চরাচর-নালিতাবাড়ীর সুতানালীর দিঘি by আজিজুর রহমান

বাক করা এক দিঘি। স্থানীয়দের কাছে দিঘিটি সুতানালীর দিঘি নামে খ্যাত। শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলা সদর থেকে সাত-আট কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে সবুজ মাঠ পেরিয়ে কাকরকান্দি ইউনিয়নের শালমারা গ্রামে নয়নাভিরাম এ দিঘিটির অবস্থান। গারো পাহাড়ের কোলঘেঁষে সবুজ শ্যামল ছায়া সুনিবিড় গ্রামটিতে ৩৮.৫৮ একর ভূমিজুড়ে এই সুপ্রাচীর বিশাল দিঘিটি বিস্তৃত। শান্ত-নির্জন পাখপাখালির কূজনে মোহনীয়, টলটলে জলের এই রূপময় দিঘিটি পাহাড়ি জনপদের গ্রামটির নৈসর্গিক সৌন্দর্যকে করেছে আরো সুষমামণ্ডিত।

দিঘিটির জন্মবৃত্তান্ত সম্পর্কে কোনো প্রামাণ্য তথ্য বা বস্তুনিষ্ঠ ঐতিহাসিক বিবরণ খুঁজে পাওয়া যায় না। দিঘিটি সুতানালীর দিঘি নামে পরিচিত হলেও ১৯৪০ সালে সরকারি কাগজপত্রে নথিভুক্ত করা হয়েছে বিরহিণীর দিঘি নামে। এর জন্ম ইতিহাস আজও রহস্যাবৃত। তবে স্থানীয়দের মধ্যে দিঘিটির জন্ম সম্পর্কে দুটি লোককাহিনী প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে জনপ্রিয় ও সর্বাধিক প্রচলিত কাহিনীটি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক; কিন্তু অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
কাহিনীটি এমন : কোনো এককালে এ অঞ্চলে অজ্ঞাতনামা এক রাজবংশী সামন্তরাজ রাজত্ব করতেন। তিনি ছিলেন খুবই প্রজাবৎসল, ন্যায়পরায়ণ এবং সুশাসক। রাজা তাঁর রানিকে প্রাণাধিক ভালোবাসতেন। তিনি রানিকে নিয়ে সুখী ও আনন্দময় দাম্পত্যজীবন অতিবাহিত করছিলেন। সেকালে তাঁর রাজ্যে প্রতি গ্রীষ্মকালেই প্রচণ্ড খরা দেখা দিত। গ্রীষ্মের দাবদাহ, সেই সঙ্গে পানির তীব্র সংকট_রাজ্যজুড়ে পানির জন্য হাহাকার পড়ে যেত। তখন কুয়া ও ঝরনার পানি শুকিয়ে যেত। বৃক্ষ-তরুলতা মরে যেত, ফসল পুড়ে যেত, জমির বুক ফেটে চৌচির হয়ে যেত, মানুষ-পশুপাখি তৃষ্ণায় ছটফট করত। রাজ্যের এই করুণ অবস্থা দেখে রানির হৃদয় বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠত। একদিন রানি রাজার কাছে তাঁর বেদনার কথা জানালেন। দান হিসেবে রানি রাজার কাছে প্রজাদের একটি জলাধার প্রার্থনা করলেন। প্রজাদের প্রতি রানির এই অসীম মমত্ববোধ রাজা যারপরনাই সন্তুষ্ট হলেন। তবে দান নয়, উপহার হিসেবে রানিকে একটি দিঘি প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিলেন। রাজা সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি রানিকে এমন একটি দিঘি উপহার দেবেন, কীর্তি হিসেবে যা হাজার বছর ধরে থাকবে মানুষের মুখে মুখে আর স্মৃতি হয়ে বেঁচে থাকবে হৃদয়ে হৃদয়ে। রানি থাকবেন অমর হয়ে।
শত শত শ্রমিক দীর্ঘদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে খনন করল বিশাল এক দিঘি। সে এক এলাহি কাণ্ড। এক পাড় থেকে অন্য পাড়ের দৃশ্য ধু-ধু দেখা যায়। মানুষ দেখা যায়, কিন্তু চেনা যায় না। দিঘির বিশালত্ব দেখে প্রজারা বিস্ময়াভিভূত। কিন্তু হায়! দিঘিতে পানি উঠছে না। রাজ্যময় এ কথা ছড়িয়ে পড়ল। প্রজারা সবাই চিন্তিত। রাজা-রানি উভয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। তাঁরা ভেবে পাচ্ছিলেন না কী করবেন। উদ্বেগাকুল রানি এক রাতে স্বপ্নাদেশ পেলেন : 'গঙ্গাপূজা করো রানি নরবলি দিয়া, তবেক দিঘি উঠিবেক জলেতে ভরিয়া।' শুরু হলো পূজার মহা আয়োজন। এক পূর্ণিমা রাতে দিঘির তলদেশে পূজানুষ্ঠানে রানি গঙ্গামায়ের চরণে প্রার্থনা জানালেন : 'কোন মায়ের বুক করি খালি, তোমারে মাতা দেব নরবলি, আমি যে সন্তানের মা, আমায় করিয়া ক্ষমা, তুলে নাও আমারে মা, পূর্ণ করো তোমার পূজা।' সঙ্গে সঙ্গে চারদিক ভয়ংকর গর্জনে প্রকম্পিত করে দিঘির তলদেশ ফুঁড়ে প্রবল বেগে পানি উঠতে শুরু করল। আতঙ্কিত হতভম্ব বিস্মিত সবাই পূজা অনুষ্ঠান থেকে ছুটে পাড়ে উঠে এল। কিন্তু রানি এলেন না। হারিয়ে গেলেন চিরতরে। রানির শোকে রাজার বুকফাটা আর্তনাদ রাজ্যের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে রইল বহুকাল।
রাজা আর রানির শোকগাথা আজও মানুষের মুখে মুখে অমর হয়ে আছে। আর দিঘি আছে হাজার বছর ধরে নীরব-নিথর যেন শোকে স্তব্ধ।
আজিজুর রহমান

No comments

Powered by Blogger.