাহায্য করবে। মানুষকে মানুষের কাছে নিয়ে যাবে এবং সরকারকে মানুষের কাছে নিয়ে আসবে। দোয়েলের পাখায় ভর করে ডিজিটাল বাংলাদেশ-এর স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা এগিয়ে যাব। ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন অবশ্যই বাস্তবায়ন হবে। আমাদের স্বপ্নের ল্যাপটপ দোয়েলের যাত্রা শুভ হোক।

লেখক : সংসদ সদস্য ও সভাপতি, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ
লংফ_ফযধশধ.হবঃ

No comments

Powered by Blogger.